চলতি সপ্তাহে বাত্সরিক একটি ঘটনা স্মরণ করা হচ্ছে যা শুধুমাত্র রাশিয়ার জন্যই বিশেষ কোন মূহূর্ত ছিল না বরং তা সারা বিশ্বের ইতিহাসকে প্রভাবিত করেছে।ঠিক ২০ বছর  পূর্বে সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট দলের শীর্ষ নেতারা গোয়ান্দা বিভাগ ও আইনরক্ষী বাহিনীর সহযোগিতায় সোভিয়েত ইউনিয়ন পুনঃদখলের চেষ্টা করেন যার উদ্দেশ ছিল স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনে বাঁধা ও গনতান্ত্রিক চিন্তাধারার মৃত্যু ঘটানো।কিন্তু তাদের সেই উদ্দেশ্য সফল হয় নি।আজ ২০ বছর পর সেই ঘটনার সাথে জড়িতরা বলছেন যে,মূলত ওই সময়ই সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাগ্য নির্ধারন হয়েছে।সেই সব ঘটনা  রাশিয়ার গনতন্ত্রের ইতিহাসে বিশেষ জায়গা করে আছে।

১৯ আগষ্ট ১৯৯১ সালে সোভিয়েত নাগরিকরা  নতুন একটি শব্দের সাথে পরিচিতি লাভ করেন এবং তা হচ্ছে ‘এসইক’ বা জরুরি সংক্রান্ত রাষ্ট্রীয় কমিটি ।রাশিয়ার ইতিহাসে এ ঘটনার নাম দেওয়া হয় ‘অগাষ্ট ক্যূ’ ।মস্কো শহরের রাস্তায় তখন যুদ্ধের বড় বড় ট্যাঙ্ক মহাড়া দিচ্ছে। জরুরি সংক্রান্ত রাষ্ট্রীয় কমিটির প্রধান উদ্দেশ ছিল স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের চুক্তিপত্র অকার্যকর করা।তবে উল্লখ্য যে,১৯৯১ সালের আগষ্ট মাসের মধ্যেই সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে লিথুয়ানিয়া ও জর্জিয়া বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং একই সাথে লাটভিয়া,এস্তোনিয়া,মালদাভিয়া ও আর্মেনিয়া  স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের পরিচিতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।এর অর্থ হচ্ছে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্ত হওয়া শুরু হয়েছে।রাষ্ট্রের ক্ষমতা ছিনিয়ে নেয়ার প্রচেষ্টা যখন শুরু  হয়েছিল তখন মিখাইল গর্বাচেভ  মস্কো ছিলেন না।যদিও প্রেসিডেন্ট  গর্বাচেভ নাকি জানতেন যে, ‘এসইক’ রাষ্ট্রের ক্ষমতা নেয়ার পায়ঁতারা করছে কিন্তু তা জেনেও তিনি কোন বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহন করেন নি। ‘অগাষ্ট ক্যূ’ ঘটনার ২০ বছর উপলক্ষ্যে মিখাইল গর্বাচেভ বলেন,আমাকে সব জায়গা থেকে টেলিফোন করে সতর্ক করেছিল এবং আমার কাছের লোকজনও একই কথা বলেছিল,কিন্তু আমি সংগ্রামের পথ বেছে নিতে পারি নি।রক্তপাত যেন না ঘটে সেই দিকেই আমার চিন্তা ছিল।আমি পূর্বেই জেনেছিলাম যে,রক্তপাত ছাড়া এই ঘটনার অবসান ঘটবে না।যদি আমাদের এই হানাহানি চলতে থাকত তাহলে গৃহযুদ্ধ বাঁধার সম্ভাবনা ছিল অনেক বেশী ।তাছাড়া ওই সময় পুরো দেশেই অস্ত্রসস্ত্রে ভরপুর ছিল,সেই সাথে ছিল পারমানবিক অস্ত্র।

১৯ আগষ্ট সকালে মস্কোর হোয়াইট হাউসের সামনে (পূর্বে এর নাম ছিল সোভিয়েত হাইস) জরুরি সংক্রান্ত রাষ্ট্রীয় কমিটির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়। এর নেতৃত্বে ছিলেন রাশিয়ার সোভিয়েত সংযুক্ত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলসিন।ওই দিন সমবেত মস্কোবাসীদের উদ্দেশ্যে তিনি ‘এসইক’ এর কার্যক্রমকে রাষ্ট্র বিপ্লব বলে উল্লেখ করেন।দিন বাড়ার সাথে সাথে প্রায় কয়েক হাজার ইয়েলসিন সমর্থকরা হোয়াইট হাউসের সামনে জডো হতে থাকে।

১৯৯১ সালের আগষ্ট মাসের ওই ঘটানার ২০ বছর পর আজকের দিনে যারা রাশিয়া বাস করছেন তারা কখনই সোভিয়েত ইউনিয়নে বাস করেন নি এবং তাদের পক্ষে  ‘সমাজতন্ত্র’ কি তা বোঝানো খুবই মুশকিলযেখানে সব কিছুতেই ছিল রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপনিজের স্বাধীন মতামত প্রকাশেরও কেন সুযোগ ছিল নাবর্তমান প্রজন্ম ওই সব ঘটনা জেনেছেন কেবল বই-পুস্তক আর বাবা-মার কাছ থেকেতা বোঝার জন্য  এটুকু তথ্যই যথেষ্ট এবং সেই দিনগুলোর চেয়ে বর্তমান পরিস্থিতি অনেক ভালএমনি বললেন মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র আলেকসান্দার নিকোলাইচুকতিনি বলছেন,ওই সময় স্বশিক্ষিত হওয়ার সুযোগ কম ছিলএখন সুযোগ আছে বিদেশে শিক্ষা সফরে যাওয়া এবং বিদেশি শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে অন্য ভাষা রপ্ত করাআমি নিশ্চিত যে,যদি সবকিছু পূর্বের মতই থাকত তাহলে রাশিয়ায় আজ ইন্টারনেটের এত উন্নতি হত নাআমি পারতাম না আমার বন্ধুদের সাথে কথা বলতে যারা এখন ইউরোপে অবস্থান করছেনআমি খুবই আনন্দিত যে,পৃথিবী সম্পর্কে খুব সহজেই জানার সব উপকরনই আমার রয়েছেআমার জন্য যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ

যদিও সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এর অন্তর্গত প্রতিটি রাষ্ট্রে নিজ নিজ ধারাবাহিকতায় উন্নয়ন ঘটেছে১৯৯১ সালের ডিসেম্বর মাসে স্বাধীন কমনওয়েলথ রাষ্ট্র গঠনের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়এরই অংশ হিসেবে গঠিত হয়েছেকাস্টমস ইউনিয়ন যার সদস্য রাষ্ট্র হচ্ছে রাশিয়া,বেলারুশ ও কাজাকিস্তান।আশা করা হচ্ছে,আগামী ভবিষ্যতে এই সংস্থায় কিরগিজস্তান,উজবেকিস্তান ও ইউক্রেন যোগ দিবে

বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর রাশিয়ায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটেছে,নির্বাচনে প্রতিদন্ধিতা বেড়েছে এবং সেই সাথে গনমাধ্যম পেয়েছে  স্বাধীনতাতাছাড়া সমাজে অনেক নতুন রাষ্ট্রবাজ্ঞানীদের আবির্ভাব হয়েছে,পূর্বে সোভিয়েত ইউনিয়নে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলতে শুধুমাত্র রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা-কর্মীরাই ছিলেনকিন্তু এখন যে কাউই নিজের স্বাধীন মতামত প্রকাশ করার সুযোগ পাচ্ছেনরাশিয়ায় গঠন করা হচ্ছে আইনগত ও নাগরিক সমাজতাই সমাজতন্ত্রের ওই যুগে ফিরে যাওয়ার আর কোন সম্ভাবনা নেইযার ১৯৯১ সালের আগষ্ট মাসেই মৃত্যু ঘটেছে।ঠিক এমনটি বলেছেন স্পেনের ‘এল পাইস’ পত্রিকার সাংবাদিক পিলার বনেট যিনি ১৯৯১ সালের আগষ্ট মাসে মস্কোতে কর্মরত ছিলেন