আমেরিকার গুপ্তচর বাহিনী আগে থেকেই গত বছরের জানুয়ারী মাসে চিনে মাঝারি পাল্লার রকেট উড়ানের সময়ে ধরার জন্য পরীক্ষার খবর পেয়েছিল. এটা উইকিলিক্স সাইটে প্রকাশিত দলিলের মধ্যে দেখতে পাওয়া গিয়েছে. জনসমক্ষে উপস্থিত হয়েছে এক টেলিগ্রাম, যা রাষ্ট্র সচিব হিলারি ক্লিন্টন ২০১০ সালের ৯ই জানুয়ারী "গোপনীয়" চিহ্ন দিয়ে পাঠিয়েছেন.

    বিশেষজ্ঞরা স্বীকার করেছেন যে, এই টেলিগ্রাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্র দপ্তর থেকে পাওয়া বহু সহস্র গোপন দলিলের মধ্যে বলা যেতে পারে একটি অন্যতম চাঞ্চল্যকর দলিল, যা এই সাইটের লোকেদের হাতে পৌঁছেছে.

    যদি উইকিলিক্স সাইটের প্রকাশ করা দলিলকে বিশ্বাস করা হয়, তাহলে দেখা যাবে যে, চিনের পক্ষ থেকে খুবই গোপনীয় পরীক্ষার দুই দিন আগে ওয়াশিংটন নিজেদের জোটের দেশ গুলিকে এই সম্পর্কে সাবধান করে দিয়েছিল. প্রসঙ্গতঃ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ খুঁটিনাটি আগে থেকেই জানা হয়ে গিয়েছিল – কোন দিনে এই পরীক্ষা হবে, কোথা থেকে তা করা হবে, কি ধরনের রকেট ব্যবহার করা হবে, এই পরীক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সব. ওয়াশিংটন এমনকি নিজেদের জোটের দেশ গুলিকে অনুরোধ করেছিল – তার মধ্যে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, গ্রেট ব্রিটেন ও নিউজিল্যান্ড ও রয়েছে – এই পরীক্ষার তথ্য নিয়ে খুবই কঠোর নীরবতা পালন করতে. এটা স্পষ্টই বোঝা গিয়েছে – এই তথ্য গুপ্তচর ব্যবস্থা ব্যবহার করে পাওয়া গিয়েছে, আর তার প্রকাশ হলে পরবর্তী কালে চিনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্বন্ধে তথ্য পাওয়াতে সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে.

    চিনের মাঝারি পাল্লার রকেট বিরোধী ব্যবস্থার সফল পরীক্ষা দেখাই যাচ্ছে যে, আমেরিকার জন্য খুব আশ্চর্য্যজনক খবর হয়ে দাঁড়ায় নি. ওয়াশিংটনে চিনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষমতা সম্বন্ধে প্রয়োজন অনুযায়ী মূল্যায়ণ করা হয়েছে ও তার উন্নয়নের ভবিষ্যত সম্বন্ধেও জানা রয়েছে – এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার সামরিক বিশেষজ্ঞ ও সামরিক বিজ্ঞান একাডেমীর প্রফেসর ভাদিম কজ্যুলিন বলেছেন:

    "আমেরিকার গুপ্তচর বাহিনী শুধু চিনের রকেট বিরোধী ব্যবস্থা সম্বন্ধেই জানতে নয়, তাদের রকেট পরিকল্পনা সম্বন্ধেও জানতে পেরে থাকবে. চিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রযুক্তি বিষয়ে একটি অগ্রণী দেশ. আজ চিনের দিকে আমেরিকার বিশেষ বাহিনীর মনোযোগ নিবদ্ধ রয়েছে. আমরা জানি যে, আমেরিকার গুপ্তচর সংস্থার বাজেট বিপুল. আমি মনে করি যে, ডলার – এটা সবচেয়ে সফল পরাজয়ের অস্ত্র. ডলারের বিরুদ্ধে শুল্ক বিভাগের লোক, সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর লোক, গোপন খবর বাহকেরা কেউই দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না. তাছাড়া, আমেরিকার হাতে রয়েছে দারুণ সব প্রযুক্তি – মহাকাশ থেকে দেখার জন্য সেখানে উপগ্রহ ব্যবস্থা, রেডিও ও বৈদ্যুতিন মাধ্যম ব্যবহার করে জানার পথ. তাই যদি প্রযুক্তি দিয়ে নাও হয়, তবে ঘুষ দিয়ে তারা এই ধরনের গোপন খবর জেনে যেতেই পারে".

    রাশিয়ার হায়ার স্কুল অফ ইকনমিক্সের প্রফেসর আলেক্সেই মাসলভ, আবার মনে করেন যে, উইকিলিক্স সাইটে প্রকাশিত তথ্যের বিষয়ে সাবধান হওয়া দরকার. আলেক্সেই মাসলভের ধারণা অনুযায়ী এই তথ্য জেনে শুনে প্রচার করাও হতে পারে, তিনি বলেছেন:

    "আমি এই কথা বাদ দিতে পারি না যে, উইকিলিক্স যে সব খবর দিয়েছে চিনের সম্বন্ধে, সেগুলি হয় সঠিক নয়, নতুবা পরিস্কার ধাপ্পা. চিন এমন একটা বড় দেশ, যাদের সামরিক গুপ্তচর পরিষেবা ও সামরিক মিথ্যা সংবাদ প্রকাশের পরিষেবা খুবই উন্নত. তাই প্রায়ই চিনের সামরিক বৃত্ত থেকে জেনে শুনে মিথ্যা প্রচার করা হয়ে থাকে, আর সেগুলির প্রতি কোন না কোন ভাবে আমেরিকা প্রতিক্রিয়া দেখায়".

    চিন নিজে থেকেই আমেরিকাকে এই পরীক্ষার খুঁটিনাটি জানিয়ে থাকতে পারে, যাতে, প্রথমতঃ, অতিরিক্ত তীক্ষ্ণ প্রতিক্রিয়া এড়ানো যায়, আর দ্বিতীয়তঃ, নিজেদের পক্ষ থেকে সমানে থাকার বাসনার গুরুত্ব বোঝানো সম্ভব হয়, এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতার প্রমাণও দেওয়া যেতে পারে, বলে মনে করেছেন প্রফেসর মাসলভ.

    এরই মধ্যে চিনের প্রতিরক্ষা বাহিনীর লোকেরা চিন প্রজাতন্ত্রের রকেট পরিকল্পনা সংক্রান্ত এই খবর বেরিয়ে পড়ার বিষয়ে খুবই গুরুত্ব দিয়েছেন. চিনের বিখ্যাত সামরিক বিশেষজ্ঞ, অবসর প্রাপ্ত মেজর জেনেরাল সুই গুয়ানুই মনে করেছেন যে, আমেরিকার গুপ্তচর বাহিনী এই খবর পেয়েছে চিনের উচ্চ পর্যায়ের সামরিক বা রাজনৈতিক চক্রের লোকেদের কাছ থেকেই. তাঁর মতে, প্রযুক্তি ব্যবহার করে চিনের রকেট পরীক্ষার জায়গা গুলিতে কোন সাধারণের অতিরিক্ত সক্রিয়তা ধরা যেতে পারে, কিন্তু সেই ধরনের অতি গোপনীয় তথ্য, যেমন রকেটের মডেল ও কবে পরীক্ষা হতে চলেছে, তা একমাত্র ভেতর থেকেই পাওয়া সম্ভব – তাদের কাছ থেকেই, যারা নিজেদের দেশের স্বার্থের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছে. এখানে জটিল হল, আসলে কি হয়েছিল, তা বলা. খুব সম্ভবতঃ, কখনও এই ইতিহাস কোন গুপ্তচর কাহিনীর বিষয় হবে. কিন্তু আপাততঃ শুধু এই টুকুই বলা যেতে পারে যে, উইকিলিক্স শুধু গোপনের একটা খুবই সামান্য অংশই মেলে ধরেছে, যা চিন প্রজাতন্ত্র ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে তীক্ষ্ণ সামরিক বিরোধের জন্য ঘটছে.