দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলন, যা আন্না হাজারে আজ তাঁর বহু লক্ষ উত্সাহী সমর্থকদের নিয়ে চালিয়ে যাচ্ছেন, তা অনেকদিনই আর শুধু ভারতের ঘটনা হয়ে নেই ও তা যেমন ভারতের প্রতিবেশী দেশ গুলি থেকে, তেমনই বহু দূরের দেশ গুলি থেকেও গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখা হচ্ছে. প্রতিবেশী পাকিস্তানে বিখ্যাত সামাজিক কর্মী ও মানবাধিকার রক্ষা কর্মী আনসার বার্নি আশ্বাস দিয়েছেন যে, এবারে তিনিও আন্না হাজারের মতো দুর্নীতি নির্মূল করার জন্য লড়াই করবেন. "বেশী দেরী হয়ে যাওয়ার আগেই, নাগরিক সমাজ আমাদের দেশের থেকে সমূলে এই অপকর্ম দূর করার জন্য পদক্ষেপ নিতে বাধ্য" – ঘোষণা করেছেন বার্নি, একই সঙ্গে পবিত্র রমজান মাসের শেষেই তাঁর ব্যক্তিগত আন্দোলন শুরু করার কথা বলেছেন, অর্থাত্ আগামী সপ্তাহের শুরুতেই.

    নিকট প্রাচ্যের গত ঘটনা গুলি হতে পারে যে, বিশ্ব সমাজের চোখ থেকে ভারতে যা ঘটছে, তা কিছুটা আড়াল করেছে. কিন্তু তা মনে করার মতো জমি তৈরী করতে দিয়েছে যে, বিশ্বে নতুন বিপ্লবের প্লাবন আসছে, আর কোন প্রশাসন – স্বৈরতন্ত্রী বা লিবারেল গণতন্ত্রও – নিজেকে সম্পূর্ণ ভাবে নিরাপদ ভাবতে আর পারবে না.

    একদল লোক দুর্নীতির প্রতিবাদে যারা আন্দোলন করছেন, তাদের সহমর্মীতা দেখাচ্ছেন, অন্যেরা এর মধ্যেই খুবই স্থিতিশীলতা নষ্ট করার মতো সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছেন, যা ভারতের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের জন্য বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে. বিখ্যাত লেখিকা ও সমাজ কর্মী অরুন্ধতি রায় সোজাসুজিই লিখেছেন: "মাওবাদী ও জন লোকপাল বিল আন্দোলনের একটা সাধারন লক্ষণ রয়েছে – এরা ও তারাও ভারতের রাষ্ট্রকেই উল্টে দিতে চাইছে". আর তাঁর নিজের প্রবন্ধ খুবই অমঙ্গল সূচক কথা দিয়ে শেষ করেছেন: "আমরা দেখতে পাচ্ছি, কি করে ভারতবর্ষকে ক্ষমতার লড়াইয়ের মধ্যে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে – ততটাই মৃত্যুর পথে, যেমন সেই যুদ্ধ, যা আফগানিস্তানে জঙ্গী নেতারা লড়াইয়ের মাঠে করছে. শুধু এবারে বাজি ধরা হয়েছে বেশী, অনেক বেশী".

    রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি এতটা তীক্ষ্ণ মূল্যায়ণের সঙ্গে একমত হতে পারেন নি, তিনি বলেছেন:

    "এত কঠিন মূল্যায়ণের সঙ্গে একমত হওয়া কঠিন. বর্তমানের আন্দোলনের বিশেষত্ব হল যে, তা প্রথম থেকেই শক্তি সংগ্রহ করেছে গণতান্ত্রিক সমাজের আইনে – প্রসঙ্গতঃ এই বিরোধের উভয় পক্ষই গণতন্ত্রের নিয়ম মেনেই চলছে. আনান হাজারে ও তাঁর সমর্থকেরা তাঁদের আন্দোলন করছেন একেবারেই শান্তিপূর্ণ মাধ্যম প্রয়োগ করে, আর সরকারও জনতার মিছিলের উপরে শক্তি প্রয়োগ করে ছত্রভঙ্গ করা থেকে ইচ্ছা করেই বিরত রয়েছে. অর্থাত্ ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অভিজ্ঞতা থেকে যেমন দেখিয়েছে যে, অনেক সময়েই এই শান্তিপূর্ণ ধরনের মাধ্যম অনেক সফল হয়ে থাকে. অন্ততঃ তার ফলে এত পরিমানে হতাহত ও ক্ষয় হয় না, যতটা যেমন হয়েছে লিবিয়াতে বিগত সময়ে. শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের সময়ে পাওয়া আঘাত অনেক দ্রুতই সেরে ওঠে, যতটা দেশ গৃহযুদ্ধ বা বিদেশী শক্তির অনুপ্রবেশের ফলে পেয়ে থাকে, তার চেয়ে".

    আর এটাই বহু দেশে খুবই ভাল ভাবে বোঝা গিয়েছে – ভারতের মতই, যেখানে দুর্নীতি থেকে মানুষে কষ্ট পাচ্ছেন. কয়েক দিন আগে থাইল্যান্ডের ব্যাঙ্কক পোস্ট লিখেছে: "বহু লোকই বিশ্বে আন্না হাজারে ও তার ভারতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনের ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে আছে – এই ইতিহাসের এক বিশিষ্ট প্রতিধ্বনি হয়েছে থাইল্যান্ডে..." তারপর লিখেছে: "যতক্ষণ না অনেক বেশী পরিমানে থাইল্যান্ডের লোক একই ধরনের সঙ্কেত না দেবেন যে, তাঁদের দুর্নীতি একেবারে মৃত্যুর মত অসহ্য লাগছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের দেশে এই বিষয়কে সত্যিকারের নিয়ন্ত্রণ করার মতো সুযোগ আসবে না".

    বাকি রইল শুধু আশা করার, যে এই ধরনের আন্দোলন ভারতবর্ষের মতই অন্যান্য দেশে যেন শুধু শান্তিপূর্ণ সংগ্রামের ধরনেই হয়.