স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুয়োরস্ সংস্থার তরফ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ গ্রহণের রেটিং কমিয়ে দেওয়া তাত্ক্ষণিক সারা বিশ্ব জুড়ে শেয়ার বাজার ও কাঁচামালের বাজারে প্রভাব ফেলেছে. সোমবার খোলার পরেই, ফ্রান্স ও জার্মানীর শেয়ার বাজারে দামের পতন দেখতে পাওয়া গিয়েছে. রাশিয়ার আন্তর্ব্যাঙ্ক মুদ্রা বাজারে শুক্রবারের চেয়ে শতকরা দুই ভাগ দাম কমে গিয়েছে. এশিয়ার সূচক সঙ্কট পরবর্তী দুই বছরের মধ্যে সবচেয়ে নীচু স্তরে পৌঁছেছে. সোজা কথায়, সকলেই ক্ষতিগ্রস্ত, শুধু সোনা ছাড়া – অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা তাঁদের জমা রাখার জন্য অন্য কোনও বিশ্বাস যোগ্য জিনিস খুঁজে পান নি.

    এস অ্যান্ড পি সংস্থার সিদ্ধান্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বছরে এক হাজার কোটি ডলার দামের হবে, এই পূর্বাভাস দিয়েছে জে পি মরগ্যান সংস্থা. মার্কিন ঋণের জন্য এতটাই বেশী অর্থ এরপর থেকে দিতে হবে রাষ্ট্রকে. নিজের পক্ষ থেকে দেশের ভিতরেও ঋণের জন্য সুদের মাত্রা চড়বে – গৃহ ঋণের দামও বাড়বে, গাড়ী কেনার জন্য ধারের সুদও চড়বে, ব্যাঙ্ক কার্ড ব্যবহারের জন্য পরিষেবা খরচও বেশী দিতে হবে. প্রসঙ্গতঃ, যদি এটা শুধু আমেরিকার লোকেদেরই জন্য হত, তবে এস অ্যান্ড পি সংস্থার ধারণা বিশ্বের বাজারে কোন প্রভাব ফেলত না. কিন্তু খুব কম লোকই এখন খোলা মনে বলতে পারেন যে, রেটিং সংস্থা বিশ্বের জন্য একটা চোখ খোলার ব্যবস্থা করছে আমেরিকার অর্থনীতির পরিস্থিতি নিয়ে, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার রুশ বিজনেস কনসাল্টিং কোম্পানীর বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান আলেকজান্ডার ইয়াকভলেভ বলেছেন:

    "আমেরিকার ঋণ সংক্রান্ত পরিস্থিতি বিগত কয়েক বছর ধরেই খারাপ, গত দশকেও কিছু ভাল ছিল না. অন্য দিক থেকে এক প্রভাব শালী ও যথেষ্ট সংরক্ষণ শীল রেটিং সংস্থার সিদ্ধান্ত – বলা যেতে পারে না যে, হঠাত্ করেই হয়েছে, কিন্তু তা যথেষ্ট রকমেরই অপ্রিয় ঘটনা. স্বাভাবিক ভাবেই, এটা বাজারে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে. এর আগেও আমরা দেখতে পেয়েছি বেচে দেওয়ার ধূম, কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় ঋণের সর্ব্বোচ্চ সীমা নিয়ে গত তিন সপ্তাহ ধরে যে বিতর্ক চলেছে, তা যথেষ্ট রকমেরই খারাপ করেছে বিনিয়োগকারীদের স্নায়ুর হাল. তারা সব কিছুই এক ধারে বেচে দিতে শুরু করেছিলেন. স্বাভাবিক ভাবেই, আমরা দেখেছি গত সপ্তাহ ধরেও সূচকের পতন. এই সপ্তাহে, আমি মনে করি, বাজারে আতঙ্ক থাকবেই".

    এই পরিস্থিতির বিপদ আরও এই কারণে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রেটিং কমিয়ে দিয়ে এস অ্যান্ড পি এক ইতিহাস সৃষ্টি করল. এর পরে নেতৃস্থানীয় অর্থনীতি গুলির রেটিং একের পর এক ধ্বসে পড়তে শুরু করতে পারে. বিশেষজ্ঞরা এর মধ্যেই দাম কমার বিষয়ে পরবর্তী সম্ভাব্য দেশ হিসাবে দেখছেন ফ্রান্সকে. ইউরোপীয় সঙ্ঘে এমনিতেই অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ভাল নয়, এই ধরনের সম্ভাবনা ইউরো মুদ্রার প্রতি বিশ্বাসকে একেবারেই নষ্ট করে দিতে পারে. ইউরোপীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক চেষ্টা করছে পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য, বাজার থেকে ইউরোপীয় দেশ গুলির শেয়ার কিনে. কিন্তু এই কাজ আলতো করে বললেও, সারা বিশ্বের ঝোঁকের তুলনায় খুবই দুর্বল.

    ডলার ভরসার অযোগ্য, ইউরো অস্থিতিশীল, খনিজ তেল উত্পাদন কমার সাপেক্ষে আরও কম বিক্রয় যোগ্য হচ্ছে. সবচেয়ে দ্রুত গতির লোকেরা সোনাতে নিজেদের সঞ্চয় রক্ষা করতে ছুটছে. দামী ধাতুর দাম আকাশ ছুঁয়েছে, আরও একবার রেকর্ড ভেঙেছে এবারে মানসিক বাধা এক ট্রয় আউন্সের জন্য ১৭০০ ডলার অতিক্রম করে. কিন্তু সোনার প্রতি এত বেশী ভালবাসা আরও একবার তৈরী করতে পারে নতুন বুদ্বুদ, যা ফাটতে দেরী করবে না. যাতে বিশ্বের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে খারাপ কিছু না হয়ে যায়, যখন বিনিয়োগকারীরা নিজেদের অর্থ কম্বলের তলায় লুকাতে শুরু করবেন, তাই এখনই সবচেয়ে ভাল সময় বিশ্ব সঞ্চয় মুদ্রা তৈরী করার, এই কথা মনে করেছেন রুশ বিজ্ঞান একাডেমীর আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও সম্পর্ক ইনস্টিটিউটের বিশ্ব অর্থনৈতিক স্থাপত্যের পুনর্গঠন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদ দিমিত্রি স্মীসলভ, তিনি বলেছেন:

    "সবচেয়ে চরম প্রকল্প হল – ডলারের পরিবর্তে ঐক্যবদ্ধ বিশ্ব বিনিময় মুদ্রা চালু করা. এই লক্ষ্য পূরণের জন্য সত্তরের দশকেই বিশেষ ধরনের ঋণ নেওয়ার অধিকার শুরু করা হয়েছিল. তখন আমেরিকার লোকেরা এটা চায় নি, যাতে ডলার বিশ্বে একচেটিয়া বিনিময় মুদ্রা হয়ে থাকতে পারে, তাই এই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন সম্ভব হয় নি. কিন্তু এখন এটা নিয়ে বলা হচ্ছে আরও বেশী করে, প্রসঙ্গতঃ সবচেয়ে লক্ষ্যনীয় হল একেবারেই আলাদা সব লোকেরা. এই ধারণা রুশ পরিকল্পনাতেও ছিল, যা নিয়ে লন্ডনের বড় কুড়ি অর্থনৈতিক ভাবে উন্নত দেশের শীর্ষ বৈঠকে রাশিয়া বক্তৃতা দিয়েছিল. চিন এখন এই নিয়ে যথেষ্ট জোর দিয়ে বলছে. বহু অর্থনীতি বিদই, এমনকি আমেরিকার লোকেরাও, ডলারের বদলে কোন বিশে, বিনিময় মুদ্রায় সঞ্চয় জমা করা কথা বলছে".

    এখানে বিনা শর্তেই বলা যেতে পারে যে, এই ধরনের কাজ খুবই কঠিন. বহু দেশই তাদের সঞ্চয়ের বিশাল অংশ আমেরিকার মুদ্রায় করে রেখেছে. অংশতঃ, চিন, যারা আমেরিকার ঋণ পত্রে জমা করা রেখেছে এক লক্ষ কোটি ডলারেরও বেশী. জাপানেরও তা খুব কম নয়. এই সবই অন্য কোন তহবিলে পাঠানো খুবই কঠিন কাজ, আর তা বিপজ্জনকও. তাই আপাততঃ বিশ্ব অর্থনীতির প্রভাবশালী লোকেরা বলে চলেছেন এমন সব কথা, যাতে বিশ্বের বাজারে আতঙ্ক কম হয়. তারা আমেরিকার ঋণ পত্রের উপরে ভরসা করতে বলছেন. কিন্তু এটা বিশেষজ্ঞদের নেতিবাচক পূর্বাভাস পার হতে পারবে কি না ও বিনিয়োগ কারীদের পলায়ন বন্ধ করতে পারবে কি না, তা জানা নেই, কিন্তু অন্য কোনও নির্দিষ্ট পরিকল্পনা বিশ্বের নেতৃস্থানীয় অর্থনৈতিক ক্ষমতাসীন দের নেই. আর এই বোধ শুধু আতঙ্কেরই বৃদ্ধি করে.