ইরান ভারতকে খনিজ তেল সরবরাহ করা বন্ধ করেছে, কারণ এই দেশের ঋণ পাঁচ বিলিয়ন ডলারেরও বেশী হয়েছে. ভারতের একটিও তেলের কোম্পানী, যারা ইরান থেকে খনিজ তেল পাচ্ছিলেন, তাদের বর্তমানে আগামী মাসে (আগষ্ট) সরবরাহ পাওয়ার কোনও পরিকল্পনা নেই. এই বিষয়টি বিশদ করে লিখেছেন আমাদের সমীক্ষক গিওর্গি ভানেত্সভ.

    এই সম্পূর্ণ রকমের ন্যক্কার জনক ইতিহাসে অদৃশ্য ভাবে উপস্থিত রয়েছে এক তৃতীয় অংশীদার – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র. ইরান ও ভারতবর্ষ বর্তমানে মার্কিন রাজনীতির জালে বন্দী হয়েছে. ওয়াশিংটন রাষ্ট্রসংঘের উপরে চাপ দিয়ে ও ইউরোপীয় সংঘের উপরে চাপ দিয়ে নিষেধাজ্ঞা আদায় করেছে ইরানের বিরুদ্ধে. সেই সমস্ত দেশ, যারা ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক যোগাযোগ উন্নত করেছে, তার সকলেই কঠিন অবস্থায় পড়েছে. তাদের সামনে জটিল বিনিয়োগের সমস্যা এসেছে ও তারা আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংস্থা ব্যবহার করে ইরান থেকে পাওয়া তেলের দাম দিতে পারছে না. এই রকমের অবস্থায় শুধু ভারতই পড়ে নি, চিনও পড়েছে. এই সম্বন্ধেই অংশতঃ বলেছেন মস্কোর জ্বালানী ও বিনিয়োগ ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর ভ্লাদিমির ফেইগিন:

    "এটা অবশ্যই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে বিশেষ ধরনের প্রভাবের ফলে হয়েছে, যা তারা করেছে আন্তর্জাতিক ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা ও বিনিয়োগ সংস্থা গুলির উপরে. ভারতও এই গুলির সঙ্গে যুক্ত ও অবশ্যই, চায় যে, নিজেদের প্রতি এই সংস্থা গুলির ভাল সম্পর্ক.এখানে কোনও নিষেধাজ্ঞার কথা হচ্ছে না. আলোচনা সব দাঁড়িয়ে গিয়েছে এক অনির্দিষ্ট জায়গাতে আর কোনও ফলও হচ্ছে না. তাই এখন বাঁকা পথে নিষেধাজ্ঞা ব্যবহার করা হচ্ছে, ইরানের সঙ্গে যে সমস্ত দেশ ব্যবসা করে, তাদের হাল খারাপ করে দিয়ে. মনে হয় নতুন ধরনের প্রভাবের কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে. আর তা কাজও করছে. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপে পড়ে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক "এশিয়া ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন" ব্যবহার করে ইরানের সঙ্গে খনিজ তেলের দাম দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে ও অন্যান্য কোনও পথ খোঁজার বিষয়ে তেহরানের সঙ্গে খনিজ তেলের চুক্তি নিয়ে আলোচনাও বন্ধ করেছে. হামবুর্গ শহরের ইরানের ব্যাঙ্ক "অইরোপীশ – ইরানিশে হ্যান্ডলস্ ব্যাঙ্ক" ব্যবহার করে ভারত থেকে খনিজ তেলের জন্য ইরানকে দাম দেওয়ার পথও বন্ধ হয়েছে কয়েক মাস আগে ঐস্লামিক প্রজাতন্ত্রের উপরে পশ্চিমের চাপ বাড়ানোর নাম করে একমাত্র শাখা টিকে জার্মানীর সরকার বন্ধ করে দেওয়াতে.  সুতরাং বাস্তবে ভারতকে দেওয়া তেলের দাম পাওয়ার বন্দোবস্ত একেবারেই ধ্বংস করে দেওয়াতে তেহরানের প্রতি ভারতীয় ঋণ খালি বেড়েই গিয়েছে. ইরানের পক্ষে ভারতকে তেল দেওয়া বন্ধ করা ছাড়া আর কোনও পথ থাকে নি".

    ইরান ভারতকে প্রতি দিনে প্রায় চার লক্ষ ব্যারেল পর্যন্ত তেল সরবরাহ করতো, আর এই ভাবে ভারতের চাহিদার শতকরা বারো শতাংশ পূরণ হতো. চিনের পরে ভারত দ্বিতীয় বৃহত্তম আমদানী কারক দেশ, যারা ইরান থেকে খনিজ তেল পেতো. আর এই ঘাটতি যা এখন হয়েছে, তা পূরণ করা সহজ কাজও নয়. ভারতের খনিজ তেল ও গ্যাস মন্ত্রী জয়পাল রেড্ডী অবশ্য তাঁর দিকে আশার বাণী শুনিয়েছেন, তিনি বলেছেন - ভারত খনিজ তেলের ঘাটতি হতে দেবে না, আমরা এখন অন্য দিক থেকে এই কাঁচামাল আনার ব্যবস্থা করছি, তার মধ্যে সৌদী আরবও রয়েছে. একই ধরনের পরামর্শ বর্তমানে নয়া দিল্লীর পক্ষ থেকে করা হচ্ছে সংযুক্ত আরব আমীর শাহী, কুয়েইত ও ইরাকের সঙ্গেও.

    ভারত যেমন মার্কিন চাপের কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে, চিন কিন্তু ইরানের সঙ্গে সহযোগিতা গুটিয়ে ফেলতে যায় নি. তারা বরং চেষ্টা করছে এই সমস্যাকে বার্টার বা বিনিময় করে মিটিয়ে ফলতে, তারা ইরানের খনিজ তেলের জন্য নিজেদের দেশের উত্পাদিত পণ্য দিতে চেয়েছে. চিনের কোম্পানী গুলি আরও সক্রিয় ভাবে ইরানের খনিজ তেল ও গ্যাসের সেক্টরে ঢুকতে চলেছে, যেখানে ইউরোপীয় ও আমেরিকার কোম্পানী গুলি নিষেধাজ্ঞার কারণে ঢুকতে পারছে না. ইরান ও চিনের মধ্যে গত বছরে কারবার হয়েছে ২৯ বিলিয়ন ডলারের বেশী, যা ২০০৯ সালের চেয়ে শতকরা চল্লিশ ভাগ বেশী.

    আমেরিকার চাপের কাছে হার মেনে ভারত ইরান থেকে তেল নেওয়া বন্ধ করেছে. এর আগে – তারা ইরান – পাকিস্তান – ভারত সম্মিলিত গ্যাস পাইপ লাইন তৈরীর প্রকল্প থেকে বেরিয়ে গিয়েছে. এর ফলে দেশে প্রয়োজনীয় জ্বালানীর অভাব ঘটবেই. তাই ভারতের মন্ত্রীর এই আশার বাণী শেষ অবধি কতটা কার্যকর হবে তাই এখন দেখার বিষয়.