আজকে হয়ত ভারতের জন্য দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রামের চেয়ে বড় কোন বাস্তব বিষয় নেই, আর দুর্নীতির সঙ্গে সংগ্রামে রত সামাজিক কর্মী আন্না হাজারের চেয়ে কোন বহু আলোচিত নেতাও নেই. আর তার সাদা টুপি – তথাকথিত "গান্ধী টুপি" – ভারতের জন্য আবারও আধুনিক ও প্রত্যাশিত অঙ্গ বস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে. গত সপ্তাহ গুলিতে এই ধরনের মাথা ঢাকা টুপির চাহিদা অনেক বেড়েছে. এই টুপি নিয়ে ব্যবসাও অনেক গুণ বেড়ে গিয়েছে, আর অনেক টুপিতেই দেখা গিয়েছে লেখা – আমি আন্না হাজারে.

ভারতে অবশ্যই সকলে জানেন যে, এই টুপির ইতিহাস ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে জড়িত. তখন এই রকমের টুপি পরিহিত অবস্থায় ভারতীয়রা – ব্রিটিশ জেলে রাজ বন্দী হিসাবে থাকতেন. মাথায় এই সাদা টুপি পরে থাকার মানে হত যে, এই মানুষটি ব্রিটিশ শাসকদের স্বৈরাচার থেকে নিগৃহিত হয়েছেন. এই ঐতিহ্যের শুরু হয়েছে মহাত্মা গান্ধী থেকে. আরও বেশী করে এই টুপি জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু তা পরে থাকার পর থেকেই. তিনি এই টুপি ইংরেজ জেল থেকে বের হওয়ার পরেও বহু বছর ত্যাগ করেন নি. কিন্তু আজ গান্ধী টুপি একই রকমের মনে হয় না, এই কথা বলেছেন রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি:

"এটা একটা প্যারাডক্স, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সাদা গান্ধী টুপি অন্য মানে হতে শুরু করেছিল. যদি গত শতকের চল্লিশ- পঞ্চাশের দশকে তা জাতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতীক হয়ে থাকে, তবে পরে তার ইমেজ খুবই উল্টো হয়েছিল. সত্তর – আশির দশকের ভারতীয় সিনেমা দেখলেই বোঝা যাবে যে, যদি কোন চরিত্র মাথায় গান্ধী টুপি পরে থাকে, তবে সে ক্ষমতাসীন উচ্চ শ্রেনীর প্রতিনিধি. আর সে তার চরিত্র ফুটিয়ে তোলার আগেই দর্শকের কাছে যেন কোন সঙ্কেত বার্তায় বলে দিচ্ছে এটা – দুর্নীতি গ্রস্ত সরকারি কর্মী অথবা রাজনীতিবিদ.

প্রায় একই ধরনের ভূমিকা সোভিয়েত দেশের শেষ কিছু বছরের ইতিহাসে নিয়েছিল "লোমের টুপি", সোভিয়েত দেশের কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা এই ধরনের টুপি মাথায় দিতেন, যা এক বছরের বেশী বয়স হয় নি এমন বন্য হরিণ শাবকের চামড়া দিয়ে তৈরী হত. এই ধরনের টুপি থাকার অর্থ হত যে, ব্যক্তিটি উচ্চ পদস্থ লোকেদের একজন. এই ধরনের টুপি অনেকেই কিনতে চাইতেন – তাদের মধ্যে এমনকি সেই সব লোকও থাকতেন, যারা কোন নেতৃত্ব স্থানীয় কাজ করতেন না. আর সোভিয়েত দেশের পতনের সম্বন্ধে কোন সিনেমা হলে, তাতে কোন চরিত্র এই লোমের টুপি পরিহিত থাকলে, সে অবশ্যই নেতিবাচক ও দুর্নীতি গ্রস্ত লোকেদের একজন হত.

কিন্তু যদি রুশী সরকারি কর্মীদের লোমের টুপি নিঃশব্দে ইতিহাসে হারিয়ে গিয়ে থাকে, তবে গান্ধী টুপি আন্না হাজারের প্রচেষ্টায় পুনর্জন্ম লাভ করতে চলেছে ও আবারও তার ইমেজ বদলেছে – এখন এটা দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীক".

আমরা প্রতীকের দুনিয়াতে বাস করি, আর এই প্রতীক প্রায়ই এমন জিনিসে পরিনত হয়, যা ভাল বেচা কেনা করতে দেয়. আর সাদা টুপির অর্থ মোটেও এমন নয় যে, যে সমস্ত লোকেরা এই টুপি পরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, তারা সকলেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে নিবেদিত প্রাণ. একই ভাবে ইউরোপেও বহু অল্প বয়সী লোক রয়েছেন, যারা লাতিন আমেরিকার বিপ্লবী চে গ্যেভারা আঁকা গেঞ্জি পরে ঘুরে বেড়ায়, আর তারা মোটেও চে র আদর্শের সঙ্গে কোন ভাবেই জড়িত নয়. চে গ্যেভারা ও তার আদর্শ তার মুখের ছবির সঙ্গে এক হওয়া বহু দিন আগেই শেষ হয়ে গিয়েছে আর তা এখন স্রেফ একটা ব্যবসায়িক ব্র্যান্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে.

আনান হাজারে ন্যায় সঙ্গত ভাবেই ও মনে করছি কোন লাভের আশা না রেখেই দুর্নীতির সঙ্গে লড়ছেন. কিন্তু তাঁর এই সংগ্রাম বেশ কিছু লোককে, যারা জাতির ভালর চেয়ে শুধু নিজেদের পকেটের কথাই ভাবছে, তাদের জন্য একটা নতুন উত্স তৈরী করে দিয়েছে বেশী রোজগার করার.

কয়েকদিন বাদে গান্ধী টুপির প্রতি আগ্রহ আবার কমে যাবে, অথবা তা নতুন কোন ব্যবসায়িক ভাবে সফল প্রকল্প হবে, এমন কি ভারতের দোকানে আন্না হাজারের ছবি সমেত গেঞ্জি বিক্রী শুরু হবে কি না – তা একমাত্র ভবিষ্যতই জানে.