এই দিন গুলিতে আজ থেকে কুড়ি বছর আগে জরুরী কালীণ রাষ্ট্র পরিষদ চেষ্টা করেছিল সোভিয়েতের এক এবং অন্যতম রাষ্ট্রপতি মিখাইল গরবাচভ কে ক্ষমতা থেকে অপসারিত করতে. এই ক্যুদেতার নেতৃত্ব দিতে ও একই সঙ্গে সোভিয়েত দেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় পরিষদের উচ্চপদস্থ দায়িত্বে থাকা লোকেদের, প্রশাসন, সেনা বাহিনী ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা পরিষদের সকলকে এই কাজে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন, তখনকার সোভিয়েত দেশের উপ রাষ্ট্রপতি গেন্নাদি ইনায়েভ. সারা দেশে সোভিয়েত ঐতিহ্য অনুযায়ী এক দলীয় শাসন ও এক দলীয় নিয়ন্ত্রণের সেই প্রচেষ্টা সফল হতে পারে নি. সারা বিশ্বে স্বীকৃত হয়েছে যে, এই জরুরী কালীণ রাষ্ট্র পরিষদের বিফল প্রচেষ্টা ও পরবর্তী কালের পরিবর্তন বিংশ শতকের ইতিহাসে একটি মুখ্য ঘটনা হয়ে রয়েছে. ধ্বংস হয়ে যাওয়া এক বিশ্ব স্বীকৃত মহান শক্তিধর দেশের মানচিত্রে উদয় হয়েছিল ১৫টি পরস্পরের প্রতি ক্ষুব্ধ দেশ ও তাদের মাঝে এক নতুন ধরনের গণতান্ত্রিক দেশ রাশিয়া প্রজাতন্ত্র.

১৯৯১ সালের ক্যুদেতার পরে কুড়ি বছর কেটে গিয়েছে. সেই আগষ্ট মাসে জন্ম নিয়েছিল রাশিয়ার বর্তমানের নবীন প্রজন্ম, এই কথা মনে করেছেন স্পেনের এল পাই খবরের কাগজের মস্কোর বিশেষ সংবাদদাতা পিলার বনে, যিনি সেই আগষ্টের দিন গুলিতে ক্যুদেতার সময়ে যারা নতুন রাশিয়ার জন্য এগিয়ে এসেছিল, তাদের দলেই ছিলেন. আজ তিনি তাই বলেছেন:

"আমার সবচেয়ে বেশী ভাল করে মনে পড়ছে ২২ শে আগষ্ট যে অবর্ণনীয় স্বাধীনতার ও ব্যক্তিগত মর্যাদার অনুভূতি আমি দেখেছিলাম এখানের মানুষের মধ্যে, তার কথা. তখন এই ক্যুদেতার অবসান উপলক্ষে মিটিং হয়েছিল, দিনটি ছিল সোনালী আলোয় ভরা, বড়ই সুন্দর দিন. আর কেমন একটা আত্মিক বোধ হয়েছিল যে, সকলেই যেন এক ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে. এটা সকলের চোখে মুখে দেখা যাচ্ছিল, আর এটা আমি কখনোই ভুলতে পারবো না".

রাশিয়ার সেই সব লোকেদের জন্য, যারা এই ক্যুদেতার সময়ে জন্মেছেন, যাদের এখন বয়স কুড়ি, জরুরী কালীণ রাষ্ট্র পরিষদ – এটা অনেক দূরের কোন ইতিহাসের ব্যাপার. যাদের এখন কুড়ি, তারা সেই নব্বই এর দশকের শুরুর সময় খালি বই পত্রেই পড়তে পরেছেন আর হয়ত শুনেছেন তাদের মা বাবার কাছে, এই কথাই প্রতিধ্বনি করে বলেছেন মস্কোর রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র আলেকজান্ডার নিকোলাইচুক:

"আমি নিজে এই সময়ের কথা মনে করতে পারি না, আমার তখন বয়স ছিল মাত্র ছয় মাস. কিন্তু বাবা মায়ের কাছ থেকে শুনেছি যে, এই সময়ে খুবই জটিল ছিল পরিস্থিতি. এমন সব সময় ছিল, যখন আমার বাড়ীর লোকেরা একেবারেই বুঝে উঠতে পারতেন না, কি করে নিজেদের ছেলেমেয়েদের খেতে দেবেন. আর আমি, বোধহয়, খুশী, যে আমি এই রকমের সময় আমার জ্ঞান হওয়ার পর থেকে দেখি নি, আর তা দেখতে চাইও না, এই সব আবারও ঘটুক তা কেউই চায় না. আর এটা শুধু বাস্তববাদী মূল্যবোধকেই নয়, আত্মিক মূল্যবোধকেও প্রশ্ন জর্জরিত করে থাকে".

যদিও ১৯৯১ সালের পর থেকে রাশিয়া নিজের উন্নয়নের পথে খুবই লক্ষ্য করার মতো পথ পাড়ি দিয়ে এসেছে, তাও এখনও সত্য গণতন্ত্র ও স্বাধীন সম্ভাবনার আদর্শের পথে অনেক পথ চলাই বাকী. আশা রয়েছে দেশকে এই পথেই নিয়ে এগিয়ে যাবেন আজকের তরুণ প্রজন্ম, যাদের বয়স সদ্য কুড়ি হল. এই কথাই মনে করে রাজনৈতিক প্রযুক্তি কেন্দ্রের সভাপতি ইগর বুনিন বলেছেন:

"সমস্ত পরিসংখ্যানেই দেখানো হচ্ছে যে, নতুন প্রজন্ম খুবই গতিময়. যাদের এখন বয়স ৩৫ থেকে ৪৫ এর মধ্যে তাদের চেয়ে এই নতুনরা বেশী করে চাইছে নিজেরা সফল হতে. নতুন প্রজন্মের সম্ভাবনাও বেশী, তারা অনেক বেশী বাজার অর্থনীতির পক্ষে".

সোভিয়েত দেশ পতনের পরে এই বিশাল এলাকা জুড়ে যে ১৫টি নতুন রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছিল, তাদের নেতৃত্ব তখন ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য সাধনের জন্য নিজেদের ইচ্ছা মতো পথ বেছে নিয়েছিলেন উন্নতি ও রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতী পাওয়ার জন্য. আজও সেই পথের পরিণতি প্রতিটি দেশেই লক্ষ্য করা যায়. সকলেই যে যার পথে চলে গিয়েছিল, কেউ বা কিছুই তাদের ধরে রাখতে পারে নি. রাশিয়া সোভিয়েত দেশের আইন সঙ্গত উত্তরাধিকারী দেশ হিসাবে সমস্ত বাইরের দেশের ঋণ ও পাওনা নিজেদের দায়িত্বে নিয়েছিল. এই দেশে বাজার অর্থনীতির জন্য নতুন কাঠামো তৈরী করা হয়েছিল, প্রথম দিকে নির্বাচন হয়েছে প্রবল প্রতিযোগিতার মধ্যে. বক্তব্য ও তা প্রকাশের স্বাধীনতা চরমে পৌঁছেছে – মনে করা হয়েছিল গণতন্ত্রের এটাই প্রধান উপাদান. সম্পূর্ণ নতুন ধরনের রাজনীতিবিদ এসেছিল, অনেকেই বাইরের দেশ থেকে, ক্ষমতায় আর শুধু পেশাদার রাজনীতিবিদেরাই থাকলেন না, এলেন বহু ধরনের মানুষ. তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গী, ইচ্ছা অনিচ্ছা ও লক্ষ্য নিয়ে. তাই রাশিয়ার রাজনীতিবিদ আলেক্সেই মাকারকিন বলেছেন যে, বর্তমানের প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি হলেন সেই নব্বই দশকের প্রথম দিকের সময়ের সবচেয়ে জাজ্বল্যমান উদাহরণ, যাঁরা নিজেদের রাজনীতিতে কেরিয়ার তৈরী করতে পেরেছেন সেই সময়ে. সেই বছর গুলিতেই রাশিয়াতে চাওয়া হয়েছিল সামাজিক প্রশাসন ও আইন সঙ্গত প্রশাসন তৈরী করা, যেখানে নির্দেশ বা আদেশে দেশের শাসন চলে না. তাই এই সময়ের প্রধান সাফল্য হয়েছিল যে, মানুষের মনের পরিবর্তন হয়েছিল. নতুন প্রজন্ম এসেছে, যারা জানেই না, এক দলীয় শাসন ব্যবস্থা কি (অবশ্য চিনে গেলেই তা দেখতে পাওয়া যায়), কমিউনিস্ট ধারণা ও একটি মাত্র মতের ব্যবস্থাকে কি ভাবে এখানে গুলিয়ে ফেলা হয়েছিল. আর বর্তমানের তরুণ প্রজন্ম জানে যে প্রত্যেকেরই নিজস্ব মতামত থাকে ও তা স্বাধীন ভাবেই প্রকাশ করা যেতে পারে.