সিন্ধ প্রদেশের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ ও প্রশাসনের প্রধান পাকিস্তানের জনতা পার্টির জুলফিকার মির্জার রবিবারের ঘোষণা পাকিস্তানে রাজনৈতিক ঝড় তুলেছে ও একই সঙ্গে বহু প্রশ্নের উদয় হয়েছে এই দেশের ভবিষ্যত নিয়ে.

    মনে করিয়ে দিই যে, রবিবারে করাচী শহরের সাংবাদিক কেন্দ্রে বক্তৃতা করতে গিয়ে জুলফিকার মির্জা কোরানে হলফ করে বলেছেন যে, দেশের সিন্ধ রাজ্যের দ্বিতীয় প্রধান রাজনৈতিক দল ঐক্যবদ্ধ জাতীয় আন্দোলন (মুতাহিদা কৌমি আন্দোলন) এর নেতা আলতাফ হুসেইন দোষী কারণ তাঁর দলই করাচী শহরের লুঠপাট ও হত্যা কাণ্ড ঘটিয়েছে – প্রথমতঃ পুস্তুন ও বেলুচিস্থানের লোকদের উপরে. আর পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী রেহমান মালিক কে জুলফিকার মির্জা অভিযোগ করেছেন এই সব অপরাধ ঘটতে দেওয়ার জন্য সহায়তা করার. তার উপরে মির্জার কথা অনুযায়ী আলতাফ হুসেইন নিজে তাঁর কাছে স্বীকার করেছেন যে, তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা অনুযায়ী পাকিস্তানকে খণ্ডিত করার জন্য কাজ করছেন.

    এই প্রশ্ন আজকের দিনের আলোচনার তালিকায় প্রথমেই রয়েছে, এই কথা মনে করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

    "মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের সম্পর্ক বিগত বছর গুলিতে খুবই খারাপ হয়েছে. ২০০১ সালে এই খারাপ হওয়া শুরু হয়েছে, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তালিবদের বিরুদ্ধে আফগানিস্তানে সামরিক অপারেশন শুরু করেছিল, আর তা চলেছে বিগত সমস্ত বছর গুলি ধরেই – পাকিস্তানের প্রশাসনে সামরিক বাহিনী জেনেরাল পারভেজ মুশারফের নেতৃত্বে সেখানে ছিল, নাকি অসামরিক প্রশাসন আসিফ আলি জারদারির নেতৃত্বে সেখানে রয়েছে, তার কোন তোয়াক্কা না করেই".

    এই সব কটি বছর ধরেই পাকিস্তান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের দুটি চরিত্র তৈরী হয়েছে. এক দিকে পাকিস্তানকে প্রয়োজন ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের, তাদের তালিব ও আল- কায়দা দলের জঙ্গীদের সাথে লড়াইয়ের জন্য, যারা আফগান – পাক সীমান্ত প্রদেশের পুস্তুন উপজাতির লোক অধ্যুষিত ও খুবই কম নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে ঘাঁটি গেড়ে বসেছিল. আর অন্য দিকে – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটানা পাকিস্তানকে অভিযোগ করে চলেছে যে, তারা মার্কিন দের মতে, সন্ত্রাসবাদীদের সঙ্গে যথেষ্ট রকমের লড়াই করছে না. আ এখন- একটানা বেশ কয়েক মাস ধরেই – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি তালিবদের নেতৃত্বের সাথে গোপনে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে. নতুন পরিস্থিতিতে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে যে, পাকিস্তানকে মধ্যস্থতা করার মতো কোন পক্ষ হিসাবে আর প্রয়োজন নেই.

    কিন্তু একই সঙ্গে পাকিস্তান যথেষ্ট শক্তিশালী ও প্রভাবশালী দেশ হয়ে রয়েছে এই অঞ্চলে, আর তাদের, বাস্তবে একমাত্র ভরসা যোগ্য সহযোগী দেশ – চিন – যারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান ভূ রাজনৈতিক প্রতিযোগী দেশ এশিয়াতে ও সব মিলিয়ে বিশ্বেও. স্বাভাবিক ভাবেই, এই ধরনের পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একেবারেই আগ্রহী নয় ঐক্যবদ্ধ শক্তিশালী পাকিস্তানে. আর তাই জুলফিকার মির্জার ঘোষণা যে, করাচী শহরের সংঘর্ষ, যা এর মধ্যেই কয়েক শো লোকের প্রাণ হানীর কারণ হয়েছে – এটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাকিস্তানকে উপজাতি লক্ষণ দিয়ে বিভক্ত করার এক বিস্তীর্ণ পরিকল্পনারই অংশ, তা শোনা দরকার. তার উপরে এখন, যখন পশ্চিম, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে খুবই চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, তারা ঠিক কি ভাবে নিজেদের প্রভাব ও প্রতাপ বিস্তারের রাজনীতি করছে বৃহত্ নিকট প্রাচ্য অঞ্চলে – মরক্কো থেকে পাকিস্তান পর্যন্ত, তা প্রকট হয়েছে. তাই বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

    "দেখাই যাচ্ছে এই ধরনের কাজের জন্য চিত্রনাট্য অনেক গুলি হতে পারে. করাচী শহরের বিদ্রোহ - তার একটা. এখানে গুরুত্বপূর্ণ এটা নয় যে, তার পিছনে বাস্তবে কি রয়েছে – স্থানীয় গুণ্ডাদের হিসাব, উপজাতি লক্ষ্য করে ধ্বংস করা অথবা খুব একটা ভাল জাতের রাজনীতি না করা লোকেদের প্ররোচনা. এখানে যথেষ্ট হবে এই টুকু বললেই যে, বিশ্বের নানা টেলিভিশনের চ্যানেলে লড়াইয়ের অংশ ও তার পরে পুলিশ বাহিনী দিয়ে তার উপরে চাপ সৃষ্টি করা দেখানো হলেই সেটাকে সারা দেশের বিদ্রোহ বলে দেখানো যেতে পারে ও সরকারের পক্ষ থেকে তার উপরে নৃশংস দমন করা হচ্ছে বলা যেতেই পারে".

    এখানে বাদ দেওয়া যায় না যে, পাকিস্তানে ভারতের মতই কোন কাজ করা যেতে পারে, আর সেটা দুর্নীতির বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদও হতে পারে. ভারতের মত পাকিস্তানেও দুর্নীতি সমাজের সমস্ত স্তরে রয়েছে ও তা আরও বেশীই হতে পারে, আর এর মধ্যেই পাকিস্তানের বেশ কিছু সামাজিক কর্মী ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত সংবাদ মাধ্যম ডাক দিয়েছে আন্না হাজারের উদাহরণ অনুসরণ করার জন্য. প্রসঙ্গতঃ, যদি ভারতে বিরোধী ও প্রশাসন দুই পক্ষই নিজেদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যে ধরে রাখতে পেরে তাকে, তবে পাকিস্তানে যে তা শান্তিপূর্ণ ভাবেই শেষ হবে এমন কোন গ্যারান্টি দেওয়া যায় না.

    আর একই সময়ে বিশ্বের সমস্ত সংবাদ মাধ্যমে খবর ছাড়া হচ্ছে যাতে পাকিস্তানের একটা জানা কথাই এমন খারাপ ইমেজ তৈরী হয়. জোর গলায় বলা হচ্ছে যে, পাকিস্তান সোমালির জলদস্যূ প্রস্তুত করছে. এর প্রমাণ হিসাবে উপস্থিত করা হয়েছে শুধু ধরা পড়া জলদস্যূদের জাহাজে পাকিস্তানে তৈরী অস্ত্র ও খাবার পাওয়া গিয়েছে, তার কথা.

    পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা হ্রাসের পরিপ্রেক্ষিতে ও শাসক দল জাতীয় জনতা দলের উপরে ও বিরোধী নওয়াজ শরীফের দল মুসলিম লীগের উপরেও মানুষের বিশ্বাস কমে যাওয়ার পরিস্থিতিতে খারাপ দিকে পরিস্থিতি হওয়ার সম্ভাবনাও বেড়ে গিয়েছে. বিশেষ করে যদি বাইরের শক্তি এই বিষয়ে আবার মদত যোগায়.

    আপাততঃ, সত্য যে, সামরিক বাহিনী এখনও নিজেদের দিক থেকে কিছু বলে নি – যা এই দেশের সবচেয়ে প্রভাব শালী শক্তি ও প্রায় একমাত্র জাতিগত ঐক্য ধরে রাখার মতো ক্ষমতাশালী গ্যারান্টি. এই সমস্ত উদ্বেগ জনক ঘটনার মধ্যে দেশের সামরিক বাহিনীর নেতা আশফাক পারভেজ কায়ানি কয়েকদিন আগে ঘোষণা করেছেন যে, "জাতির আশা সামরিক বাহিনী বাস্তবায়িত করবে".