বিগত কয়েক দিন ধরে লন্ডন ও গ্রেট ব্রিটেনের অন্যান্য শহর জুড়ে চলা রাস্তার লড়াই বিশ্বের সমস্ত সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের পর্দার মুখ্য সংবাদের জায়গা থেকে সরছেই না. আমাদের কায়রো শহরের সংবাদদাতা রোলান্দ বিদঝামভ লিখছেন যে, এটা কোন গোপন সংবাদ নয় যে এই লুঠ পাট ও অরাজকতার মূল স্রোতে যারা রয়েছেন, তাদের বেশীর ভাগই গরীব এলাকা ও শহরের উপকণ্ঠের লোক, যেখানে অভিবাসিত ও তাদের বংশধরেরাই থাকেন. আর এটাই আমাদের বাধ্য করে জার্মানীর চ্যান্সেলার অ্যাঞ্জেলা মেরকেলের বক্তব্যকে আরও একবার ভেবে দেখতে, যিনি অল্প কিছুদিন আগেই খোলাখুলি ভাবে ইউরোপের বহু সংস্কৃতি মিলনের রাজনীতির ধ্বংস হয়ে যাওয়া স্বীকার করেছেন.

    এই ধরনের ঘটনা পূর্বের দেশ গুলিতে কি রকম ভাবে গ্রহণ করা হয়েছে, অংশতঃ আরব দুনিয়াতে? কি মনে করা হয়েছে ইউরোপের বহু সংস্কৃতি মিলনের রাজনীতি নিয়ে মুসলিম দেশ গুলির বুদ্ধিজীবি নেতৃত্বের মধ্যে? রেডিও রাশিয়ার কায়রো শহরের বিশেষ সংবাদদাতা এই সম্বন্ধে ইজিপ্টের বিখ্যাত স্বাধীনচেতা লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডক্টর তারেক হেগ্গি কে প্রশ্ন করাতে তিনি বলেছেন:

    "এটা আলোচনার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়. আপনি ইউরোপের মুসলিম সমাজকে মনে করেছেন, প্রাথমিক ভাবে সেই সমস্ত দেশে যেমন ফ্রান্স, ইতালি, সুইডেন. এই সব সমাজে, সত্যই খুব গভীর সমস্যা রয়েছে. আর এর দায়িত্ব কোন এক পক্ষের উপরে দেওয়া যায় না. তা দুই পক্ষই তৈরী করেছে. যদি আপনি মনোযোগ দিয়ে পরিসংখ্যান লক্ষ্য করেন, তবে নজর করতে পারবেন যে, অভিবাসিত লোকেদের শিক্ষা যত বেশী, তত বেশী করেই তাঁরা সেখানের সমাজের সঙ্গে মিশে গিয়েছেন. আর উল্টোটা হল, যত কম লেখা পড়া, তত কম তাদের মিশে যাওয়া সেখানের সমাজের মধ্যে".

    তারেক হেগ্গি মত দিয়েছেন যে, এখানে অভিবাসিত লোকেদের ইউরোপের স্থানীয় সমাজে সমাকলনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রধান কারণ হল তাদের শিক্ষা ও সংস্কৃতির স্তর. তিনি আধুনিক ফরাসী গদ্য সাহিত্যের এক উজ্জ্বল প্রতিনিধি ও ১৯৯৩ সালে মর্যাদাময় গনকোর্ট পুরস্কার প্রাপ্ত লেবানন দেশে জন্ম ফরাসী লেখক আমিন মালুফ এর কথা উল্লেখ করে বলেছেন:

    "আমিন মালুফ এর একটি বিখ্যাত বই "আত্মপরিচয় হত্যাকারীদের (The murdering Identities)" এর মধ্যে তিনি লিখেছেন যদি আপনার আত্মপরিচয় একবিংশ শতকে শুধু একটিই মাত্রা রাখে, তবে আপনি যোদ্ধাই হবেন. কিন্তু যদি আপনি বলেন যে: "আমি ফরাসী লেবাননের থেকে আসা লোক, ক্যাথলিক ও আমি ইংরাজী সাহিত্য পছন্দ করি, তবে আপনি একবিংশ শতকের জীবনের জন্য উপযুক্ত হবেন". যদি আপনার আত্মপরিচয় শুধু একটা যে কোনতেই শেষ হয়: "আমি মুসলমান", তবে এটা সমস্যার বিষয় হয়ে দাঁড়াবে, এমনকি সেই পাকিস্তানেও. আমি এখানে বলতে চেয়েছি যে, পাকিস্তানের লোকেরা ১৫ই আগষ্ট ১৯৪৭ সালে রাত্রে শুতে গিয়েছিলেন ভারতীয় মুসলমান হিসাবে আর ঘুম থেকে উঠেছিলেন এক নতুন রাষ্ট্রে ও ভারতীয় কথাটাই ভুলে গিয়েছিলেন, রেখেছিলেন শুধু মুসলমান আত্মপরিচয়. এই রকমই কিছু একটা ঘটেছে আমাদের ইজিপ্টের লোকেদের সঙ্গেও বর্তমানে. আগের সময়ে ইজিপ্টের লোকেদের সামনে কোন দ্বিধা ছিলনা: "কি আমরা পশ্চিমের থেকে গ্রহণ করবো আর কি থেকে আমাদের অস্বীকার করা দরকার"? এটা শুধু এখনই দ্বিধার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে".

0    এখানে উল্লেখ করবো যে, নিজের আত্ম পরিচয়ের ক্ষেত্রে বিশাল আকারে পরিবর্তন হয়েছে একজন মানুষের জীবন কালের মধ্যেই. আর এখানে প্রধান সমস্যা হল, আমাদের মতে ঐতিহ্য ও আধুনিক কৃষ্টির অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্বে. এটা বাস্তবেই সেই মূল বিরোধ, যা আজ আমরা আরব ও বহু প্রসারিত অর্থে মুসলিম সমাজের মধ্যেই লক্ষ্য করতে পারছি. যা ইউরোপে নিয়ে আসা হয়েছে ও তার মাটিতে রোপিত হয়েছে, তারই প্রতিফলন একেক সময়ে শহরের রাস্তা গুলিতে উপচে পড়ছে বিশৃঙ্খলা ও গণ্ডগোল হিসাবে.