ব্রিক দেশ গুলি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার বিপদ হতে পারে. ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চিন সন্ত্রাসবাদ, সাইবার আক্রমণ, ইরান ও উত্তর কোরিয়ার পারমানবিক পরিকল্পনার বিপদের সঙ্গে একই তালিকায় এবারে জায়গা পেয়েছে. এই নতুন চালিকা ঘোষণা করেছেন পেন্টাগনের নতুন প্রধান. লিওন প্যানেত্তা যেমন বলেছেন যে, আগামী দশ বছরে ওয়াশিংটনকে এই দেশ গুলির তরফ থেকে বিশ্বের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার প্রচেষ্টা থেকে বাঁচাতে হবে.

এখানে উল্লেখ যোগ্য হল, গত বছরে নেওয়া আমেরিকার উন্নয়নের পরিকল্পনাতে, রাশিয়া ও চিনকে বিপদের উত্স বলে ধরা হয় নি. কিন্তু এই বছরের আগষ্ট মাসের শেষে পেন্টাগন নিজেদের রিপোর্ট দিয়ে মার্কিন কংগ্রেসকে সাবধান করে দিয়েছে যে, আগামী ৯ বছর বাদে চিন নিজেদের সেনা বাহিনীর অস্ত্র সজ্জা দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অতিক্রম করবে. আমেরিকার সেনাবাহিনীর দপ্তরে বিশ্বাস করা হয় যে, চিনের নিজেদের প্রতিরক্ষা শিল্প ব্যবস্থা তাদের সুযোগ করে দেবে, যা "এই অঞ্চলের সামরিক ভারসাম্য অস্থিতিশীল করার মত বিপজ্জনক". আর রাশিয়া সম্বন্ধে যা বলা হয়েছে, তাতে পেন্টাগনকে বিশেষ করে কোন বিবরণ দিতে হয় নি: এটা বিশ্বের একমাত্র দেশ, যাদের স্ট্র্যাটেজিক পারমানবিক ক্ষমতা, আমেরিকার ক্ষমতার সঙ্গে তুলনার যোগ্য.

প্রসঙ্গতঃ, যদি শেষ পর্যন্ত পাওয়া প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগের তুলনামূলক হিসাব দেখা যায়, তবে বিশ্বে প্রথম স্থান পাকাপাকি ভাবেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ধরে রেখেছে. পেন্টাগনের খরচ গত বছরে বিশ্বের সমস্ত দেশের সম্মিলিত খরচের শতকরা চল্লিশ ভাগ ছিল. রাশিয়া বিশ্বে দ্বিতীয়, তৃতীয় চিন. কিন্তু নতুন অস্ত্রে বিনিয়োগ করার জন্য কোথাও একটা থেকে সেই অর্থ পেতে হবে. সুতরাং আমেরিকার বিশ্লেষকদের দুশ্চিন্তা হয়েছে শুধু ব্রিক (কিছু সময় আগে দক্ষিণ আফ্রিকা যোগ দেওয়ার পর থেকে এই সংস্থা ব্রিকস নামে পরিচিত হয়েছে) দেশ গুলির সামরিক ক্ষমতাতেই নয়, বরং অর্থনৈতিক ক্ষমতার জন্যও. কারণ সেই বিশ্ব অর্থনৈতিক সঙ্কটের সময়েই বিশেষজ্ঞরা এই নতুন ব্লকের দেশ গুলির অর্থনীতির দ্রুত উন্নতির কথা বলেছিল.

পেন্টাগনের প্রধানের শেষের এই রিপোর্টকে মনে করা যেতে পারত ওয়াশিংটনের "ঈগল ভগ্নাংশের" আরও একটি প্রচার অনুষ্ঠান বলেই. তার ওপরে যে গত কয়েক বছর ধরেই আমেরিকা ও রাশিয়ার কূটনীতি অধুনা চলতি শব্দ "রিসেট" এর চার পাশ ঘিরেই করা হচ্ছে, আর নিজেদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেশ দুটি একদা অভ্যস্ত "ঠাণ্ডা যুদ্ধের" সময়ের বিশেষণ গুলি থেকে সরে যেতে শুরু করেছিল. কিন্তু দুঃখের বিষয় হল, প্যানেত্তা তাঁর ঘোষণার ক্ষেত্রে একা নন. এর কিছু আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্র সচিব হিলারি ক্লিন্টন এক ঘোষণা করেছেন, যেখান থেকে স্পষ্ট হয়েছে: ওয়াশিংটন আমেরিকার বিশ্ব নেতৃত্বের ধারণা থেকে হঠে যায় নি. হিলারি ক্লিন্টনের কথামতো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সমস্ত ক্ষেত্রেই নেতৃস্থানীয় ও বাকিদের নিজের পেছনেই রেখেছে. ওয়াশিংটনের এই অবস্থানের জন্যেই, তারা প্রায়ই সেই সব জায়গায় বিপদের গন্ধ পায়, যেখানে তা নেই, এই কথা উল্লেখ করে "রেডিও রাশিয়াকে" দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে সামাজিক রাজনৈতিক গবেষণা কেন্দ্রের ডিরেক্টর ভ্লাদিমির ইভসিয়েভ বলেছেন:

"খুবই বিরক্তিকর লাগে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আগের মতই স্থিতিশীলতা বলতে বোঝে এক মেরু বিশিষ্ট বিশ্ব, যেখানে তারাই শুধু প্রাধান্য পাবে. এই অবস্থান থেকে দেখলে, তাদের জন্য সব সময়েই ভেবে বার করা সমস্ত বিপদ আসবে, যেমন, ভারতের তরফ থেকে. আমাদের বর্তমানে বহু সত্যিকারের বিপদ রয়েছে, যেগুলির জবাব তৈরী করতে হবে, আর তা করতে হবে একসাথে".

এখন ওয়াশিংটনের রাজনীতিবিদদের বাস্তবের দিকে তাকাতেই হবে বিশ্ব নতুন যুগে প্রবেশ করেছে, যাকে এর মধ্যেই নাম দেওয়া হয়েছে আমেরিকা পরবর্তী যুগ বলে, উল্লেখ করেছেন রাশিয়ার পররাষ্ট্র দপ্তরের অধীনে কূটনৈতিক অ্যাকাডেমীর প্রাচ্য গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান আন্দ্রেই ভলোদিন বলেছেন:

"আজকের দুনিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আগের চেয়ে যথেষ্ট কম ভূমিকাই নেবে. আমেরিকার লোকেদের জন্য এটা কোন মরণ বাঁচন সমস্যা যদি না নয়, তবুও প্রশ্নটা  অনেকটাই অর্থবহ. তারা অর্থনৈতিক ও সামরিক – রাজনৈতিক ক্ষেত্রে একমাত্র খেলার নিয়ম তৈরী করার অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে. শুধু রাশিয়াতেই নয়, বরং অন্যান্য ইউরোপীয় দেশ গুলিও আরও বেশী করেই আমেরিকার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে".

বোঝা যাচ্ছে যে, আমেরিকায় আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দৃষ্টিকোণ থেকেই সেখানের বিভিন্ন পদের লোকেদের নানা ঘোষণা বিবেচনা করে দেখা উচিত্. বর্তমানের হোয়াইট হাউসের মালিকের বিরোধী লোকের সংখ্যা যথেষ্টর চেয়েও বেশী. আর বিরোধীরা নিজেদের প্রাক্ নির্বাচনী পরিকল্পনা জনতার কাছে প্রচারের একটু সুযোগও ছেড়ে দিতে রাজী নয়.

ব্রিটেনের সাম্রাজ্যে সময়ে নতুন কলোনি জয় যারা করতো, তাদের স্লোগান ছিল: "সাদা চামড়ার মানুষদের সভ্যতা বিস্তারের প্রয়াস". পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কুয়াশাবৃত অ্যালবিওন (দ্বীপ সমষ্টির উপরে অবস্থিত গ্রেট ব্রিটেনের প্রাচীনতম নাম) এর বাসিন্দারা আরও গভীর ও প্রসারিত করেছে এই ধারণাকে, নাম দিয়েছে "গণতান্ত্রিকীকরণ". শুধু কাজের ক্ষেত্রে দেখা গেল যে, বিশ্বে অসংখ্য সভ্যতাই রয়েছে ও তাদের – যদি কেউ ব্যাঘাত সৃষ্টি না করে – তবে একে অপরের যথেষ্ট ভাবেই পরিপূরক হতে পারে.