ন্যাটো ভারতকে আরও সক্রিয়ভাবে সবচেয়ে বিস্তৃত সহযোগিতায় আহ্বানের লক্ষ্যে এগিয়েছে – সন্ত্রাসবাদ ও জলদস্যূ দমন থেকে শুরু করে সাইবার নিরাপত্তা ও রকেট প্রতিরোধ ব্যবস্থা পর্যন্ত. এই সম্বন্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাটো জোটে স্থায়ী প্রতিনিধি ইভো ডাডলারের কথা উল্লেখ করে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবারে বেশ কয়েকটি প্রধাণ ভারতীয় সংবাদপত্রে লেখা বেরিয়েছে.

    টাইমস ইন্ডিয়া সংবাদপত্র আরও একজন ন্যাটোর উচ্চপদস্থ কর্মীর কথা উল্লেখ করেছে: "যেমন, ন্যাটো জোট সক্রিয়ভাবে রকেট প্রতিরোধ প্রযুক্তি ব্যবস্থা উন্নত করছে. আমরা আমাদের জ্ঞান বণ্টন করতে তৈরী, একসাথে মহড়া ও দেওয়া যেতে পারে. শেষমেষ আমরাও একই ধরনের বিপদের আশঙ্কায় রয়েছি ".

    ন্যাটো জোটের প্রতিনিধিদের সম্মিলিত বক্তব্যের সুর, যা ভারতের প্রকাশনা উল্লেখ করেছে, তা সেই দিকেই যাচ্ছে যে, ভারত তাদের মানসিকতা, যা ঠাণ্ডা যুদ্ধের সময়ের ছিল, তা যেন ত্যাগ করে, জোট নিরপেক্ষ নীতি থেকে সরে আসে ও সক্রিয়ভাবে আন্তর্জাতিক (পাঠক: এখানে পড়ুন ন্যাটো জোটের নেতৃত্বে) নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যোগ দেয়.

মনে তো হয় না যে, এই খবর এখন হঠাত্ করেই বার করা হয়েছে, - এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

"লিবিয়াতে ন্যাটো জোটের অপারেশন শেষ হওয়ার মুখে, আর পরে কি করা দরকার তা যেমন ত্রিপোলিতে, তেমনই ওয়াশিংটনে জানা নেই, এমনকি ব্রাসেলস শহরেও কেউ জানে না. আফগানিস্তান থেকে ন্যাটো জোটের সেনা ফিরিয়ে নেওয়ার কথা হয়েছে  - তারিখ পাকা ২০১৪ সাল, কিন্তু এই দেশ থেকেও সৈন্য ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরে কি হবে তা জানা নেই, কেউ বলতেও পারে না. আর বিগত সময়ের ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে যে, কোন একটা ভাল কিছু সেখান থেকে পাওয়ার আশা নেই – ২০১১ সালের আগষ্ট মাস জোটের জন্য সবচেয়ে রক্তাক্ত হয়েছে, মার্কিন সেনা বাহিনীর গত দশ বছরের যুদ্ধের সমস্ত সময়ের মধ্যে. তাই পশ্চিম ও প্রাথমিক ভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই সময়ে এই এলাকায় ভরসা যোগ্য জোটের সঙ্গী দরকার.

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বহুদিন হল ভারতকে ভূ রাজনৈতিক ক্ষেত্রে দলে টানার রাজনীতি চালিয়ে যাচ্ছে. আর তার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক কারণও রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর ভারত দুই পক্ষই চিনের আঞ্চলিক প্রভাব বৃদ্ধিতে চিন্তিত হয়েছে, তাই আমেরিকা – ভারত জোট এখন স্বাভাবিকই দেখাচ্ছে".

ন্যাটো জোটের কর্মচারীদের বক্তব্যের সুরে বিশেষ করে "ঠাণ্ডা যুদ্ধের ধারণা" বিষয়টির প্রতি জোর দেওয়া দেখতে পাওয়া যাচ্ছে. ন্যাটো জোটের কর্মচারীরা খুবই কৌশল করে ঐতিহাসিক বাস্তব নিয়ে খেলা করছে – এই রকম মনে করেন বরিস ভলখোনস্কি, তাই বলেছেন:

"ঠাণ্ডা যুদ্ধের বছর গুলিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমের দেশ গুলি ও সোভিয়েত দেশের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক দেশ গুলির মধ্যে জোট বদ্ধ বিরোধিতা ছিল ঠিকই. কিন্তু জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন ও তার সর্বজন বিদিত নেতৃত্বে থাকা ভারতবর্ষই খুব কম ভূমিকা নেয় নি দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধের তীক্ষ্ণতাকে লাঘব করতে ও "ঠাণ্ডা যুদ্ধকে" "উত্তপ্ত সংঘর্ষে" পরিনত না হতে দিতে. সুতরাং – জোট নিরপেক্ষতা – "এটা ঠাণ্ডা যুদ্ধের ধারণা বাঁচিয়ে রাখার প্রচেষ্টা নয়". বরং একটি অন্যতম বিষয়, যা শেষ অবধি এই ঠাণ্ডা যুদ্ধের অবসানকে সম্ভাব্য করেছে".

আজকের দিনের বিশ্বে স্ট্র্যাটেজিক পরিস্থিতি একেবারেই বদলে গিয়েছে. কিন্তু পশ্চিমের কিছু বৃত্তে এখনও বিরোধের মানসিকতা রয়েই গিয়েছে. তারা এখন দেখছে চিনের মধ্যে নতুন বিরোধী পক্ষকে. সেই জন্যই ভারতকে নিজেদের দলে নেওয়ার এত মরিয়া চেষ্টা. ন্যাটোর কর্মচারীর কথা মনে করে দেখতে পারি: "ন্যাটো সক্রিয়ভাবে রকেট বিরোধী  প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলছে. আমরা আমাদের জ্ঞান ভাগ (বণ্টন) করতে তৈরী আছি – কারণ আমরা একই ধরনের বিপদের আশঙ্কা করছি".

ইউরোপে আমেরিকার রকেট বিরোধী ব্যবস্থা মেলে ধরার জন্য রাশিয়ার পক্ষ থেকে খুবই আইন সঙ্গত প্রশ্ন তোলা হয়েছে কি ধরনের বিপদ থেকে ন্যাটো জোট ইউরোপকে রক্ষা করার কথা ভাবছে, পূর্ব ইউরোপে নিজেদের রাডার ও রকেট বসিয়ে? কারণ ইরানের থেকে তা হতে পারে না. আর এখন রকেট বিরোধী ব্যবস্থা নিয়ে ভারতকে টানাটানি করার দরকার পড়ল কেন? কার বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা তাক করা হবে? আর এই ব্যবস্থা বসানো হলে এই এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা কি সত্যই বাড়বে, যার কথা জোর গলায় বলতে চান ন্যাটো জোটের কর্মচারীরা, নাকি উল্টো টাই হবে – নতুন করে অস্ত্র প্রতিযোগিতা আর উত্তেজনা বৃদ্ধি শুরু হবে?

আর সব থেকে বড় কথা হল: চিনের এই সম্বন্ধে প্রতিক্রিয়া কি হবে ও কাদের আসলে ঠাণ্ডা যুদ্ধের ধারণা বাদ দেওয়া দরকার?