আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল লিবিয়ার নতুন সরকারকে সামরিক অপরাধে অভিযুক্ত করেছে. আবার এই ঘটনাকে মুহম্মর গাদ্দাফি প্রশাসনের নিষ্ঠুরতার সঙ্গে তুলনা করার মতো নয় বলা হয়েছে, কারণ তার আকার বিশাল. এই সম্বন্ধে তথ্য তুলে দেওয়া হয়েছে এক ১০৭ পাতার রিপোর্টে. লিবিয়াতে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সংস্থার কর্মীদের সফরের সময়ে পাওয়া খবর এখানে দেওয়া হয়েছে.

   মানবাধিকার রক্ষা কর্মীরা আগেই বলে নিয়েছেন যে, তাঁরা এই বিরোধের দুই পক্ষের মধ্যে কোনও তুলনা করতে চান না. কিন্তু তথ্য অনুযায়ী, যা এই রিপোর্টে দেওয়া হয়েছে, গাদ্দাফির সমর্থকেরা নির্শর্ত ভাবেই বিরোধী দের থেকে বেশী পরিমানে অপরাধ করেছে. তার মধ্যে রয়েছে নাগরিকদের উপরে ইচ্ছাকৃত ভাবে আক্রমণ, অনেক লোকের নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া, অত্যাচার ও অন্যান্য নিষ্ঠুরতার বর্ণনা. মানবাধিকার রক্ষা কর্মীরা মনে করেছেন যে, তাদের অপরাধকে সামরিক অপরাধের সঙ্গে তুলনা করা যেতেই পারে. অংশতঃ তাঁরা প্রমাণ করতে চাইছেন যে, শুধুমাত্র ১৬ থেকে ২১ শে ফেব্রুয়ারী লিবিয়ার পূর্ব দিকে সরকারি বাহিনী ১৭০ জন মানুষকে হত্যা করেছে. তাদের মধ্যে বেশীর ভাগ লোকই ছিল নিরস্ত্র মিছিলের লোক. এখানে বলা হয়েছে, একই সঙ্গে সহস্র লোককে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া, নিষিদ্ধ ক্যাসেট বোমার ব্যবহার ও সাঁজোয়া গাড়ী থেকে দেশের লোকেদের উপরে গোলাবর্ষণ করার কথা. লিবিয়ার বহু এলাকাতেই এখনও যাতায়াত করা বারণ. এই কারণেই গাদ্দাফি প্রশাসনের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা নির্ণয় করা এখনও দুঃখের বিষয় হলেও, সম্ভব নয়.

   একই সঙ্গে মানবাধিকার রক্ষা কর্মীরা অন্তর্বর্তী কালীণ জাতীয় পরিষদকেও অভিযুক্ত সাব্যস্ত করেছে এই বলে যে, তারা গাদ্গাফির অনুগত লোকেদের হত্যা করেছে, সরকারি ফৌজের সেনাদের বন্দী করার চেষ্টা করেছে. এই রিপোর্টে উত্তর সাহারা অঞ্চলের প্রজাতিদের প্রতি জাতি বিদ্বেষ সংক্রান্ত তথ্য দেওয়া হয়েছে. সেখানে বলা হয়েছে যে, লিবিয়ার লোকেরা অনেকবারই কালো মানুষদের উপরে আক্রমণ করে তাদের লুঠ করেছে. সব দেখে শুনে মনে হয়েছে যে, এটা গণ হারে হয়েছে, এই কথা মনে করে রাশিয়ার পক্ষ থেকে লিবিয়াতে প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত ও বর্তমানে রুশ বিজ্ঞান একাডেমীর নেতৃস্থানীয় বৈজ্ঞানিক কর্মী আলেক্সেই পদশ্যেরব বলেছেন:

   “আফ্রিকা সঙ্ঘ থেকে সরকারি ভাবে প্রতিবাদ জানানো হয়েছিল সেই কারণে যে, কালো মানুষদের উপরে অত্যাচার ও খুন করা হচ্ছে. অংশতঃ কালো আফ্রিকার দেশ থেকে আসা অভিবাসিত লোকেদের উপরে বেশী করে, যারা লিবিয়াতে এসেছিল কাজ করতে. অন্য উদাহরণ, কিছুদিন আগে “নিউ ইয়র্ক টাইমস” পত্রিকা, যাকে কিছুতেই লিবিয়ার নেতা গাদ্দাফির অনুরক্ত বলা যেতে পারে না, সেখানে এই একই খবর ছাপা হয়েছিল. লেখা হয়েছিল, খুন, জখম, লুঠের কথা. অন্য একটি মানবাধিকার রক্ষা সংস্থা “হিউম্যান রাইটস্ ওয়াচের” পক্ষ থেকেও রাষ্ট্রসঙ্ঘের মহাসচিব বান গী মুনের কাছে আবেদন করা হয়েছিল এই অত্যাচার ও লুঠ বন্ধ করার জন্য ব্যবস্থা নিতে. সুতরাং সব দেখে শুনে মনে হয়েছে, সেখানে এটাই ঘটছে”.

   এই কথা সত্য যে, অন্তর্বর্তী কালীণ সরকারের লোকেরা নিজেদের উপরে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে. এই সরকারের আইন মন্ত্রী মোহামেদ আল- আলাগি বলেছেন যে, গাদ্দাফির বিরোধীদের কাজকর্মকে এই রিপোর্টে সামরিক অপরাধ বলা ঠিক নয়. তাদের যুক্তি, তারা সেনা নয়, বিরোধী পক্ষ. যুক্তিটা খুবই দূর্বল, কারণ এখানে কথা হচ্ছে শুধু অপরাধ নিয়েই নয়, যা সেনা বাহিনীর লোকেরা করেছে, বরং সেই সব অপরাধের কথা, যা যুদ্ধের সময়ে করা হয়েছে. এই ক্ষেত্রে – অন্তর্বর্তী কালীণ সরকারের সশস্ত্র প্রতিনিধিদেরই কথা হচ্ছে. মন্ত্রী অবশ্য স্বীকার করেছেন যে, তাদের পরিষদ ভুল আর ক্ষমতার অপব্যবহারও করেছে.

   অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের রিপোর্ট রাজনৈতিক বিরোধের সবচেয়ে কঠিন গড়নের সম্বন্ধেই তথ্য দিয়েছে – গৃহযুদ্ধের বর্ণনা, এই কথা উল্লেখ করে প্রাচ্য বিশারদ স্তানিস্লাভ তারাসভ বলেছেন যে তা এই ধরনের অপরাধের সঙ্গেই যুক্ত থাকে:

   “তাই কোন সন্দেহই নেই যে, বিরোধী পক্ষ যন্ত্রণা দিয়ে স্বীকারোক্তি আদায় করতে চেয়েছে গাদ্দাফির সমর্থক দের কাছ থেকে. একই কথা বলা যেতে পারে গাদ্দাফির লোকেদের সম্বন্ধেও, তারাও নিজেদের দেশের লোকদের ধরেই অত্যাচার করে কথা আদায় করেছে. এর মানে কি হতে পারে? এটা দুঃখের হলেও এই দেশের গৃহ যুদ্ধেরই বাস্তবের বিবরণ ও ট্র্যাজেডি”.

   অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সংস্থার অনুসন্ধাণ ও আঞ্চলিক প্রোগ্রাম বিভাগের ডিরেক্টর ক্লাউডিয়া কর্ডনে মনে করেন যে, লিবিয়ার নতুন প্রশাসনের নেতাদের উচিত্ হবে ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ করা, যা এই দেশে গত চল্লিশ বছর ধরে হচ্ছে. এই সংস্থা সেই দেশের সকলের উপরেই, যারা অত্যাচার করেছে, তাদের বিচার আদালতের কাছ থেকে চেয়েছে. এটা অন্তর্বর্তী কালীণ জাতীয় সরকারে উপরেও প্রসারিত হওয়া উচিত্, যেমন উচিত্ গাদ্দাফি সমর্থকদের উপরে. যত দ্রুত এই সব অপরাধের কিনারা করা হবে, তত দ্রুতই লিবিয়ার লোকরা দেশকে আইনের ভিত্তিতে ও মানবাধিকার রক্ষা করে পুনর্গঠন করতে পারবেন.