দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলন, যা কয়েক মাস আগে প্রায় একাই শুরু করেছিলেন ভারতের আন্না হাজারে ও তার পরে যা দেশের বহু সহস্র মানুষকে সমর্থন মিছিলে পথে নামিয়েছিল, প্রাথমিক ভাবে বলা যেতে পারে তার সম্পূর্ণ বিজয়ই হয়েছিল. সরকার মেনে নিয়েছিল জন লোকপাল বিল নামে মানবাধিকার রক্ষা আইনে পরিবর্তন, যার ফলে শ্রী হাজারে তাঁর অনশন ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন. কিন্তু এই আইন ঘিরে রাজনৈতিক খেলা, দুঃখের হলেও, সেই পুরনো সত্যকেই মনে করিয়ে দিয়েছে যে, বিপ্লবের সূচনা করেন প্রতিভাধর লোকেরা, উত্সাহীরা সেই বিপ্লবকে সফল করেন আর তার লাভের ফল নিয়ে যায় দুর্নীতি গ্রস্ত লোকেরাই.

এখনই বহু বিশেষজ্ঞ তাঁদের উদ্বেগ প্রকাশ করছেন যে, এই জন লোকপাল বিলের দুটি রকমফেরই, একটি সরকার প্রস্তাবিত ও অন্যটি নাগরিক সমাজ প্রস্তাবিত,- আদর্শের থেকে বহু দূরেই রয়েছে. বৃহস্পতিবারে কেন্দ্রীয় অনুসন্ধান দপ্তর লোকসভায় আলোচনার জন্য নিজেদের রিপোর্ট পেশ করেছে, যেখানে প্রমাণ করা হয়েছে যে, দুটি রকমফেরই কার্যকরী নয় ও তা শুধু দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রামকেই দুর্বল করে দেবে.

এই ধরনের উদ্বেগ জনক সম্ভাবনার কথা আগেও বলা হয়েছিল, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক অনুসন্ধান কেন্দ্রের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

"বহু লোকের অংশগ্রহণে আন্দোলন – এমনকি এতটা চোখে পড়ার মতো, যা আন্না হাজারে নেতৃত্ব দিয়েছেন – এটা একটা বিষয়, আর প্রত্যহের রুটিন মাফিক দুর্নীতি অপসরণের কাজ – এটা একেবারেই আলাদা ব্যাপার. কিন্তু, মনে হচ্ছে, ভারতের সমস্ত রাজনীতিবিদেরাই এই তফাত খেয়াল করেন নি. বিরোধী পক্ষ ভারতীয় জনতা পার্টির নেতা লাল কৃষ্ণ আদবানী, যেমন, অক্টোবর মাসে ঠিক করেছেন রথ যাত্রা নামের এক সারি মিছিল করার, দুর্নীতির বিরুদ্ধে. শ্রী আদবানী কে সম্ভবতঃ তাঁর আগের আন্দোলনের অভিজ্ঞতাই উদ্বুদ্ধ করেছে: যখন ১৯৯০ সালে তিনি অযোধ্যা শহরে বাবরি মসজিদ নির্মাণের বিরুদ্ধে এই ধরনের আন্দোলন করেছিলেন ও তার ফলে সারা দেশ জোড়া নির্বাচনের জন্য কিছু রাজনৈতিক সুবিধাও আদায় করতে পেরেছিলেন. এই দৃষ্টিকোণ থেকেই – আগামী লোকসভা নির্বাচনের আগে – ভারতীয় জনতা পার্টির নেতার উদ্যোগ কে দেখা যেতে পারে".

ভারতের সারা দেশ জোড়া নির্বাচন হতে চলেছে ২০১৪ সালে এবং তার আগেই ২০১২ সালের শুরুতে হবে দেশের অন্যতম একটি বৃহত্ জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত রাজ্য উত্তর প্রদেশের লোকসভা নির্বাচন, যেখানের নির্বাচনের ফলাফল সারা দেশের রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্যের উপরে প্রবল প্রভাব ফেলতে পারে, তাই বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

"শ্রী আদবানী যে ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন দুর্নীতির প্রতিবাদে আন্দোলনে নামার, তা প্রচুর প্রশ্নের সামনে উপস্থিত করে. প্রথমতঃ, আগে তাঁকে এই ধরনের কাজ করতে কে বাধা দিয়েছিল? আর দ্বিতীয়তঃ, কয়েকদিন আগের দুর্নীতি সংক্রান্ত স্ক্যাণ্ডাল গুলি তাঁর দলকেও বাদ দেয় নি – অংশতঃ, ভোটার কেনা নিয়ে স্ক্যাণ্ডাল – ভোটের বদলে কাঁচা টাকা.

আন্না হাজারে  এর মধ্যেই লাল কৃষ্ণ আদবানী যে ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, তাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত মিছিল বলে অভিহিত করেছেন, ও মন্তব্য করেছেন যে, এর জায়গায় তাদের দলের উচিত্ আইনের খসড়া গুলি নিয়ে যেমন জাতীয় স্তরে, তেমনই রাজ্যের আইন প্রণেতাদের স্তরে কাজে মনোযোগ দেওয়া.

কিন্তু, মনে হচ্ছে, শ্রী হাজারে নিজেই নির্বাচনের আগের উত্তাপ এড়িয়ে যেতে পারেন নি. নিজের দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনের সাফল্যে উত্তেজিত হয়ে, তিনি নিজেই এবারে নির্বাচনের আইনে পরিবর্তন আনতে চেয়েছেন. তিনি, অংশতঃ দাবী করেছেন যে, ভোটে সকলের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার অধিকার দিতে হবে ও নির্বাচিত সদস্যদের পদত্যাগ করতে বাধ্য করার ক্ষমতা দিতে হবে. আর একই সঙ্গে যাদের হাত এখনও দুর্নীতির বিষয়ে কালিমা লিপ্ত নয়, তেমন সমস্ত রাজনীতি বিদদেরই আহ্বান করেছেন "নিষ্কলঙ্ক দল" তৈরী করতে.

আর এই খানেই একেবারে স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যাচ্ছে খুব বড় বিপদ. এই সবই আসলে জনপ্রিয়তা পাওয়ার চেষ্টা. নিজে শ্রী হাজারে, মনে হচ্ছে, প্রতিদিনের কাজের উপরে জোর না দিয়ে উজ্জ্বল রাজনৈতিক প্রদর্শনীর আয়োজন করতে চাইছেন."

প্রাচীন প্রাচ্য কাহিনীতে ড্রাগন সম্বন্ধে বলা হয়েছিল যে, ড্রাগন মৃত্যুহীণ, - শুধু মাত্র এই কারণেই যে, বীর, যে তাকে হারাবে, সেও আগে হোক অথবা পরেই হোক নিজেও ড্রাগন হয়ে দাঁড়াবে. আর মনে হতেই পারে যে, এই "নিষ্কলঙ্ক, অকলুষ দলের" লোকেরা যখন খুবই মহত্ বৈপ্লবিক ঢেউয়ের তোড়ে ক্ষমতায় আসবে, তখন তারাও বোধহয় এই পাপেই লিপ্ত হবে?