ইয়ারোস্লাভল শহরে তৃতীয় বিশ্ব রাজনৈতিক সম্মেলনে মূল বিতর্ক হচ্ছে তিনটি বিভাগে: "বহু প্রজাতি বিশিষ্ট সমাজে গণতান্ত্রিক ইনস্টিটিউট গুলি", "ধনী ও দরিদ্র লোকেরা: ন্যায্য ব্যবস্থা কোথায়?" ও "বিশ্বের নিরাপত্তা ও স্থানীয় বিরোধ". এই সমস্ত বিষয়ে আলোচনা করতে ভোলগা নদীর তীরে এই শহরে এসেছেন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা. এখানে যেমন ন্যাটো জোটের প্রাক্তন সচিব, তেমনই নোবেল বিজয়ী, আর তাদের সঙ্গেই রয়েছেন সবচেয়ে প্রখ্যাত সাংবাদিকেরা, সমাজ বিজ্ঞানীরা ও জনসংখ্যা বিশারদেরা. সবচেয়ে বড় বিতর্ক হয়েছে "বিশ্বের নিরাপত্তা ও স্থানীয় বিরোধ" বিভাগে.

    পৃথিবী বদলে যাচ্ছে. আর তা দ্রুত পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে. রাজনীতিবিদ ও সামরিক বাহিনীর লোকেদের এটা মানতেই হবে ও চেষ্টা করতে হবে আধুনিক সমাজের সমস্যার উপযুক্ত সমাধান খুঁজে নেওয়ার. এটাই "বিশ্বের নিরাপত্তা ও স্থানীয় বিরোধ" বিভাগের অংশগ্রহণকারীদের সম্মিলিত মত. যেমন ২০০১ সালের আগে বিশ্ব তৈরী ছিল না ১১ই সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসবাদী হানার জন্য, তেমনই এখন তারা তৈরী নয় আরব বসন্তের জন্য, সারা নিকট প্রাচ্যকেই যা পাল্টে দিয়েছে, আগে যাকে ভুল করে ভাবা হত শান্ত এলাকা.

    তার উপরে, রাশিয়ার সংযুক্ত রাজ্য সভার আন্তর্জাতিক পরিষদের সভাপতি মিখাইল মার্গেলভের মতে, টিউনিশিয়া, ইজিপ্ট, লিবিয়া ও এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশের সরকারই বিপ্লবের জন্য জমি তৈরী করেছিল, তিনি বলেছেন:

    "এখানের যুব সমাজের বিরক্তি ধরে গিয়েছিল নিজেদের দেশের ভিতরেই অভিবাসনে থাকতে, বিরক্তি ধরে গিয়েছিল বাইরের দেশে পরবাসে যেতে. তাদের বিরক্তি হয়েছে বেকারত্ব. তারা নিজেদের দেশের আত্মগত কারণেই জটিল মানসিকতার নেতাদের নিয়ে লজ্জা হয়েছে, যারা কখনোই কোন নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন নি. এই এলাকার নেতারা নিজেদের গদী দখল করার কাল অযথা বাড়িয়েছেন. তাদের চারপাশের লোকেরা দেশের সমস্ত ধন সম্পদকে নিজেদের কুক্ষিগত করেছে. এই সব দেশের প্রশাসনে থাকা রাজনৈতিক এলিট লোকেরা খোলাখুলি ভাবেই দেশে মধ্যবিত্ত শ্রেনীর উদয় খেয়াল করতে পারে নি, যারা সবচেয়ে সক্রিয়, আত্ম বিশ্বাসী. সরকার ঐস্লামিক দল গুলির সঙ্গে লড়াইয়ের নাম করে সমস্ত বিরোধী পক্ষকেই ধ্বংস করেছে. সেই লিবিয়াতেই যে কোন রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ছিল. কারণ তাদের মহান নেতা মুহম্মর গাদ্দাফি নিজের সবুজ বইতে লিখেছেন যে অন্য দল বানাবে সেই বিশ্বাসঘাতক (!)".

    রেডিও রাশিয়া যে সমস্ত বিশেষজ্ঞদের সাক্ষাত্কার নিয়েছে, তাঁরা বলেছেন আরব দুনিয়াতে বিপ্লব পরবর্তী সময়ের ক্ষমতার চেহারা এখনও বোঝা যাচ্ছে না. এখনও নতুন প্রশাসন তৈরী হয় নি, এই রকমের একটা অস্থিতিশীল সময় অনির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত বেড়েই চলেছে. তার ওপরে আলজিরিয়াতে, পারস্য উপসাগরীয় রাজতন্ত্রের দেশ গুলিতেও সামাজিক বিস্ফোরণ ঘটতেই পারে.

    কিন্তু এই অঞ্চলের প্রধান উত্তপ্ত জায়গা আবার হতে চলেছে প্যালেস্টাইন. ইজরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক আবার তীক্ষ্ণ হয়েছে, তেল- আভিভের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে আঙ্কারা, আর হেমন্তে প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রসঙ্ঘের সদস্য পাওয়ার জন্য আবেদন করবে এমন কথা রয়েছে. বার্ড কলেজের পররাষ্ট্র রাজনীতি ও কলা বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ও দ্য আমেরিকান ইন্টারেস্ট জার্নালের পর্যবেক্ষক ওয়াল্টার রাসেল মিড রেডিও রাশিয়াকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাত্কারে ঘোষণা করেছেন যে, প্যালেস্টাইনের পক্ষে রাষ্ট্রসঙ্ঘের সদস্য পদ পাওয়া বোধহয় সম্ভব হবে না, তিনি বলেছেন:

    "আমি মনে করি না যে প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রসঙ্ঘের নতুন পদ পাবে. খুব সম্ভবতঃ, তারা ভোট দানের অধিকার বিহীণ পর্যবেক্ষক দেশ হয়েই থাকবে. আমি মনে করছি যে, ওবামা প্রশাসন বোধহয় তাদের সদস্য পদ পাওয়ার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রসঙ্ঘে ভোট দেবে".

    এই ফোরামে খুব একটা কম মনোযোগ মধ্য এশিয়াতে নিরাপত্তার বিষয়ে দেওয়া হয় নি. ২০১৪ সালে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা বাহিনী ফিরে যাওয়ার কথা. আর এটা আঞ্চলিক ভারসাম্য সুরক্ষিত রাখার প্রশ্নকে তীক্ষ্ণ করেছে. বিশেষজ্ঞরা বিশ্বাস করেন যে, কাবুল এখনও নিজেরা নিরাপত্তা বজায় রাখতে পারবে না, আর আমেরিকা ও ন্যাটো জোট এখানের সরকারকে নতুন সমস্যার প্রতি অপ্রস্তুত অবস্থায় রেখে ফিরে যাচ্ছে.

    মূল ভার তখন পড়বে রাশিয়া ও যৌথ নিরাপত্তা চুক্তির সদস্য দেশ গুলির উপরেই. এই কথা মনে করে এই চুক্তি সংস্থার সচিব নিকোলাই বরদ্যুঝা ইয়ারোস্লাভলের সম্মেলনে ঘোষণা করেছেন যে, ন্যাটো আসলে এই অঞ্চলে নিরাপত্তা রক্ষার প্রশ্নে যৌথ নিরাপত্তা চুক্তি সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতা করতে অস্বীকার করেছে, তিনি বলেছেন:

    "ন্যাটো জোট আমাদের সঙ্গে কোন আলোচনা করছে না. তারা আপাততঃ, যা আমি বুঝতে পেরেছি, এই ধরনের সহযোগিতার জন্য তৈরী নয়. কিন্তু তৈরী নয় কোন রাজনৈতিক কারণে. যদিও মধ্য এশিয়াতে ন্যাটো জোট ও যৌথ নিরাপত্তা চুক্তি সংস্থার পারস্পরিক সহযোগিতার প্রয়োজন বহুদিন আগেই দেখতে পাওয়া গিয়েছে".

    আঞ্চলিক বিরোধ ও সঙ্কট আন্তর্জাতিক সংস্থা গুলির কাজ কর্মেরও সমস্যা গুলিকে খুলে ধরেছে. সেই গুলি খুবই মন্থর ও যে কোন সিদ্ধান্তই এখানে নেওয়া হচ্ছে খুবই ব্যুরোক্রাসী সমস্যার মধ্য দিয়ে. রাশিয়ার প্রাক্তন পররাষ্ট্র মন্ত্রী ও জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব ইগর ইভানভ মন্তব্য করেছেন:

    "দেখাই যাচ্ছে যে, আর বিলম্ব না করে সাবধানে অথচ গভীর সংশোধন করতে হবে রাষ্ট্রসঙ্ঘে. আঞ্চলিক সংস্থা গুলির ভূমিকাকেও বাড়াতে দিতে হবে, হতে পারে এমনকি রাষ্ট্রসঙ্ঘের কিছু দায়িত্ব এই গুলির হাতে তুলে দিতে হবে. আন্তর্জাতিক আইনের সংশোধনের জন্যও খুব সাহসী পদক্ষেপ নিতে হবে. আমরা আন্তর্জাতিক আইনের সেই সমস্ত ধারা নিয়ে চলতে পরি না, যা লেখা হয়েছিল ঠাণ্ডা যুদ্ধের সময়ে ও তার পূর্ববর্তী বছর গুলিতে".

    "বিশ্বের নিরাপত্তা ও স্থানীয় বিরোধ" বিভাগেই রাশিয়া ও পশ্চিমের মধ্যে আঞ্চলিক বিরোধের সমাধানের পথ নিয়ে বিভিন্নতা রয়েছে. মস্কো দেশ গুলির সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্ভাব্য সবচেয়ে বেশী সম্মান প্রদর্শন করে কূটনৈতিক পদ্ধতি ব্যবহার করে বিরোধের সমাধান খুঁজতে চায়. ন্যাটো জোটের দেশ গুলি মনে করে যে, তারা অন্য দেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানোর অধিকার রাখে, যদি তাদের মনে হয় যে, সেখানে প্রধান মূল্যবোধ গলির উপরে অন্যায় করা হচ্ছে. এই বিষয়ে বলেছেন ন্যাটো জোটের প্রাক্তন সচিব লর্ড জর্জ রবার্টসন. তিনি অবশ্য স্বীকার করেছেন যে, জোটের সমস্ত অনুপ্রবেশ করার পদ্ধতিই সফল হয় নি.

    একটা বিষয়ে বিতর্কের সমস্ত অংশগ্রহণকারীই একমত হয়েছেন. সারা বিশ্ব জুড়ে স্থিতিশীলতা রক্ষা করার জন্য ন্যাটো জোটের মত কোন আলাদা সংস্থার শক্তি প্রয়োগ  যথেষ্ট নয় আর আঞ্চলিক ভাবে বিশ্বকে ভাগ করে দেখার যে নীতি চলে আসছে, তাও টিকে থাকতে পারবে না. বিগত বছরই খুব উজ্জ্বল করে প্রমাণ করে দিয়েছে যে, বিশ্বের একটি এলাকায় চাঞ্চল্যকর ঘটনা এখন অন্যান্য এলাকাতেও প্রতিধ্বনি তোলে.