মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ব জোড়া একচেটিয়া ভাবে অর্থনৈতিক নেতা হয়ে থাকার দিন বুঝি গেল. এমন কথা বলতে পেরেছেন রুশ ব্যাঙ্কগুলির সংগঠনের সভাপতি গারেগিন তোসুনিয়ান. আমেরিকা সম্ভাব্য হিসাবে বকেয়া ঘোষণা করুক আর নাই করুক, ডলার এবারে "অন্যদিকে সরিয়ে দেওয়া" হবেই, এই বিষয়ে স্থির বিশ্বাস রাখেন বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞ.

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ডিফল্টের কিনারায় দাঁড়িয়ে. যদি রাজনীতিবিদেরা ওয়াশিংটনে ঋণের সর্ব্বোচ্চ মাত্রা নিয়ে একটা সমঝোতাতে না আসতে পারেন, তাহলে আর কয়েক দিনের মধ্যেই সেই দেশের ইতিহাসে এই প্রথমবার নেতিবাচক ঘটনা বাস্তবে পরিণত হতে চলেছে. আর তার ফল, যেমন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের প্রধান ক্রিস্টিন লাগার্দ ঘোষণা করেছেন, সারা বিশ্বের অর্থনীতিই অনুভব করবে. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা ও মার্কিন কংগ্রেসের রিপাব্লিকান দলের সংখ্যাগরিষ্ঠদের মধ্যে বিরোধ পৌঁছেছে চরমে. বিশ্বের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এখন আমেরিকার কংগ্রেসের লড়াইয়ের বন্দী হয়েছে, এই কথা উল্লেখ করে গারেগিন তোসুনিয়ান বলেছেন:

"বিনিয়োগের বাজারকে কোন রকমের অকল্পনীয় বিপর্যয়ের থেকেই সম্পূর্ণ ভাবে বিপদ মুক্ত রাখার গ্যারান্টি দেওয়া যায় না. কিন্তু যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমানের পরিস্থিতির মূল্যায়ণ করা হয়, তবে দেখা যাবে যে, এটা একেবারেই পরিষ্কার রাজনৈতিক লড়াই. একই সময়ে যদি বিগত বছর গুলির কথা মনে করা হয়, তবে এই বিরোধে নিরত দলগুলি একাধিকবার সরকারি ঋণের সর্ব্বোচ্চ মাত্রা নিয়ে সমঝোতা করেছে. আর পরবর্তী মাত্রা বৃদ্ধিও ঘটেছে. অন্য কথা হল, এটা কি অন্তহীণ ভাবে বাড়ানো সম্ভব"?

আর তাও গারেগিন তোসুনিয়ান মনে করেছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেকনিক্যাল ডিফল্টের সম্ভাবনা খুবই কম সম্ভাব্য. একই সঙ্গে বিশ্বের মাপে, যে কোন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই ওয়াশিংটনের বিশ্ব অর্থনৈতিক ও বিনিয়োগ ক্ষেত্রে একচেটিয়া নেতৃত্বের দিন ফুরিয়ে এসেছে, বিশেষজ্ঞ এই বিষয়ে বিশ্বাস করেই বলেছেন:

"এমনকি কোন রকমের ডিফল্টের ঘোষণা ছাড়াই, যা আমি মনে করছি হবে না, উপস্থিত পরিস্থিতি সেই বিষয়কেই ঘটতে দিচ্ছে যে, ডলার ও আমেরিকার আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিসরে একচেটিয়া প্রভুত্বকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে. আমেরিকার মুদ্রার প্রভাব আস্তে ধীরে একেবারেই ফুরিয়ে যাবে. আর আমেরিকা নিজেকে একমাত্র দেশ হিসাবে টিকিয়ে রাখতে পারবে না, যারা বিশ্বকে নিজেদের শর্তে চলতে বাধ্য করে. আর তারই প্রমাণ হয়েছে যেমন ইউরো, যা মাত্র বছর দশেকের সামান্য বেশী আগে উদ্ভব হয়েছে, আর আজকের সোনা ও বিদেশী মুদ্রার সঞ্চয়ে অন্ততঃ রাশিয়ার ক্ষেত্রেই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে যে, তা নির্দিষ্ট মাত্রায় ডলার ও ইউরো সম্পর্কে ভারসাম্য নিয়েই করা হয়েছে".

একই ধরনের অবস্থান রাশিয়ার লোকসভার অর্থনৈতিক রাজনীতি ও ব্যবসায় পরিষদের প্রধান ইভগেনি ফিওদরভ এরও. "রেডিও রাশিয়া" কে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে রাজনীতিবিদ উল্লেখ করেছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এর ফলে বিশ্বের সবচেয়ে বৃহত্ অর্থনীতির উপাধি হারাতে চলেছে. আর এটা এহ বাহ্য, কারণ যুক্তরাষ্ট্র কিনে চলেছে সবার চেয়ে বেশী, বিক্রী যত করে তার থেকে অনেক বেশী, তার ওপরে রাষ্ট্রের ব্যয় তার কর সংক্রান্ত আয়ের চেয়ে অনেক বেশী – দেশ ক্রমাগত ঋণ নিয়েই চলেছে, এই কথা মনে করিয়ে দিয়ে ইভগেনি ফিওদরভ বলেছেন:

"আমেরিকার রাজনৈতিক একচেটিয়া মত, একে অর্থনৈতিক ভাবেও একচেটিয়া হতে দিয়েছে. বাস্তবে ডিফল্টের মানে হল যে, আমেরিকার লোকেরা তাদের নিজস্ব ক্ষমতা অনুযায়ী বেঁচে নেই. অর্থাত্, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তারা বাস্তবে বিশ্বের অন্যান্য লোকেদের কাছ থেকে লুন্ঠন করে চলেছে. বিশ্বের মাত্র সাড়ে চার শতাংশ লোক সারা বিশ্বের মোট বাত্সরিক আয়ের শতকরা চল্লিশ শতাংশ ভোগ করে চলেছে. আমি বিশ্বাস করি না যে, আমেরিকা কোন দিনও নিজেদের ঋণ ফেরত দেবে".

এখন আমেরিকার কাণ্ড দেখা হচ্ছে সারা বিশ্ব জুড়েই. কারণ যদি এদের আইন প্রণেতারা সরকারি ঋণের মাত্রা বাড়তে না দেয়, তবে প্রশাসনের নিয়মিত খরচা করার মতো অর্থ ফুরিয়ে যাবে. বাইরের থেকে নেওয়া ঋণের উপরে সুদের মাত্রা বেড়ে যাবে, সরকারি ঋণ পত্র ও ডলারের স্থিতিশীলতা নিয়েই প্রশ্ন উঠবে. এই পটভূমিতে বহু বিশেষজ্ঞই নতুন করে বিশ্ব অর্থনৈতিক সঙ্কটের প্লাবনের আশঙ্কা করছেন, যার তুলনায় ২০০৮ সালের বিশ্ব অর্থনৈতিক ত্সুনামি মনে হবে আলতো করে গা ধুয়ে দেওয়া ঢেউ.

এখানে আগ্রহী হওয়ার মতো বিষয় হল যে, কিছু বিশেষজ্ঞ আবার বলছেন যে, এই রকমেরই একটা ঝাঁকুনি বিশ্বের অর্থনীতির এখন প্রয়োজন. এটা পুরনো অর্থনৈতিক গঠন থেকে নতুন গঠনে আসতে সাহায্য করবে. প্রসঙ্গতঃ, এক মেরু বিশিষ্ট রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্বের কাঠামো খুলে ফেলার আহ্বান করা হয়েছে বহু দেশ থেকে ও তার মধ্যে রাশিয়াও রয়েছে. এখানে নতুন সঞ্চয়ের মুদ্রা তৈরীর কথাও আছে, তার মধ্যে আঞ্চলিক মুদ্রা রয়েছে, যা থাকবে সমগ্র বিশ্ব সমাজেরই নিয়ন্ত্রণে, কোন একক দেশের নয়. তখন সত্যিকারের মুদ্রা ও অর্থনীতির মধ্যে প্রতিযোগিতা করা সম্ভব হবে, নতুন করে বিনিয়োগের নামে বুদ্বুদ তৈরী করা নয়, যা সারা বিশ্বকেই বিপদে ফেলার ব্যবস্থা করে.