সোমবারে তিব্বতের নির্বাসিত সরকারের নতুন প্রধান মন্ত্রী লবসাং সাঙ্গৈ শপথ নিয়েছেন. এই ৪৩ বছর বয়সের রাজনীতিবিদ, দিল্লী ও হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে প্রশিক্ষণ পেয়েছেন, এতদিন পর্যন্ত তিনি খুবই কমই মানুষের কাছে পরিচিত ছিলেন. প্রকাশ্যে রাজনীতি করার জন্য তাঁর পথ খুলে দিয়েছেন চতুর্দশ দালাই লামা, নিজের সিদ্ধান্তে, যেটি তিনি নিজের রাজনৈতিক দায়ভার পরিত্যাগ করে নিজেকে শুধু ধর্ম গুরু হিসাবেই অধিকার বদ্ধ রেখে.

    এই সমস্ত ইতিহাসের কয়েকটি দিক রয়েছে.প্রথমতঃ, এটা তিব্বতের অবস্থান নিয়ে. জানা আছে যে, দালাই লামা ১৯৫৯ সালে দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন, যখন চিনের সেনা বাহিনী এই অঞ্চল দখল করে নিয়েছিল. তিব্বতের চিনের অধিকারে থাকা নিয়ে বেশ কয়েক দশক ধরে বিশ্বের বহু দেশই মেনে নিতে চায় নি ও প্রাথমিক ভাবে ভূ রাজনৈতিক বিচারে এই অঞ্চলের প্রতিবেশী ও প্রতিযোগী দেশ ভারতের পক্ষ থেকে.

    চতুর্দশ দালাই লামা নিজেই সক্রিয় ভাবে তিব্বতের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছেন. কিন্তু তাঁর সক্রিয়তা আটকে ছিল এই কারণে যে, তিনি একসাথে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতার পদ সামলাতে বাধ্য হচ্ছিলেন. তাঁর পক্ষে জটিল হয়েছিল বিভিন্ন দেশের সরকারি নেতৃত্বাধীন লোকেদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করার কাজে, তাঁর প্রতিটি অন্য যে কোনও দেশ সফর চিনের নেতৃত্ব খুবই নেতিবাচক ভাবে দেখেছে. আর যেহেতু চিনের ভূমিকা বিশ্বের বিষয় গুলিতে প্রতি দশকের সঙ্গেই শুধু বেড়েছে, তাই বিশ্বের দ্বিতীয় শক্তিমান দেশের সঙ্গে কেউই সম্পর্ক নষ্ট করতে চায় নি.

    নিজের উপর থেকে রাজনৈতিক নেতার চাদর সরিয়ে ফেলে, দালাই লামা এক দিক থেকে নিজের হাতের বাঁধন খুলতে পেরেছেন – এখন তাঁর সঙ্গে বিশ্বের নেতৃস্থানীয় লোকেদের যোগাযোগ আর তিব্বতের স্বাধীনতার জন্য লড়াইয়ের সঙ্গে মিশিয়ে দেখা যায় না.

    কিন্তু একই সময়ে এটা এই লড়াইকেই আরও জটিল করেছে. তিব্বতের নির্বাসিত প্রশাসনের নতুন প্রধানমন্ত্রী, অবশ্যই এই ধরনের মর্যাদার অধিকার রাখেন না, যা দালাই লামার রয়েছে. তবুও, তাঁর প্রথম ঘোষণা শুনেই বোঝা গিয়েছে যে তাঁর উচ্চাভিলাষ খুবই সুদূর প্রসারী. শপথ নেওয়ার পরেই লবসাং সাঙ্গৈ ঘোষণা করেছেন যে, "তিব্বতের স্বাধীনতা আন্দোলন কোথাও হারিয়ে যায় নি".

    তিনি বলেছেন, "তিব্বতে কোন সমাজবাদ নেই, সেখানে রয়েছে উপনিবেশবাদ, তিব্বতে চিনের সরকার ন্যায় সঙ্গত নয় ও তা সহ্য করা যায় না".

    অবশ্যই এই ঘোষণা ও লবসাং সাঙ্গৈ এর কৃত কর্মের হিসাব – তিব্বতের যুব কংগ্রেসের প্রাক্তন সক্রিয় কর্মী হিসাবে – বেইজিং এর নজর এড়িয়ে যায় নি. সেখানে তিব্বতের প্রশাসনে পরিবর্তনকে খুবই সন্তর্পণে দেখা হয়েছে, এই মনে করে যে, দালাই লামা স্রেফ তাঁর প্রতি বিচ্ছিন্নতাবাদের অভিযোগ থেকে পিছলে বেরিয়েছেন, আর বাস্তবে তাঁর রাজনীতির কোন পরিবর্তনই হয় নি. কিন্তু এটা কি আসলে তাই?

    বাস্তবে যদি তাও হয়, তবে তিব্বতের স্বাধীনতা নিয়ে আন্দোলনকে সক্রিয় করার সময়টা খুব একটা ভাল বাছা হয় নি এই কথা মনে করেছেন রুশ বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি, তিনি মন্তব্য করেছেন:

    "আজ বিশ্বে একটাও দেশ নেই – এমনকি যারা চিনের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী তারাও – যারা চিনের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করতে চাইবে. প্রধান বিশ্ব ব্যাপী প্রতিদ্বন্দ্বী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের দেশের আভ্যন্তরীণ সমস্যাতেই খুব বেশী ভাবে জর্জরিত ও বিশ্বের নেতার মর্যাদা হারাতে পারে বলে শঙ্কিত.

    আঞ্চলিক ভাবে সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ভারত আর সমস্যা বাড়াতে চায় না, এমনিতেই দুই দেশের সম্পর্কে সমস্যা অনেক. তার ওপরে সমস্যা গুলি রয়েও গিয়েছে, আগের মতই তা চলছে, ২০০৩ সালে ভারত চিনের পক্ষ থেকে সিকিম কে ভারতের অঙ্গরাজ্য মেনে নেওয়ার কারণে তিব্বতের উপরে চিনের অধিকার মেনে নিয়েছিল ও মনে হয় না যে, এখন আবার নতুন করে সেই প্রশ্ন তুলবে – এটা ভারতেরই স্বার্থের জন্য ভাল নয়".

    আর তার মানে হল – যাই নতুন নির্বাসিত প্রশাসনের নেতার মনে থাকুক না কেন, বড় মাপের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতী তাঁর পাওয়ার সম্ভাবনা কম. কিছু ইউরোপ ও আমেরিকার দেশে কিছু মিছিল হয়তো বেরোবে, তিব্বতের স্বাধীনতার দাবিতে.কিন্তু সরকারি ভাবে বেইজিং এর প্রতি কোনও দাবী জানাতে কেউই যাবে বলে মনে হয় না.