ককেশাসে "পাঁচ দিনের যুদ্ধের" পর থেকে তিনটি বছর কেটে গিয়েছে, যখন রাশিয়া দক্ষিণ অসেতিয়ার প্রতি জর্জিয়ার আগ্রাসনকে বাধা দিয়েছিল. "রেডিও রাশিয়ার" পক্ষ থেকে প্রশ্ন করা হলে বিশেষজ্ঞরা ২০০৮ সালের ঘটনাকে স্মরণ করে এই অঞ্চলের বর্তমান পরিস্থিতি সম্বন্ধে তাঁদের মন্তব্য করেছেন.

    ৮ই আগষ্ট ভোর রাতে জর্জিয়ার সেনা বাহিনী স্খিনভাল শহরে আক্রমণ শুরু করেছিল. একসাথে বহু গোলা রকেট বর্ষণ কারী অস্ত্র দিয়ে দক্ষিণ অসেতিয়ার রাজধানীর বসতি এলাকায় গোলা বর্ষণ শুরু করেছিল. একই সাথে রুশ শান্তি রক্ষক বাহিনীর ঘাঁটিও আক্রমণ করা হয়েছিল. দক্ষিণ অসেতিয়ার জনগনকে, যাঁদের মধ্যে অধিকাংশই সেই সময়ে ছিল রুশ নাগরিক, তাঁদের মারা যেতে দেখে, মস্কো তবিলিসি শহরের গরম মাথা নেতাকে শান্ত হতে বাধ্য করেছিল মাত্র পাঁচ দিনের যুদ্ধে. এই অপারেশন ছিল খুবই নির্দিষ্ট ও প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত, যেখানে রাশিয়া নিজেদের শুধু রক্ষাকারী হিসাবেই প্রতিপন্ন করেছিল, আগ্রাসক হিসাবে নয়, এই কথা উল্লেখ করে রুশ রাজনৈতিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান ও রাজনীতিবিদ সের্গেই মার্কভ বলেছেন:

    "তখন সিদ্ধান্ত নেওয়া খুব কঠিন ছিল, কিন্তু রাশিয়া একেবারেই ঠিক কাজ করেছে. প্রথমতঃ, সামরিক ভাবে যুদ্ধ করে নিজেদের শান্তি রক্ষক বাহিনী ও দক্ষিণ অসেতিয়ার মানুষদের রক্ষা করেছে. দ্বিতীয়তঃ, সাকাশভিলির সামরিক বাহিনী ও তাদের পরিকাঠামো ধ্বংস করে দিয়েছে. তৃতীয়তঃ, তবিলিসি শহরে প্রবেশ করে নি, মিখাইল সাকাশভিলিকে ধ্বংস করে নি ও তাকে বন্দীও করে নি. আমরা প্রমাণ করে দিয়েছি যে, হঠে আসতে তৈরী নই এবং রাশিয়াকে শ্রদ্ধা করা দরকার".

    ২০০৮ সালের আগষ্ট মাসে ইউরোপে মস্কোর থেকে তবিলিসি শহর আক্রমণ করা হচ্ছে, বলে রটনা করা হয়েছিল, কিন্তু পরে সেখানেই স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে যে, জর্জিয়াই দক্ষিণ অসেতিয়া আক্রমণ করেছিল. কিন্তু তার থেকেও বেশী মূল্যবান ও উল্লেখ যোগ্য হয়েছিল দক্ষিণ অসেতিয়ার রাজধানী স্খিনভাল শহরের মানুষদের রাশিয়ার সেনা বাহিনীকে দেখার প্রতিক্রিয়া, এই কথা বলেছেন "রেডিও রাশিয়াকে" দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের ককেশাস গবেষণা বিভাগের প্রধান ইয়ানা আমেলিনা, যিনি ২০০৮ সালের আগষ্ট মাসের ঘটনার দিন গুলিতে নিজেই স্খিনভাল শহরে ছিলেন, তিনি বলেছেন:

    "আমি ২০০৮ সালের ১০ ও ১১ ই আগষ্ট মনে করতে পারছি: মানুষ, স্খিনভাল শহরের বাসিন্দারা, রাশিয়ার সেনা বাহিনীকে দেখে, তাদের এগিয়ে যাওয়া ট্যাঙ্কের কাছে গিয়ে শহরের সমস্ত রাস্তায় ঠিক পঞ্চাশ – ষাট বছর আগে পূর্ব ইউরোপে যেমন সোভিয়েত বাহিনীকে হিটলারের বাহিনীর বিরুদ্ধে জয়ী হয়ে এগিয়ে যেতে দেখে লোকে ফুল নিয়ে এগিয়ে এসেছিল, তেমনই ভাবে নিজেদের প্রাণের আশা, ভালবাসা জানিয়েছিল, এটা ভোলা সম্ভব নয়. তারা ফুল ছড়িয়ে দিয়েছিল রাস্তায়. কাঁদছিল আবেগে".

    যদি আবেগ ভুলে শুধু পরিস্থিতিকে বিচার করা হয়, তাহলে দেখা যাবে যে, রাশিয়ার আর অন্য কোনও পথও ছিল না, সামরিক ভাবে প্রতি আক্রমণ না করে. অন্য যে কোন ধরনের পরিস্থিতির পরিবর্তনই শুধু দক্ষিণ অসেতিয়ার জন্যই মৃত্যুর কারণ হত না, রাশিয়ার আভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির জন্যও তা একই রকম হত, তাই ইয়ানা আমেলিনা যোগ করেছেন:

    "রাশিয়া যদি তখন যা উচিত্ তা না করতো, দক্ষিণ অসেতিয়ার জন্য লড়তে না যেতো, যেখানের বেশীর ভাগ লোকই এই দেশের নাগরিক, তবে এই দেশ একেবারেই আর থাকত না বিশ্বের মানচিত্রে. যদি রাশিয়া তখন আইন সঙ্গত ভাবে অন্য একটি দেশের ভিতরে নিজেদের সেনা অনুপ্রবেশের খুবই কঠিন ও কড়া সিদ্ধান্ত না নিত, তবে আজ আমরা উত্তর ককেশাস বলে আর কিছুই দেখতে পেতাম না রুশ প্রজাতন্ত্রের অঙ্গ হিসাবে. এই ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা উত্তর ককেশাস কখনোই রাশিয়াকে ক্ষমা করে দিত না. তার উপরে রাশিয়া নিজের দেশের ভিতরেই সশস্ত্র বহু যুদ্ধ ক্ষেত্র দেখতে বাধ্য হত, কারণ নিজেদের নাগরিকদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা এক রকম ভাবেই সারা রাশিয়া জুড়ে স্বীকৃত হত. এই দেশেই মাত্সান্যায় শুরু হতে পারত".

    রাশিয়ার টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে জর্জিয়ার বিরোধী পক্ষের এক নেত্রী নিনো বুরজানাদজে খুবই তীক্ষ্ণ ভাষায় ২০০৮ সালে মিখাইল সাকাশভিলির কাজের নিন্দা করেছেন, তিনি বলেছেন:

    "দুঃখের কথা হল, সাকাশভিলির চারপাশে দীর্ঘ কাল ধরে, এখনও তারা রয়েছে, এমন সব লোক আছে, যারা তাকে খুব ভাল কোনও উপদেশ পরামর্শ দেয় না, তার মধ্যে রাশিয়া ও জর্জিয়ার সম্পর্ক নিয়ে এবং এই যুদ্ধে জর্জিয়ার সেনা বাহিনীর জয়ের সম্ভাবনা সম্বন্ধেও. এই সব লোকেরা বলেছিল যে, রাশিয়ার পুরনো ট্যাঙ্ক মরচে ধরা, আর আমাদের দেখ নতুন ট্যাঙ্ক বাহিনী. এই কথার উত্তরে আমার জবাব ছিল খুবই সহজ: হতে পারে সেগুলিতে মরচে পড়েছে, কিন্তু সেই গুলি আমাদের চেয়ে অনেক বেশী. এমন সব লোক ছিল, যারা বলেছিল যে, আমরা এক রাত্রের যুদ্ধেই জিতে যাবো, সেটাই সাকাশভিলি আবার করে বলছিল. আমি জানি না, তাকে কেউ কোন রকমের সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছিল কি না. কিন্তু আমি মনে করি যে, একেবারেই স্পষ্ট ছিল – কেউই রাশিয়ার সঙ্গে জর্জিয়ার জন্য যুদ্ধ করতে আসবে না. আর সমস্ত রকমের সম্ভাব্য, অসম্ভাব্য কাজই তখন করার দরকার ছিল, যাতে রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে যেতে না হয়".

    রাশিয়ার ও পশ্চিমের বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন যে, ককেশাসের সমস্যার শক্তি প্রয়োগ করে সমাধান করাতে মস্কোর পক্ষে বর্তমানে এই অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব কে শক্ত করা সম্ভব হয়েছে. বাস্তবে আজকের দিনে রাশিয়া – ককেশাস অঞ্চলের একমাত্র নিরাপত্তার বিষয়ে গ্যারান্টি. তাছাড়া, গত তিন বছরে দক্ষিণ অসেতিয়া ও আবখাজিয়া দেশের উন্নতির জন্য কম পক্ষে দেড়শ কোটি রুবল সাহায্য হিসাবে দিয়েছে. আর এই সমস্ত সময় ধরেই রাশিয়া চেষ্টা করে চলেছে এই দুই প্রজাতন্ত্রের জন্যই কূটনৈতিক ভাবে এদের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করার জন্য আলোচনায় অংশ গ্রহণ করে.