শহরের আইস হকি দল "লোকোমোটিভ" এর খেলোয়াড়দের জন্য, যাঁরা বিমান দুর্ঘটনায় সদ্য নিহত হয়েছেন তাঁদের জন্য শোক প্রকাশ করছে সারা শহর. বাস্তবে বুধবার ৭ই সেপ্টেম্বর থেকেই ইয়াক – ৪২ বিমানের দুর্ঘটনার জায়গায়, এই শহর ও দেশের অন্যান্য শহরে হকি দলগুলির স্টেডিয়ামে অসংখ্য মানুষ ফুল ও জ্বলন্ত মোমবাতি নিয়ে শোক এসে শোক প্রকাশ করছেন. সমস্ত গির্জায় মৃতদের আত্মার শান্তি কামনায় চলছে প্রার্থনা.

মারা গিয়েছেন অধিকাংশ ২৫- ২৭ বছর বয়সের যুবকেরা, যাদের এই শহরে সবাই পছন্দ করতেন. সারা বিশ্ব থেকেই আসছে শোক বার্তা. বহু খেলোয়াড়কে বিদেশের ক্লাব গুলিতে ভাব করেই জানতেন, তাঁদের সেখানে রয়েছেন অসংখ্য বন্ধু বান্ধব.

তাঁদের সঙ্গে প্রাণ হারিয়েছেন বিদেশ থেকে খেলতে আসা খেলোয়াড়েরা. এই ট্র্যাজেডিতে নিহতদের মধ্যে রয়েছেন জার্মানীর জাতীয় আইস হকি দলের ২৫ বছরের খেলোয়াড় রবার্ট ডিট্রিখ, যাঁকে জার্মানীর হকি দলের একজন অত্যন্ত প্রতিভা সম্পন্ন বলে মনে করা হত.

রাশিয়ার হকি খেলোয়াড়দের সঙ্গে এই বিপর্যয়ে নিহত হয়েছেন চেখ, স্লোভাকিয়া, সুইডেন, জার্মানী, বেলোরাশিয়া ও লাতভিয়ার খেলোয়াড়েরা, তার সঙ্গে এই দলের কানাডার প্রশিক্ষক ব্র্যাড ম্যাকক্রিম্মন. চেখ প্রশিক্ষক ভ্লাদিমির ভুইতেক, যাঁর সময়ে রাশিয়ার চ্যাম্পিয়নশীপে "লোকোমোটিভ" দল দুবার বিজয়ী হয়েছিল, তিনি ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন ইয়ারোস্লাভল শহরে এসে তাঁর মৃত কমরেডদের সঙ্গে বিদায় অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার.

বেলোরাশিয়ার "ডায়নামো" হকি দলের জন্যেও এই ঘটনা খুবই আঘাতের হয়েছে. এঁদের সঙ্গেই মহাদেশীয় হকি লীগের নিয়মিত প্রতিযোগিতার এই বছরের প্রথম খেলার জন্য মিনস্ক শহরে উড়ে যেতে চেয়েছিলেন "লোকোমোটিভ" দলের লোকেরা. এই খেলা দেখার সমস্ত টিকিট অনেক আগেই বিক্রী হয়ে গিয়েছিল. এই খেলার বদলে মিনস্ক শহরের স্টেডিয়ামে শোক পালনের অনুষ্ঠান হয়েছে. সেখানে লোকোমোটিভ দলের প্রতীক স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে সমস্ত খেলার অনুরাগীরাই ফুল নিয়ে এসেছেন, জ্বলন্ত মোমবাতি রেখেছেন তাঁদের প্রিয় নিহত খেলোয়াড়দের জন্য. আধ ঘন্টার স্মৃতি সন্ধ্যা সেখানে পালিত হয়েছে সমস্ত লোক দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায়. রেডিও রাশিয়ার সাংবাদিকা আনাস্তাসিয়া ক্রাভচুক জানিয়েছেন যে, এখানে সিম্ফনি অর্কেস্ট্রা বাজিয়েছে মোত্সার্টের রেক্যুয়েম. ডায়নামো দলের হকি খেলোয়াড়েরা আইস হকির বরফে নেমে লোকোমোটিভ দলের নিহত খেলোয়াড়দের ছবির সামনে নতজানু হয়েছেন. তারপরে এক প্রতীক গোল পোস্টে নিজেদের দিকে ছবি গুলির পাশে রাখা হকির ডিস্ক পাঠিয়ে গোল করেছেন, এই ভাবে বোঝাতে চেয়েছেন ইয়ারোস্লাভলের দলের জয়. উপস্থিত দর্শকেরা করতালি দিয়ে এই সময়ে স্বাগত জানিয়েছেন. বড় টেলিভিশনের পর্দায় তখন দেখানো হয়েছিল মৃত খেলোয়াড়দের ছবি.

একই সময়ে মস্কো শহরে ডাক্তারেরা বেঁচে থাকা দুই জনের জীবন নিয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা কষছেন. "লোকোমোটিভ" – রাশিয়ার একটি অত্যন্ত প্রিয় বহু বারের পদক বিজয়ী দল. তারা প্রতিযোগিতায় অনেক বারের চ্যাম্পিয়ন ও অন্যান্য পদক বিজয়ী দল. এই বারের মহাদেশীয় হকি লীগের চ্যাম্পিয়নশীপেও এই দল সম্ভাব্য বিজয়ীদের মধ্যেই ছিল, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার আইস হকি ফেডারেশনের সভাপতি ও প্রাক্তন বিখ্যাত খেলোয়াড় ভ্লাদিস্লাভ ত্রেতিয়াক বলেছেন:

"এটা রাশিয়ার হকি দুনিয়ার এক অপূরণীয় ক্ষতি. ইয়ারোস্লাভলে অনেক খুব ভাল খেলোয়াড় খেলতেন, তাঁরা আমাদের জাতীয় দলেরও সম্ভাব্য সব খেলোয়াড়. এখন আমার কোন কথা বলতেই কষ্ট হচ্ছে".

বিশ্বের খেলার ইতিহাসে ইয়ারোস্লাভল শহরের ট্র্যাজেডির মত ঘটনা একবার ঘটে নি. এর মধ্যে সবচেয়ে বড় একটি – ২০০৯ সালের ১৫ই জুলাই ইরানের কিশোর জুডো খেলোয়াড়দের দল ইয়েরেভান শহরে উড়ে আসার পথে মারা গিয়েছিল. এক বছর আগ কিরগিজিয়াতে গাড়ী দুর্ঘটনায় ইরানের কিশোর ভলিবল দলের ১০ জন সদস্য মারা গিয়েছিল. ১৯৭৯ সালের ১১ই আগষ্ট মাটির থেকে ৮৪০০ মিটার উচ্চতায় দুটি বিমানের সংঘর্ষে তাশখন্দ শহরের বিখ্যাত ফুটবল দল "পাখতাকোর" এর ১৭জন ফুটবল খেলোয়াড় ও প্রশিক্ষক নিহত হয়েছিলেন. ১৯৫০ সালের ৫ই জানুয়ারী জটিল আবহাওয়া পরিস্থিতিতে তৃতীয় বার নামার চেষ্টা করার সময়ে স্ভেরদলভস্ক (এখন ইকাতেরিনবুর্গ) শহরের বিমানবন্দরের কাছে লি – ২ বিমান ধ্বংস হয়ে যায়. সোভিয়েত দেশের বিমান বাহিনীর আইস হকি দলের ৮জন সদস্য ও তাঁদের সঙ্গে প্রশিক্ষক, শরীর চর্চা বিশেষজ্ঞ নিহত হয়েছিলেন. এই ধরনের ট্র্যাজেডির তালিকায়- মার্কিন জাতীয় দলের বক্সিং খেলোয়াড়দের  ও ফিগার স্কেটিং দলের খেলোয়াড়দের মৃত্যু. ১৯৫৮ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারী পশ্চিম জার্মানীর মিউনিখ শহরের বিমানবন্দরে উড়ানের সময়ে ধ্বংস হয়েছিল এক বিমান, যেখানে ছিলেন ব্রিটেনের "ম্যানচেস্টর ইউনাইটেড" দলের ফুটবল খেলোয়াড়েরা. মারা গিয়েছিলেন ২৩ জন, তার মধ্যে ৮ জন খেলোয়াড়, ট্রেনার, দলের পরিচালকেরা ও ৮ জন খেলার রিপোর্টার.

ইয়ারোস্লাভল শহরের কাছে ধ্বংস হওয়া বিমানের মধ্যে বিমান কর্মী সহ ৪৫ জন ছিলেন. "তুনোশিনা" বিমানবন্দর থেকে উড়ানের অব্যবহিত পরেই বিমানটি ভোলগা নদীতে ভেঙে পড়ে ও তাতে আগুণ ধরে যায়. গতকাল সকালে রাশিয়ার বিপর্যয় নিরসন দপ্তরের কর্মীরা ৪৩ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করেছেন. বেঁচে রয়েছেন শুধু দুই জন. হকি খেলোয়াড় আলেকজান্ডার গালিমভ ও বিমান কর্মী আলেকজান্ডার সিজভ. তাঁদের অবস্থা, এখনও খুবই কঠিন, মস্কোর অস্ত্রোপচার ইনস্টিটিউটের প্রধান চিকিত্সক ভালেরি কুবীশকিন গতকাল সন্ধ্যায় বলেছেন:

"আমাদের এখানে সব রকমেরই ব্যবস্থা রয়েছে এঁদের চিকিত্সার জন্য. হকি খেলোয়াড় গালিমভের খুবই কঠিন আঘাত লেগেছে – তাঁর শরীরের শতকরা নব্বই ভাগ পুড়ে গিয়েছে ও শ্বাস নালীও পুড়ে গিয়েছে. আরও কঠিন হাল তাঁর বামদিকের ফুসফুসের. তাঁর সম্বন্ধে এখনই কোন কথা বলা ঠিক হবে না. তবে পরিস্থিতি স্থিতিশীল, এটাই আমাদের আস্বস্ত করেছে, আমরা বিশ্বাস করতে চাই যে, শক্ত ও ভাল খেলোয়াড় সুলভ স্বাস্থ্য সুস্থ হয়ে উঠতে সাহায্য করবে".

দ্বিতীয় বেঁচে থাকা আলেকজান্ডার সিজভ কে পাঠানো হয়েছে মস্কোর আরও একটি নামী হাসপাতালে. তাঁর অবস্থাও এখনও কঠিন.

শুক্রবার রাত্রে খুঁজে পাওয়া দুটি ব্ল্যাক বক্স থেকেই তথ্য উদ্ধার করা শুরু হয়েছে. বিশেষজ্ঞরা আশা করেছেন যে, এই তথ্য থেকেই প্রমাণ পাওয়া যাবে কোন এই বিমান উড়তে গিয়ে পড়ে গিয়েছিল. বর্তমানে বেশীর ভাগ বিশেষজ্ঞই দুটি বিষয় নিয়ে বলছেন, এক যান্ত্রিক ত্রুটি, দুই পাইলটদের ভুল. প্রসঙ্গতঃ এই দুটি জিনিস একে অপরের সঙ্গে জড়িত. তাছাড়া, জানা আছে যে, এই ট্র্যাজেডির কারণ আবহাওয়া হতে পারে না, কারণ সেই সময়ে আবহাওয়া খুবই ভাল ছিল. এছাড়া সন্ত্রাসবাদের বিষয়ে সন্দেহ করাও হচ্ছে না – কারণ দুর্ঘটনার জায়গায় কোন রকমের বিস্ফোরকের চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায় নি.

এই বিপর্যয়ে নিহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারের সঙ্গে ৩৬ জন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কাজ করছেন. সমস্ত ধরনের প্রয়োজনীয় মানসিক সাহায্য একই সঙ্গে রাশিয়ার বিপর্যয় নিরসন মন্ত্রণালয়ের জরুরী মানসিক সাহায্য কেন্দ্র থেকেও করা হচ্ছে.