মস্কোতে আজ রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রী সের্গেই লাভরভ ও তাঁর ইরানের সহকর্মী আলি আকবর সালেখি তাঁদের বৈঠকের পরে ইরানের পারমানবিক পরিকল্পনা নিয়ে সমস্যার সমাধানের প্রয়াসে আলোচনার ক্ষেত্রে সাফল্যের উল্লেখ করেছেন. তেহরানে এই আলোচনা হয়েছে গতকাল.

    ইরানের পক্ষ রাশিয়ার "ধাপে ধাপে এগিয়ে চলার" মাধ্যমে নিজেদের পারমানবিক পরিকল্পনার বিষয়ে সমস্যার সমাধান প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছে. রাশিয়া এই আলোচনা প্রক্রিয়ায় এক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান নিয়েছে. রাশিয়ার জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব নিকোলাই পাত্রুশেভের সঙ্গে তেহরান শহরের বৈঠক হওয়ার পরে এই সম্বন্ধে ঘোষণা করেছেন ইরানের রাষ্ট্রপতি মাহমুদ আহমাদিনিজাদ.

    রাশিয়ার উদ্যোগ - ফলপ্রসূ ও আশাব্যঞ্জক. এই ধরনের মন্তব্য "রেডিও রাশিয়াকে" দেওয়া সাক্ষাত্কারে প্রকাশ করেছেন তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর রাজনীতিবিদ জাহাঙ্গীর কারামী, তিনি বলেছেন:

    "এই প্রশ্ন যেমন ইরান, তেমনই রাশিয়ার জন্যেও খুবই গুরুত্বপূর্ণ, একই সঙ্গে সারা বিশ্বের সমাজের জন্যেও. দুই বছরের যথেষ্ট জটিল সময়ের পরে, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চাপ ইরানের পারমানবিক পরিকল্পনাকে নিয়ে সীমা পার করে দিয়েছে, তখন রাশিয়ার উদ্যোগের কল্যাণে এই সমস্যার সমাধানের জন্য নতুন এক পাতা খোলা সম্ভব হয়েছে".

    মনে করিয়ে দিই যে, তথাকথিত ""ধাপে ধাপে এগিয়ে চলার" পরিকল্পনা প্রথমে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রী সের্গেই লাভরভ গত জুলাই মাসে প্রকাশ করেছিলেন. রাশিয়ার কূটনৈতিক প্রধান ঘোষণা করেছিলেন যে, রাশিয়া ইরানের একঘরে করে দেওয়ার বিরুদ্ধে ও মনে করে যে, ইরানের পারমানবিক পরিকল্পনা নিয়ে সমস্যার সমাধান শুধু মাত্র সহযোগিতার মাধ্যমেই করা সম্ভব. মন্ত্রীর মতে সবচেয়ে সফল হতে পারে "ধাপে ধাপে এগিয়ে চলা", যখন প্রথমে ভরসা তৈরী করা সম্ভব হয়, আর ইরান সেই সমস্ত দাবীর প্রতি ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে প্রতিক্রিয়া করতে শুরু করে, যা আন্তর্জাতিক পারমানবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ও রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্তে রাখা হয়েছে". ঐস্লামিক প্রজাতন্ত্রের এই ইতিবাচক ও বাস্তব পদক্ষেপের উত্তরে "ছয় পক্ষের" আলোচনাকারী দলের সদস্যরাও তাদের পক্ষ থেকে পুরস্কৃত করার জন্য ব্যবস্থা নেবে, যার মধ্যে নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থায়ও ঢিলে দেওয়া হবে. লাভরভ আশা প্রকাশ করেছেন যে, "একসাথে এর জন্য জমি তৈরী করা সম্ভব হবে ও নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু করা সম্ভব হবে".

    রাশিয়া খুব সম্ভবতঃ চেষ্টা করছে এই আলোচনার একটা সুর পূর্ব নির্দিষ্ট করে দিতে ও নিজেদের উদাহরণ দিয়ে ছয় পক্ষের আলোচনাকারী দলের অন্যান্য দের দেখাতে চাইছে যে, ইরান তাদের পারমানবিক পরিকল্পনা নিয়ে উদ্ভূত সমস্যার সমাধানে গঠন মূলক প্রস্তাব শুনতে তৈরী. আর এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এবারে বাজী শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তাই নয়, বরং বিশ্ব নিরাপত্তা. রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা পরিষেবা সংস্থার প্রাক্তন ডিরেক্টর নিকোলাই কভালিয়ভ এই প্রসঙ্গে বলেছেন:

    "রাশিয়া সব সময়েই সারা বিশ্ব জুড়ে স্ট্র্যাটেজিক নিরাপত্তা বজায় রাখার কথা বলেছে. ইরান সম্পর্কে রাশিয়ার অবস্থান হল সব সময়েই ছিল সঠিক ও একেবারে নির্দিষ্ট. এই অবস্থানের মূল কথা যা ছিল, তা তেহরান ও মস্কোর বিগত বৈঠক গুলিতে আবারও সমর্থিত হয়েছে. এটা এই ভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে. ইরানের বিরুদ্ধে যে কোন ধরনের নিষেধাজ্ঞা  - এটা কোথাও নিয়ে যেতে পারে না. বহু পক্ষের আলোচনা প্রক্রিয়া চলাই উচিত্. ইরানকে তার পারমানবিক প্রকল্প নিয়ে একা বদ্ধ অবস্থায় রেখে দেওয়া চলতে পারে না. নিষেধাজ্ঞা কঠোর হলে তা শুধু এমন জায়গাতেই নিয়ে যেতে পারে যে, ইরান মনোযোগ দেবে নিজেদের পারমানবিক পরিকল্পনাকে সামরিক লক্ষ্যে কার্যকরী করার, কারণ দেশ আন্তর্জাতিক ভাবে একঘরে হয়ে থাকলে সঙ্গে সঙ্গেই বিপদ অনুভব করে থাকে".

    একই সঙ্গে সন্দেহবাদীদের গলাও শুনতে পাওয়া গিয়েছে, যারা মনে করেন যে, রাশিয়ার উদ্যোগ রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের মধ্যে নতুন বিবাদের কারণ হতে পারে, আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও সম্পর্ক ইনস্টিটিউটের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মী আলেক্সেই স্মিরনভ এই রকম মত নিয়ে মন্তব্য করেছেন:

    "মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমানবিক পরিকল্পনাকে সম্পূর্ণ ভাবে বন্ধ করে দেওয়ার জন্য বদ্ধ পরিকর, যা উল্লেখ করা যেতে পারে যে, একেবারেই আন্তর্জাতিক আইন বিরুদ্ধ. কারণ প্রতিটি দেশই অধিকার রাখে পারমানবিক প্রযুক্তির উন্নতি করার. রাশিয়ার "ধাপে ধাপে এগিয়ে চলার" নীতি ইরানের পারমানবিক ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার পরিকল্পনাকে টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করে রেখেছে. বোঝাই যাচ্ছে, তা শুধু শান্তিপূর্ণ লক্ষ্যের জন্যই".

    ইরানের পারমানবিক অস্ত্র পাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কথাবার্তা থামছেই না. শুধু তা রয়েছে নানা রকমের কল্পনা ও সন্দেহের স্তরে, প্রমাণ আপাততঃ এখনও দেওয়া সম্ভব হয় নি. ইরানেরও পশ্চিমের সত্যিকারের ইচ্ছা সম্বন্ধে সন্দেহ রয়েছে. ফলে এমন এক পরিস্থিতি তৈরী হয়েছে, যখন কেউই কাউকে বিশ্বাস করছে না, ইরানের পারমানবিক পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনার প্রক্রিয়া বছরের পর বছর ধরে কোন রকমের বোধগম্য ফল ছাড়াই চলছে. রাশিয়ার "ধাপে ধাপে এগিয়ে চলার" নীতি বোধহয় সেই রকম একটা সিদ্ধান্ত হতে পারে, যা সকলেই অপেক্ষা করে ছিল. কিন্তু এটা হতে পারে যদি শুধু সমস্ত পক্ষই যাদের এই বিষয়ে কোন স্বার্থ রয়েছে তারা সত্যই সমস্যার সমাধান করতে চায়, বিরোধের জন্য নতুন করে কোন অজুহাত না খোঁজে.