বৃহস্পতিবার ত্রিপোলি পৌঁছেছেন ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি নিকোল্যা সারকোজি এবং গ্রেট-বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন. মুয়ম্মর গদ্দাফিকে শাসন ক্ষমতা থেকে সরানোর পরে তাঁরা এই প্রথম লিবিয়ার রাজধানী সফর করছেন.

   ত্রিপোলিতে নিরাপত্তার বাড়তি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে. শহরের কেন্দ্রীয় হোটেল ঘিরে রেখেছে স্থানীয় নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মীরা, হোটেল ভবনের প্রবেশপথের কাছে মোটরগাড়ি আসা নিষিদ্ধ. লিবিয়ার রাজধানীর বিমানবন্দর থেকে বিশিষ্ট অতিথিদের কেন্দ্রের দিকে যাওয়ার রাস্তায় পাহারা দিচ্ছে টহলদারী বাহিনী. জানা আছে যে, এই দেশনেতাদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার জন্য এর প্রাক্কালে ত্রিপোলিতে এসেছে ১৬০ জন ফরাসী পুলিশ – সেখানে অবস্থিত বিশেষ সৈনিকদের সাহায্যের জন্য, যাদের ভার দেওয়া হয়েছে শহর “পরিষ্কার” করার.

   রাশিয়ার বিজ্ঞান অ্যাকাডেমির প্রাচ্য অধ্যয়ন ইন্স্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ আলেক্সেই পদসেরোভ বলেন, “এ সফর – লোক-দেখানো. এ সফরের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক লক্ষ্য আছে. ফ্রান্সই লিবিয়ায় গৃহযুদ্ধে বাইরের হস্তক্ষেপের উদ্যোক্তা ছিল. আর ফ্রান্স এবং বৃটেন মনে হয়, এ অভিযানে সবচেয়ে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করছে. আর এ সফরের দ্বারা জোর দেওয়া হচ্ছে এর উপর যে, তাদের সমর্থনের কল্যাণেই বিদ্রোহীরা জয়লাভ করেছে. প্যারিসে এবং লন্ডনে আশা করা হচ্ছে যে, সামরিক সমর্থনের বদলে তারা পাবে লিবিয়ার তেলের যথেষ্ট অংশ, লিবিয়ায় তেলের অনুসন্ধান ও নিষ্কাশনের অনুমতি. মনে হয়, পত্র-পত্রিকায় এমন সব প্রবন্ধ শুধু শুধুই প্রকাশিত হচ্ছে না যে, গোড়া থেকেই ফরাসীদের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল ভাবী তেলের চুক্তির ৩০ শতাংশ তারা পাবে, সামরিক ও রাজনৈতিক সমর্থনের বিনিময়ে”.

   এদিকে দেশের পরিস্থিতি আগের মতোই অসহজ. বিদ্রোহীরা গদ্দাফির শাসনের শেষ ঘাঁটি কিছুতেই দখল করে উঠতে পারছে না. আরও দু দিনের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে বানি-ওয়ালিদের আক্রমণ, যদিও শহর হস্তান্তর করার চরম দাবি শেষ হয়েছে ১০ই সেপ্টেম্বর. এ শহর রক্ষা করছে কর্নেলের বিশ্বস্ত হাজার খানেক সৈনিক. আর্টিলারী ও স্নাইপারের গোলা-গুলি বর্ষণের দ্বারা তারা শহরের উপর নিজেদের পতাকা উত্তোলনের জন্য অন্তর্বর্তী জাতীয় পরিষদের পক্ষ-সমর্থকদের প্রচেষ্টা বানচাল করে দিচ্ছে.

   আক্রমণের আরও কঠিন পরিণতি থেকে বাঁচার জন্য লোকে তাড়াতাড়ি শহর ছেড়ে যাচ্ছে. বিপর্যয়কর মানবতাবাদী পরিস্থিতির জন্যও উদ্বাস্তুদের প্রবাহ বাড়ছে. বানি-ওয়ালিদে খাদ্যদ্রব্যের সঞ্চয় শেষ হতে চলেছে, জল ও বিদ্যুত্ সরবরাহ নেই,  টেলিফোন যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিন্ন.

   বুধবার বিদ্রোহীরা গদ্দাফির আপন শহর সির্ত দখলের জন্য ব্যবহার করেছে ট্যাঙ্ক, আর্টিলারী এবং রিয়াক্টিভ গোলা. উত্খাত নেতার বিশ্বস্ত সেনাবাহিনী এ সব আঘাত সফলভাবে প্রতিহত করছে শুধু তাই-ই নয়, কোথাও কোথাও প্রতি-আক্রমণও করছে. সব কিছু বিচার করে মনে হয়, ন্যাটো জোটের বিমানবাহিনীর সাহায্য ছাড়া বিদ্রোহীদের সির্ত দখল করা কঠিন হবে. এ উপলক্ষে গদ্দাফি রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদকে আহ্বান জানিয়েছেন, “ন্যাটো জোটের বর্বরতা” থেকে তাঁর শহরকে রক্ষা করার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে. এ চিঠির বয়ান রাষ্ট্রসঙ্ঘকে জানানোর জন্যই পাঠিয়েছে সিরিয়ায় অবস্থিত টেলি-চ্যানেল “আর-রাই”.

   এর প্রক্কালে আন্তর্জাতিক রেড-ক্রস কমিটি ঘোষণা করেছিল যে, ত্রিপোলির অদূরে একটি পাহাড়ী এলাকায় ১৩টি সাধারণ সমাধি আবিষ্কৃত হয়েছে. তাতে ছিল ১২০টিরও বেশি দেহ. রেড ক্রস এবং মানব অধিকার রক্ষকরা তাদের সনাক্ত করার জন্য সমস্ত কিছুই করছে. এ সম্পর্কে অন্তর্বর্তী জাতীয় পরিষদের প্রতিক্রিয়া সম্বন্ধে কিছুই জানানো হচ্ছে না. এদিকে লন্ডনে অবস্থিত আন্তর্জাতিক মানব অধিকার রক্ষা সংস্থা “অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশানাল” গদ্দাফির শাসন ব্যবস্থা এবং লিবিয়ার নতুন শাসনের বিরুদ্ধে লডাইয়ের সময় সামরিক অপরাধ সাধনের অভিযোগ তুলেছে. ঘটনাবলির বর্ণনা রয়েছে ১০৭ পৃষ্ঠার রিপোর্টে, যা তারা সংগ্রহ করেছিল লিবিয়া সফরের সময়, “রেডিও রাশিয়াকে” প্রদত্ত এক ইন্টারভিউতে বলেছেন এ সংস্থার প্রতিনিধি. প্রসঙ্গত, আগে এই সংস্থাই গদ্দাফির বিরুদ্ধে অভিযোগ স্বীকার করেছিল, যা বহুগুণ বাড়িয়ে, ন্যাটো জোটের সামরিক হস্তক্ষেপের অজুহাত হয়ে উঠেছিল. সহজভাবে বললে, হস্তক্ষেপের জন্য আইনসঙ্গত অজুহাত ন্যাটো জোটের হাতে প্রকৃতপক্ষে ছিল না. তবে, এখন এ নিয়ে কারুর মাথাব্যথা নেই, কারণ ন্যাটো জোট লিবিয়ায় জয়লাভ করেছে, এবং সামরিক হস্তক্ষেপের উদ্যোক্তারা বিজয়ী হিসেবে এ দেশ সফর করছে.