ব্রিটেনের প্রভাবশালী সংবাদপত্র "দ্য ফাইনান্সিয়াল টাইমস" এর খবর অনুযায়ী পাকিস্তান চিনকে তাদের দেশে ওসামা বেন লাদেনকে ধ্বংস করার অপারেশনে ক্ষতিগ্রস্থ মার্কিন হেলিকপ্টারটিকে খুলে দিয়েছে দেখতে. যা তৈরী হয়েছে এক গোপন প্রযুক্তি "স্টেলথ" ব্যবহার করে, যার ফলে রাডারের বিকীরণ প্রতিফলিত হয়ে থাকে ও বিমানটি রাডারে অদৃশ্য থাকে. ব্রিটেনের সংবাদপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আমেরিকার প্রযুক্তি ওয়াশিংটনের একাধিকবার এটা করতে বারণ করায় কান দেয় নি ইসলামাবাদ ও তৃতীয় দেশের কাছে উপস্থিত করেছে. যদিও মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সি আই এ পাকিস্তানকে এটা না করতে অনুরোধ করেছিল.

    "দ্য ফাইনান্সিয়াল টাইমস" আরও জানিয়েছে যে, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর দপ্তরের প্রধান জেনেরাল আশফাক কায়ানি পাকিস্তান এই ধরনের কাজ চিনের জন্য করেছে বলে অস্বীকার করেছেন. চিনও শেষ পর্যন্ত পাওয়া খবর অনুযায়ী সরকারি ভাবে ঘোষণা করেছে যে, তারা আমেরিকার ভেঙে পড়া হেলিকপ্টার অবধি যাওয়ার কোন সুযোগ পায় নি.

যাই হোক এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, পাকিস্তান ও আমেরিকার সম্পর্ক আবার পিছিয়ে যাচ্ছে. এটা বেন লাদেনকে ধ্বংস করার পরে বেশী করে দেখা যাচ্ছে. দুই দেশই পরপর অনেকগুলি অমিত্র সুলভ আচরণ করেছে, যদিও সরকারি ভাবে এখনও একে অপরের স্ট্র্যাটেজিক সহকর্মী দেশ বলে পরিচিত. আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস ও বিশেষত পাক আফগান এলাকায় এটা খুবই ফলাও করে বলা হয়েছিল. এর মানে তাহলে কি সরকারি ভাবে ইসলামাবাদ নিজেদের দিক থেকে নাছোড়বান্দা ভাব ও গোঁয়ার্তুমি দেখিয়ে ওয়াশিংটনের সাথে নিজেদের সম্পর্ক ইচ্ছা করেই খারাপ করতে চাইছে? অথবা সবটাই ব্যাখ্যা করা যায় এই ভাবে যে, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ও আন্তর্বিভাগীয় গুপ্তচর সংস্থা আগের মতই দেশের সরকারের সম্পূর্ণ অধীনস্থ নয়? আর ওয়াশিংটন কি তাদের আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে মোকাবিলার সহচরের থেকে আলাদা হতে চাইছে? আর পরবর্তী সময়ে পাক – মার্কিন সম্পর্ক কি ধরনের হতে চলেছে?

আমাদের বিশেষজ্ঞ ভ্লাদিমির সোতনিকোভ মনে করেছেন যে, বিগত সময়ের ঘটনা গুলি প্রমাণ করে দিয়েছে যে পাকিস্তানে আগের মতই অসামরিক প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে গুরুতর মত পার্থক্য রয়েছে, বিশেষ করে দেশের গুপ্তচর বিভাগ যাদের কাছে দেশের সরকারের আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক নির্ণয় শুধু তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী হলে তবেই তা গ্রহণ যোগ্য হয়ে থাকে. পাকিস্তান বেইজিং কে আমেরিকার গোপন তথ্য দিয়েছে ঠিক তার পরেই, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সমগ্র অঞ্চলের সংস্কৃতি ও সামাজিক মূল্যবোধের উপরে "রকেট হানা" দিয়েছে. এই ভাবেই পাকিস্তানের উকিলেরা গে ও লেসবিয়ান দের জন্য পাকিস্তানের মার্কিন রাজদূতাবাসে রাজদূত ক্যামেরন মান্তের আয়োজিত এক পার্টির নাম দিয়েছে. এই "যৌন সংখ্যালঘু দের প্রতিনিধিদের উত্সব", যা কূটনৈতিক মিশনের গর্বের বিষয় বলে বর্ণনা করা হয়েছে, সব দিক থেকে বিচার করলে পাকিস্তানের ধৈর্য্যের পেয়ালায় একেবারে শেষ ফোঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে. এটা দুই দেশের সম্পর্ককে খুবই খারাপ করেছে, যা মে মাসে "আল- কায়দা" দলের নেতাকে এই দেশে ধ্বংস করার আমেরিকার অপারেশনের ফলে জটিল হয়েছিল.

    ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও গ্রেট ব্রিটেনের তথ্য অনুযায়ী চিনের বিশেষজ্ঞরা পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থার কর্মীদের সহমত পেয়ে, সব দেখে শুনে মনে হয়েছে যে, "কালো ঈগল" নামের হেলিকপ্টারের নতুন গঠনের ধ্বংসাবশেষ থেকে লেজের অংশের ফোটো তুলতে পেরেছে, যা তৈরী হয়েছে এক গোপন প্রযুক্তি ব্যবহার করে, যার ফলে রাডারের বিকীরণ প্রতিফলিত হয়ে থাকে. আমেরিকার গোপনীয় প্রযুক্তি যে পাকিস্তান তার সবচেয়ে কাছের সহকর্মী দেশের লোককে দেখতে দিয়েছে, তা বিশেষজ্ঞ ভ্লাদিমির সোতনিকোভের জন্য আচমকা কোন ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় নি, তাই তিনি বলেছেন:

    "পাকিস্তানের এই ধরনের পদক্ষেপ একেবারেই অনুমেয় ছিল. তা সম্পূর্ণ ভাবেই বর্তমানের চিন পাকিস্তানের জোটের প্রতিফলন করে. আর ভারতের সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে পাকিস্তানের জন্য একেবারেই অতি প্রয়োজনীয় হয়েছে চিনের সঙ্গে ঘোঁট পাকানো, তা না হলে তাদের ভয় হয় পাছে আর দেশই না থাকে. পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ও গুপ্তচর সংস্থা সব সময়ে নিজেদের আমেরিকা বিরোধী কাজকর্মের খবর রাষ্ট্রপতি জারদারী বা প্রধানমন্ত্রী গিলানি কে দেয় না. তাদের মনে হয়েছে যে, বেন লাদেন কে ধ্বংস করার খবরও তারা ওয়াশিংটনের কাছ থেকে পায় নি. আর সরকারি ভাবে ইসলামাবাদের জন্য এই ধরনের ব্যাপার মনে হয় ঠিকই হচ্ছে, কারণ তারা এই ভাবে ওয়াশিংটনকে দেখাতে চায় যে, তারা নিজেদের সিদ্ধান্তের বিষয়ে আমেরিকার ধার ধারে না ও তা মেনে চলতেও চায় না. একই সময়ে নিজেদের দেশের লোককে দেখানো সম্ভব হয় যে, পাকিস্তান দেশের সার্বভৌমত্ব বজায় রাখতে জানে ও নিজেদের দেশের স্বার্থ ও সম্মানকে মর্যাদা দেয়."

    আরও একটা ইঙ্গিত পাকিস্তান এই কাণ্ড দিয়ে আমেরিকার কাছে পৌঁছতে চায়. যে, যদি ওয়াশিংটন ইসলামাবাদকে অর্থ সাহায্য প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী না করে, তবে তারা নিজেদের ক্ষমতাশালী উত্তরের প্রতিবেশী দেশ চিনের কাছে হাত পাততে পারে. তাছাড়া একমাত্র চিনের সঙ্গেই তারা সমস্ত সময় জুড়ে সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে, কারণ চিন নিজেদের প্রভাব বৃদ্ধির জন্য প্রায় বিনা শর্তে পাকিস্তানকে বহু বছর ধরেই অর্থ ও অস্ত্র সরবরাহ করে চলেছে. আমেরিকা নিজের মুখ রক্ষার জন্য আফগানিস্তানের যুদ্ধে পাকিস্তানকে ব্যবহার করে চলেছে ও এটা পাকিস্তানে বোঝেন সকলেই. আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদীরা তাই পাকিস্তানে আশ্রয় পায় বিনা প্রচেষ্টায় ও পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী, তাদের প্রয়োজনে কাজে লাগায়. এই প্রসঙ্গে ভ্লাদিমির সোতনিকোভ যোগ করেছেন:

    "দুই দেশই একে অপরের সঙ্গে যে কুটিল কূটনৈতিক ও সামরিক চাল চেলেছে, তার একটা কারণ আছে. শুধু বেন লাদেনকে মেরেই বিশ্বে সন্ত্রাসবাদকে শেষ করা যায় নি, তা আমেরিকা বুঝতে পারে, তার ওপরে শীঘ্রই আফগানিস্তানের থেকে ফিরে যেতে হবে নিষ্ফলা শক্তি প্রয়োগের দশ বছর কেটে যাওয়ার পের, অথচ নিকট প্রাচ্য ও মধ্য এশিয়াতে নিজেদের প্রভাব বজায় রাখার ইচ্ছা ত্যাগ করাও সম্ভব নয় ওয়াশিংটনের পক্ষে. পাকিস্তানও বুঝতে পারে যে, একা চিন দিয়ে ভারতের প্রভাব মুক্ত হওয়া সম্ভব নয়, তার পথে প্রধান অন্তরায় ভাষা ও জীবন যাত্রার মধ্যে মিল. তার ছেয়ে আফগানিস্তানের দুর্দশার সময়ে আমেরিকার কাছে কিছুটা লেজ নাচিয়ে সুযোগ আদায় করে নিতে পারলে ভবিষ্যতে আখেরে লাভই হবে, বলে পাকিস্তান এখন হাব দেখানো শুরু করেছে. ভারতের দিক থেকেও যাতে ভয় পেতে না হয়, তাই মনে হয়, ভারতের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক ভাল হওয়া পাকিস্তান পরবর্তী কালে নিজেদের নিরাপদ করতেই ব্যবহার করতে চাইবে. এই রকমের আন্তর্জাতিক রাজনীতি দেশের ভিতরে দৈন্য ক্লিষ্ট অর্থনীতির সঙ্গে খাপ খেয়ে যায়. কারণ তা না হলে তালিবান বা আল- কায়দা ইসলামাবাদের সরকার কে যে কোন সময়েই পদচ্যুত করতে পারে, আর এটা বোঝার ক্ষমতা আছে বলেই শত বিরূপ মনোভাব কাজে দেখালেও মার্কিন ও পাক সরকার একে অপরকে কখনোই ছাড়বে না".

    মে মাসের শুরুতে পাকিস্তানে বেন লাদেনকে মারা থেকে শুরু করে পাশের ভারত বর্ষে পাকিস্তানের সঙ্গে মার্কিন সম্পর্ক কি হচ্ছে, তা ভাল করেই দেখা হচ্ছে. প্রথমে ইসলামাবাদ এখানের সি আই এ সংস্থার প্রধানের নাম ফাঁস করে দিয়েছে, তার পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমস্ত খবর দাতাদের ধরে ছিল, যারা এক নম্বর সন্ত্রাসবাদী সম্বন্ধে খবর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়েছিল. তার পরে পাকিস্তান একেবারে অভূতপূর্ব এক পদক্ষেপ নিয়েছিল, "শামসি" বিমান বন্দর, যেখান থেকে মার্কিন সেনারা গত ১০ বছর ধরে সমস্ত পাইলট বিহীণ বিমান বোমা পাঠাতো, তা ব্যবহার করতে দেওয়াই বন্ধ করে দিয়েছিল. এই ধরনের কাজকর্ম দেখে নয়া দিল্লী বুঝতে পেরেছিল যে, এলাকাতে পাকিস্তানের রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর ইচ্ছা হয়েছে. ইসলামাবাদের শেষ পদক্ষেপ, বেইজিং কে "স্টেলথ" প্রযুক্তি দেখবার সুযোগ করে দেওয়া, বোধহয়, নিজেদের দিক থেকে এমনকি সদ্য ভাল হতে যাওয়া ভারত – পাকিস্তান সহ্য সম্পর্ককেও আবার খারাপ করে দিতে পারে. এই প্রসঙ্গে ভ্লাদিমির ইভসিয়েভ বাদ দেন নি যে, বেইজিং তাইওয়ান দেশের সঙ্গে নিজেদের সমস্যা সমাধান করার জন্য এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী করবে, তাই তিনি বলেছেন:

    "দেখা যাচ্ছে যে, এই সবই চিনকে নিজেদের সামরিক প্রযুক্তিকে অদৃশ্য করার উপযুক্ত পদার্থ সৃষ্টি করতে সাহায্য করবে. এটা চিনের খুবই দরকার, কারণ তাইওয়ানের সমস্যা এখনও সমাধান করা সম্ভব হয় নি. চিনের এমন সামরিক প্রযুক্তি চাই, যা তাইওয়ানের রাডার দিয়ে ধরা যাবে না. সুতরাং আমি সন্দেহ করছি না যে, "স্টেলথ" প্রযুক্তি বিষয়ে এমনকি এই ধরনের দেখার সুযোগ পেয়ে চিন তা ব্যবহার করতে চাইবে. বিশেষ করে তাদের যে বিশাল ক্ষমতা হয়েছে বর্তমানের আধুনিক প্রযুক্তি ও সেগুলি ব্যবহারের স্তর দেখে তা বোঝা সম্ভব".

    বোঝাই যাচ্ছে যে, চিনের গুপ্তচর দের জন্য আমেরিকার হেলিকপ্টারের ভাঙা অংশ পরীক্ষা করে দেখা খুবই জরুরী. কিন্তু – কিছু বিশেষজ্ঞ যেমন মনে করেছেন যে, এখানে মূখ্য হল – তা তৈরী করার মতো প্রযুক্তি থাকা. আর সেই গুলি পেতে হলে খুবই শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি নিয়ে গুপ্তচর থাকতে হবে. এটা ভাঙা টুকরো দেখার চেয়েও বেশী সম্ভাবনাময় বিষয়. এটা সত্য যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যেক বছরেই এই ধরনের গুপ্তচর বৃত্তি নিয়ে স্ক্যাণ্ডাল হচ্ছে, বিশেষত চিনকে নিয়ে. বেইজিং ভবিষ্যতেও যে কোন ধরনের সম্ভাবনাই চেষ্টা করে দেখবে, যাতে তাদের সামরিক সম্ভারকে আধুনিক করা সম্ভব হয় – এই বিষয়ে সমস্ত সামরিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞই একমত.