বিশ্বে খাদ্য দ্রব্যের দাম গত বছরের জুলাই মাসের চেয়ে শতকরা ৩৩ ভাগ বেড়ে গিয়েছে ও ২০০৮ সালের সবচেয়ে দামী সময়ের মতো হয়েছে, আর খাবারের ভাণ্ডার অনেকটাই সংকুচিত হয়েছে. এই ধরনের তথ্য নিজেদের মাসিক রিপোর্টে উল্লেখ করেছে বিশ্ব ব্যাঙ্ক. প্রসঙ্গতঃ, এই সংস্থার বিশেষজ্ঞদের মতে, মূল্যবৃদ্ধি হওয়ার ক্ষেত্রে খুবই বড় ভূমিকা নিয়েছে ভুট্টা, চিনি ও গমের দা. বর্তমানের পরিস্থিতি সম্বন্ধে মন্তব্য করতে গিয়ে বিশ্ব ব্যাঙ্কের সভাপতি রবার্ট জেলিক ঘোষণা করেছেন যে, খাদ্য দ্রব্যের দাম খুবই বেশী হয়ে রয়েছে, আর তারই সঙ্গে সাধারন ভাবে থাকা পরিমানের তুলনায় কম সঞ্চিত আহার্য বস্তু প্রমাণ করছে যে, আমরা আগের মতই বিপজ্জনক অঞ্চলে রয়েছি, যেখানে সবচেয়ে দুর্বল সমাজের লোকেরাই সবচেয়ে বেশী কষ্ট পাচ্ছেন.

    সবচেয়ে দুর্বল মহাদেশ হয়েছে আফ্রিকা. এখানে এক কোটি কুড়ি লক্ষেরও বেশী লোক অনাহারে রয়েছেন, আর অবধারিত মৃত্যুর মুখোমুখি তিরিশ লক্ষেরও বেশী লোক আজ আছেন. সঙ্কট জনক পরিস্থিতি সেই সমস্ত দেশে হয়েছে, যেমন সোমালি, কেনিয়া, ইথিওপিয়া, জিবুতি, আর তা শুধু দানা শষ্য ও ভুট্টার দাম বাড়ার জন্যই নয়, যা এমনিতেই সবচেয়ে বেশী দাম হয়ে রয়েছে – বরং এই সব দেশ জুড়ে চলা খরা ও অন্তহীণ সশস্ত্র যুদ্ধের জন্যও হয়েছে.

    কিন্তু এমনকি সেই সমস্ত দেশেও, যেখানের লোকেদের দুর্ভিক্ষের ভয় নেই, জনগনের একটা অংশ ইতিমধ্যেই তাঁদের দৈনন্দিন খাওয়ার তালিকা থেকে কিছু জিনিস বাদ দিতে বাধ্য হয়েছে. স্থিতিশীলতার দ্বীপও বাস্তবে প্রায় নেই, এই কথা বলেছেন অর্থনৈতিক বিশারদ দলের বিশেষজ্ঞ মারিয়া কাতারানোভা, যদিও এমন অনেক দেশ রয়েছে, যেখানে খাদ্য দ্রব্য সংক্রান্ত পরিস্থিতি ও মূল্য বৃদ্ধি এখনও সঙ্কট জনক বলে দেখা যাচ্ছে না. এই ধরনের দেশের মধ্য রয়েছে রাশিয়াও, এই কথা বলে তিনি যোগ করেছেন:

    "গত বছরে আমরা সেই ধরনের একটা চিত্র দেখতে পেয়েছি, যখন রাশিয়াতে খুবই কম ফলনের ফলে সক্রিয় ভাবে দাম বেড়েছিল সমস্ত খাওয়ার জিনিসেরই, তার মধ্যে একেবারে প্রাথমিক ভাবে প্রয়োজনীয় জিনিসও ছিল. এটা ফল, শষ্য, সব্জী সমস্ত কিছুই, যেমন গম, রুটি ও আরও অনেকগুলি সামাজিক ভাবে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের ক্ষেত্রে হয়েছিল. আর প্রাথমিক ভাবে সেই সমস্ত লোকেরাই আমাদের সমাজে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, যাঁদের এমনিতেই নিজেদের খাদ্য তালিকার রকমফের নিয়ে গর্ব করার মতো কিছুই নেই. এই বছরে পরিস্থিতি অনেকটা ভাল, গত বছরের তুলনায়, কারণ ফলন হয়েছে বেশী. যদিও বিশ্বে পরিস্থিতি শান্ত নয়, তবু অন্ততঃ দেশের ভিতরে সমস্যা নেই, যা গত বছরেও ছিল. আর আমরা আশা করবো যে, দাম যদি না কমেও, তবে গত বছরের মতই যদি হয়ও, তবেও তা গত বছরের দ্বিতীয়ার্ধের মতো দ্রুত গতিতে বাড়বে না. অন্যান্য দেশ গুলির সম্বন্ধে, যেখানে এমনিতেই খাদ্য পরিস্থিতি সঙ্কট জনক, আর এটা প্রাথমিক ভাবে আফ্রিকা মহাদেশ, যেখানে জনগন দুর্ভিক্ষের সামনে উপস্থিত, তাদের বিষয়ে যা বলা যেতে পারে, তা হল এই বছরে পরিস্থিতি হবে বেশী করে কষ্টকর".

    দানা শষ্য ও অন্যান্য কৃষিজাত ফলন এবারে শুধু রাশিয়াতেই নয়, সমগ্র ইউরোপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিলের কৃষকদেরও হয়েছে. তাঁরাই আপাততঃ বিশ্বকে এগিয়ে আসা পতনের থেকে উদ্ধার করছেন. কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়: তাঁরা বিশ্বের স্ট্র্যাটেজিক খাদ্য ভাণ্ডার পূর্ণ করছেন না. যেমন, আজকের দিনে ভুট্টার সঞ্চয় মাত্র প্রয়োজনের শতকরা তেরো শতাংশ. বিগত চল্লিশ বছর আগেই শুধু এত খারাপ অবস্থা ছিল. এই সমস্ত পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে ইতিবাচক পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভবপর নয়, এই কথা মনে করে মারিয়া কাতারানোভা বলেছেন:

    "পরে পরিস্থিতি খাবার নিয়ে আরও খারাপ হতে পারে, যেহেতু তার প্রতি চাহিদা সক্রিয় ভাবেই বেড়ে যাচ্ছে. আর এটা প্রাথমিক ভাবে জড়িত এই কারণের সঙ্গে যে, ভারত ও চিনের মতো দেশ দ্রুত উন্নতি করছে".

    তাছাড়া খুবই লক্ষ্যনীয় ভাবে কৃষি শিল্পে সংকোচন হচ্ছে. খাবার জিনিস নিয়ে কাজ আর লাভজনক নেই, কারণ এখানে আর সেই ধরনের লাভ হচ্ছে না, যা শিল্প ক্ষেত্রে হয়, খনিজ তেল বা গ্যাসের কথা বাদ দিলেও অথবা শেয়ার বাজারে লাভের কথা ধরলে.

    বর্তমানে খাওয়ার জিনিসের অভাব ও তার দামের বেড়ে যাওয়া সমগ্র মানব সমাজের জন্যই একটা গুরুত্বপূর্ণ বিপদের ঘন্টা বাজিয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেছেন.ফলে সম্ভাবনা হয়েছে বিশ্ব মাপে সশস্ত্র বিরোধ তৈরী হওয়ার. অন্ততঃ স্থানীয় ভাবে এটাই দেখতে পাওয়া গিয়েছে টিউনিশিয়া ও ইজিপ্টে ও লিবিয়ার কোন ক্রমেই বন্ধ না হওয়া যুদ্ধে.

    রাষ্ট্রসঙ্ঘের খাদ্য ও কৃষি পরিষদের বিশেষজ্ঞরাও বলছেন যে, খাবারের অপ্রতুলতা সামাজিক বিরোধের সৃষ্টি করতে পারে. তাঁরা এক বিশেষ সূচক তৈরী করেছেন, যা সমাজের ভিতরে তৈরী উত্তেজনার সঙ্গে খাবারের দাম বাড়ার যোগের ব্যাখ্যা করে. যদি তার মান ২১৫ অঙ্কের বেশী হয় ( ২০০২ – ২০০৪ সালের স্তরকে ১০০ ধরে নিয়ে), তবে দেশে বিপ্লব শুরু হতে পারে. মহান ফরাসী বিপ্লবের সময়েও এই রকমই হয়েছিল, উত্তর আফ্রিকাতে বিগত সময়ের গোলমালও খাবারের জিনিসের সবচেয়ে বেশী দামের সময়ের সঙ্গেই এক সময়ে হয়েছে.