ইরাক আফগানিস্তান, লিবিয়া... এই সব দেশ গুলিই কোন পরিকল্পনা নেয় নি, অথবা লিবিয়ার মত নিজেদের পারমানবিক পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছিল. আর বর্তমানে এই সমস্ত দেশের প্রশাসনই পশ্চিমের চাপের কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে. এই প্রসঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো জোটের মাপে তেমনই অসুবিধা সৃষ্টি কারী দেশ ইরান, সিরিয়া, উত্তর কোরিয়া, যারা বর্তমানে নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞার কবলে রয়েছে, আপাততঃ সাফল্যের সঙ্গেই "লিবিয়ার চিত্রনাট্যের" পুনরাবৃত্তি এড়াতে পেরেছে. আর বহু বিশেষজ্ঞই বর্তমানে সাবধান করে দিচ্ছেন: নিকট ও মধ্য প্রাচ্যের দেশ গুলি এবারে অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু করতে চলেছে. প্রসঙ্গতঃ অনেকেই চেষ্টা করছে পারমানবিক প্রযুক্তি আয়ত্ত করার. যদি পরে দরকার হয়.

    বিগত মাস গুলিতে নিকট প্রাচ্যের ও উত্তর আফ্রিকায় ক্রমাগত চলা উত্তেজনা আরব দুনিয়ার বেশ কিছু উল্লেখ যোগ্য খবর কে ঢেকে দিয়েছে. "রেডিও রাশিয়া" যেমন আগেও জানিয়েছে যে, ইরান জুলাই মাসের শেষে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার জন্য নতুন সেন্ট্রিফিউজের কাঠামো "ফোর্দু" কারখানায় লাগানো শুরু করেছে. আর এই কারখানার উপরে আমেরিকার একটি পাইলট বিহীণ বিমানকেও ধ্বংস করেছে. এক মাস আগে – জুন মাসে – আন্তর্জাতিক পারমানবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ সংস্থার কার্যকরী সভা সিরিয়াকে রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে জবাব দেওয়ার জন্য আহ্বানের দাবী জানিয়েছিল. এই সংস্থা দামাস্কাস কে পারমানবিক পরিকল্পনা গোপন করেছে বলে অভিযুক্ত করেছে. ওয়াশিংটন এখনই খোলাখুলি ভাবে বলছে যে, সিরিয়া বিশ্বের জন্য ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়েছে.

    আর দামাস্কাসের এখন করার মত কিই বা আছে? – বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন. আফগানিস্তান ও ইরাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনুপ্রবেশের পরে, এক সার বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে যাওয়ার পরে, মুহম্মর গাদ্দাফিকে ন্যাটো জোটের শক্তি দিয়ে টেনে নামানোর পরে, বহু আরব দেশেরই খুবই অল্প বেছে নেওয়ার পথ বাকি রয়ে গেছে – হয় পশ্চিমের দেশ গুলির কাছে মাথা হেঁট করে যাওয়া, অথবা একেবারে সর্ব্বাঙ্গ অস্ত্র সজ্জিত করা, এই কথা মনে করে "বিশ্ব রাজনীতিতে রাশিয়া" জার্নালের প্রধান সম্পাদক ফিওদর লুকিয়ানভ বলেছেন:

    "অবশ্যই, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যে সমস্ত দেশ ও তাদের প্রশাসন প্রভাব সৃষ্টি করার মতো অবস্থায় রয়েছে, তাদের সিদ্ধান্ত একেবারেই এক: গণহত্যার অস্ত্র থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখা অসম্ভব, কারণ এটাই একমাত্র গ্যারান্টি, যে তোমার গায়ে হাত দেওয়া হবে না. আর এই অর্থে খুবই দেখার মত উদাহরণ উত্তর কোরিয়া. পিয়ংইয়ং সমস্ত দিক থেকেই অনেক দিন আগেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাজের জায়গা হতে পারতো, তাদের দেশের প্রশাসনের বদলের জন্য. তা সত্ত্বেও এই রকম কিছু ঘটছে না, কারণ এই রকমের অনধিকার প্রবেশের মূল্য হতে পারতো অনেক বেশী. প্রথমতঃ, উত্তর কোরিয়ার কাছে যতই আদিম মনে হোক না কেন, পারমানবিক অস্ত্র রয়েছে বলে ও তাদের রকেট ব্যবস্থা নিয়েও পরিকল্পনা রয়েছে বলে".

    এই প্রসঙ্গে পশ্চিম নিজেই ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মত অনুযায়ী "অগণতান্ত্রিক" প্রশাসনের দেশ গুলিকে তাদের ক্ষমতাসীন দলের লোকেদের শুদ্ধু দেওয়ালে পিঠ দিতে বাধ্য করছে. তাদের উপর জোর করে সেই সমস্ত দেশের জন্য খুবই খারাপ ভাবে টিকে থাকতে পারে এমন সব গণতন্ত্র ও মানসিকতার মডেল চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তাদের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নাক গলাচ্ছে, নতুন প্রযুক্তি থেকে তাদের সম্ভাব্য ব্যবহার করার পথ বন্ধ করে দিয়েছে. দেখা যাচ্ছে যে পারমানবিক শক্তিধর দেশ গুলির ক্লাব নিজেদের বিরোধী পক্ষের উপরে স্রেফ চাপ সৃষ্টি করেছে, এই রকম মনে করে সেন্ট পিটার্সবার্গের আধুনিক নিকট প্রাচ্য গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান গুমের ইসায়েভ বলেছেন:

    "অন্য সকলের জন্যই পারমানবিক প্রযুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম. তার ওপরে সামরিক পারমানবিক প্রযুক্তি সম্বন্ধে তো বটেই. কিন্তু সেই সমস্ত দেশ, যারা তা স্বত্ত্বেও নিজেদের পারমানবিক বোমা বানাতে পেরেছে, তাদের জন্য ব্যবস্থা অন্য রকমের. আমার মনে হয়েছে যে ইরাকে, আফগানিস্তানে, লিবিয়াতে যুদ্ধ এই অঞ্চলে পারমানবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু করাবে".

    আরব বিশ্বে খুব একটা কম বিরক্তি ইজরায়েলের পরিস্থিতি নিয়ে হয় নি. ইজরায়েলের যে পারমানবিক অস্ত্র রয়েছে, তা সম্বন্ধে জানে না শুধু বাচ্চারা. সরকারি ভাবে তেল- আভিভ এই বিষয়ে স্বীকার করতে চায় না. আর পশ্চিম প্রশ্ন তোলা ঠিক হবে না মনে করেছে. তার ওপরে, ইজরায়েল নিজেদের গবেষণার উপরে আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ রাখতে অস্বীকার করেছে. আর এই ইহুদী রাষ্ট্রের সামরিক সক্রিয়তা হিসাব করলে – তাদের প্রতিবেশী দেশ গুলিও অস্ত্র প্রতিযোগিতায় নামবে, এই কথা বলেছেন লেবাননের "আল- মুতা ভাসিত" জার্নালের প্রধান সম্পাদক হুসেইন নাসরুল্লা:

    "ইরাকে, লিবিয়াতে, আফগানিস্তানে যুদ্ধ অনেকের জন্যই আরও একবার সেই প্রবচনের প্রমাণ হয়েছে – "জোর যার মুল্লুক তার". আর বহু দেশই নিজেদের আর বাইরের আগ্রাসন থেকে নিরাপদ বলে মনে করছে না. এখানে গ্যারান্টি কি হতে পারে? এমন অস্ত্র রাখা, ভাল হয় পারমানবিক অস্ত্র হলে, গণহত্যার উপযুক্ত অস্ত্র হলে. এটা সম্ভাব্য আগ্রাসন কারীকে ভাবাতে পারে. আমি মনে করি যে, খুবই শীঘ্র বহু দেশেরই সামরিক বাজেট, তার মধ্যে আরব দেশ গুলিও রয়েছে, খুব বেশী রকমের বেড়ে যাবে. অন্য বিকল্প হল – নতুন শক্তির কেন্দ্র গুলিতে নিজেদের জোটের উপযুক্ত শক্তি খোঁজ করার – যেমন, ব্রিকস দেশ গুলির মধ্যে হতে পারে".

    বিগত কয়েক মাসের ঘটনা, সন্দেহ নেই যে, বহু দেশকেই বাধ্য করেছে, প্রাথমিক ভাবে আরব দেশ গুলিকে, নিজেদের সামরিক ক্ষমতা বৃদ্ধি করার. মুহম্মর গাদ্দাফি নিজেই লিবিয়ার পারমানবিক পরিকল্পনা প্রত্যাখান করেছিলেন আর সব রকম ভাবে পশ্চিমের সঙ্গে সহযোগিতা করেছিলেন, সবচেয়ে বেশী ভাবে প্রদর্শন করেছিলেন নিজের থেকে তাদের প্রতি অনুরক্তি. কিন্তু তাকে এটা পতন থেকে রক্ষা করতে পারে নি, আর তাও "পুরনো বন্ধুদের" হাতেই. আর মনে তো হয় না যে, বর্তমানের কোন শাসকই তাঁর ভাগ্যের পুনরাবৃত্তি নিজের ক্ষেত্রে চাইবেন.