আমেরিকার অর্থনীতিকে  - বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিকে ভারসাম্য দেওয়া – যা ডিফল্টের সীমানায় এসে দাঁড়িয়েছিল, তা বিশ্বকে আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন করে অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য করেছিল. নতুন বিশ্ব সঙ্কটের বিপদ এখন আগের চেয়ে অনেক বাস্তব ঠেকেছে, বিশেষ করে ইউরোপীয় সঙ্ঘের দক্ষিণের প্রান্তে.

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সমস্যার অনেক কারণই বলা হয়ে থাকে. কিন্তু এই প্রসঙ্গে পিছনে ঠেলে দেওয়া সেই বাস্তবকে, আমেরিকার বিশাল সামরিক খাতে ব্যয়কে, যারা একই সঙ্গে তিনটি যুদ্ধ নিকট ও মধ্য প্রাচ্যে চালিয়ে যাচ্ছে. হতে কি পারে যে, এই পরিস্থিতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সমস্যায় কোন বিশেষ ভূমিকাই নেয় না? এই প্রসঙ্গে রেডিও রাশিয়াকে দেওয়া সাক্ষাত্কারে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মী ভিক্তর নাদেইন রায়েভস্কি বলেছেন:

"বিগত দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক সমস্যা এড়াতে তথাকথিত ছোট বিজয় অবশ্যম্ভাবী এমন সব যুদ্ধ তৈরী করেছে. খুবই শক্তিশালী উদ্যোগ পেয়ে আমেরিকার সামরিক উত্পাদনের শিল্প নিজের পিছনে গাধাবোটের মত অর্থনীতির প্রয়োজনীয় আরও অনেক শিল্পকে টেনে নিয়ে যেতে পেরেছে. একই সঙ্গে আমেরিকা সামরিক ও রাজনৈতিক ভাবে সবচেয়ে ক্ষমতাশালী বলে পরিচয় পেয়েছে. ডলারেরও সঞ্চয়ের মুদ্রা হিসাবে মর্যাদা আরও শক্ত হয়েছে. আর এই সর্ব শক্তিমান রাষ্ট্রের সবচেয়ে ভরসা যোগ্য মুদ্রা ক্রয় করে বাকি বিশ্ব একই সঙ্গে বিনিয়োগ ব্যবস্থাকে সমর্থন করে এসেছে, আর তার মানে হল – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকেও. একটা সময় পর্যন্ত এই কাঠামো চলেছে. আর এখন কি হচ্ছে? মনে করা হয় যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান ও ইরাকে সামরিক অপারেশনে খরচ হয় একশো কোটি ডলারেরও বেশী. কিন্তু বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন যে, এটা শুধু সরাসরি খরচ টুকু. আমেরিকার ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের কুড়ি জনেরও বেশী বিজ্ঞানী এক সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, ২০০১ সালে আফগানিস্তানে প্রবেশের পর থেকে সমুদ্র পারের যুদ্ধে আমেরিকার সর্বমোট খরচ দুশো সত্তর কোটি ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছে. লিবিয়াতে যুদ্ধের খরচ এর তুলনায় সামান্যই, কিন্তু সেটাও পরিস্থিতিকে হালকা করে নি".

আর এই সমস্ত "মর্যাদার লড়াইয়ের" না বোঝা ফলাফল খরচ যত হয়েছে, তার কোন যৌক্তিকতা প্রমাণ করে নি. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্যই এই নিকট ও মধ্য প্রাচ্যের লড়াইয়ের খরচ ক্ষমতাতিরিক্ত হয়েছে, যাদের এমনিতেই রয়েছে বিশাল সরকারি ঋণ.

 লন্ডনের "ডেইলী টেলিগ্রাফ" খবরের কাগজে মনে করা হয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পক্ষে আর বিশ্বের অবধারিত ভাবে বিশ্বের একচ্ছত্র অধিপতি ও পুলিশ হয়ে থাকার জন্য খরচ করার ক্ষমতা নেই. যদি এই অনুমান সত্য হয়. তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিকট ও মধ্য প্রাচ্যের রাজনীতি কি তাহলে পাল্টাবে? ভিক্তর নাদেইন রায়েভস্কি এই প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন:

"অর্থনৈতিক ও সামরিক সমস্যার জন্য আমেরিকার লোকেদের নিজেদের উচ্চাভিলাষ এই অঞ্চলের জন্য বদলাতে হবে, প্রত্যেক ড্রামের জন্যই ফুটো বন্ধ করার গোঁজ হয়ে থাকার চেষ্টা বন্ধ করতে হবে. সম্ভবতঃ, তাদের নিজেদের প্রভাবের কিয়দংশের সঙ্গে অন্যান্য আঞ্চলিক ভাবে প্রভাবশালী বৃহত্ রাষ্ট্রের সাথে ও নিজেদের আঞ্চলিক ভাবে জোটের দেশ গুলির সঙ্গে ভাগ করে নিতে হবে. বাস্তবে, এই কৌশলের লক্ষণই বর্তমানে লিবিয়ার পরিস্থিতি ঘিরে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে. এই অঞ্চলকে নিজেদের প্রভাবে রাখার স্ট্র্যাটেজিক পরিকল্পনা থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মনে হয় না যে সরে দাঁড়াবে. ওয়াশিংটনে পছন্দ করা হয় পুনরাবৃত্তি করতে যে, আমেরিকা নিকট প্রাচ্যে রয়েছে বাধ্য হয়ে, কারণ সমগ্র বিশ্বের জন্য এই গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে কারোর পক্ষেই শৃঙ্খলা রক্ষা করা সম্ভব নয়. কিন্তু এই প্রসঙ্গে আমেরিকার বিশেষজ্ঞ সমাজে একটা প্রচলিত ধারণা রয়েছে, যে এই অঞ্চল থেকে চলে গেলে আমেরিকা তাদের উনিশ শতকের প্রভাবের পর্যায়ে পৌঁছবে. তাই আপাততঃ আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি হঠে যাওয়ার জন্য অনুষ্ঠানের মঞ্চ সজ্জা করার কোনও প্রয়োজন নেই. কিন্তু এই প্রসঙ্গে অপেক্ষা করা যুক্তিযুক্ত হবে যে, ডিফল্টের কিনারায় ঠেকে ভার সামলাতে যাওয়া ওয়াশিংটন ধীরে হলেও এই অঞ্চলের সমস্ত খরচের ভার নিজেদের জোটের কাঁধেই তুলে দিতে চাইবে. এটা আমরা এখনই দেখতে পাচ্ছি লিবিয়াতে, একই কৌশল (আপাততঃ স্পষ্ট ভাবে রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই) সিরিয়ার ঘটনার চারপাশেও ঘটছে. এই বিরোধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পিছনের সারিতে রয়েছে, নিজেদের জায়গা তাদের ন্যাটো জোটের ইউরোপের সহকর্মী দেশ গুলির জন্য ছেড়ে দিয়ে ও তাদের উপসাগরীয় জোটের আরব লীগের সদস্য দেশ গুলির উপরে দিয়ে".

ফলে পাওয়া যাচ্ছে এক হাস্যকর পরিস্থিতি. তুরস্ক সিরিয়ার কুর্দদের হয়ে কথা বলছে, যারা এমনিতেই তাদের তুরস্কে বসবাসরত কুর্দ ভাইদের চেয়ে অনেক বেশী অধিকার রাখে. আর সৌদি আরব ও বাহরিন শেখাচ্ছে দেশের ভিতরের বিদ্রোহীদের সঙ্গে শক্তি প্রয়োগ না করে আলোচনা করতে. কে জানে – হয়ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জোটের সদস্যদের নিজেদের জন্য এই ধরনের অদ্ভূত সব ভূমিকায় অভিনয় করতে অসুবিধা হচ্ছে কি না – কিন্তু দেখাই যাচ্ছে যে, আমেরিকার সহকর্মীরা খুবই তা করতে চেয়েছে. সব মিলিয়ে এই সমস্ত পরিস্থিতিই আমাদের সামনে শেষ হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে. যদিও তা আগামী কালই শেষ হবে না.