মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আগামী দুই বছরের মধ্যে ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমান বাড়িয়ে দ্বিগুণ করতে চেয়েছে, অর্থাত্ তা দশ হাজার কোটি ডলার করতে চায়. এই বিষয়ে খবর দিয়েছেন ওয়াশিংটনের "ফরেন পলিসি" নামের সাপ্তাহিক পত্রিকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিনিধি, তিনি মন্তব্য করেছেন মার্কিন রাষ্ট্রসচিব শ্রীমতী হিলারি ক্লিন্টনের ভারত সফর প্রসঙ্গে. এই সফরের অন্যান্য প্রাথমিক বিষয় গুলি তাঁর মতে, আমেরিকার কোম্পানী গুলির স্বার্থের জন্য ভারতের সঙ্গে পারমানবিক ও সামরিক প্রযুক্তি সহযোগিতা বাড়ানো. বিষয় নিয়ে বিশদ করে লিখেছেন আমাদের সমীক্ষক গিওর্গি ভানেত্সভ.

    মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শুধু অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্যই এবারের ভারত সফর করা হচ্ছে বললে অবশ্যই তা ঠিক হবে না. সফর হয়েছে মুম্বাই শহরে আরও একটি প্রতিধ্বনি তোলা সন্ত্রাস কাণ্ডের অব্যবহিত পরেই. তা ভারতীয়দের গত ২০০৮ সালের তিনটি ভয়ঙ্কর দিনের স্মৃতিকে আবারও মথিত করেছে. এবারেও বিচ্ছিন্নতাবাদ ও সন্ত্রাসের মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রসার ক্লিন্টনের সঙ্গে ভারতীয় নেতৃত্বের সাক্ষাত্কারের সময়ে ও তাঁর বক্তৃতার অন্যতম বিষয় হয়েছে. হিলারি ভারত – পাকিস্তানের আলোচনাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন, নতুন করে শুরু হওয়ার জন্য এবং আফগানিস্থানে শান্তিপূর্ণ ভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের কথাও বলা হয়েছে.

    তা স্বত্ত্বেও, আমেরিকার রাষ্ট্রসচিব বাস্তবেই খুবই সক্রিয়ভাবে পারমানবিক শক্তি ও সামরিক প্রযুক্তি ক্ষেত্রে আমেরিকার কোম্পানী গুলির সহযোগিতার বিষয়ে স্বার্থের জন্য দরবার করেছেন. জানা আছে যে, গত বছরে বারাক ওবামার সফরের সময়ে ভারতে এক বড় প্যাকেজ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যার অর্থ মূল্য ছিল এক হাজার কোটি ডলারেরও বেশী. ওয়াশিংটন ভারতকে সি – ১৭ নামের সামরিক পরিবহন কারী বিমান বিক্রয় করেছে, তাদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ পারমানবিক শক্তি বিষয়ে সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে ও অন্যান্য উচ্চ প্রযুক্তি ক্ষেত্রেও সহযোগিতার চুক্তি করেছে. কিন্তু আমেরিকা ভারতে নিজেদের যুদ্ধ বিমান এফ – ১৬ বিক্রয়ের জন্য এক বড় আন্তর্জাতিক টেন্ডার হেরে গিয়েছে, ভারতীয় বিমান বাহিনীকে বিমান সরবরাহের ক্ষেত্রে. আর ভারতে পারমানবিক শক্তি বিষয়ে সহযোগিতা চুক্তি করার পরেও কোন পারমানবিক শক্তি কেন্দ্র তৈরী করতে পারে নি. জাপানের ফুকুসিমা কেন্দ্রের বিপর্যয়ের পরে পরিস্থিতি আরও ঘোরালো হয়েছে. ভারতে পারমানবিক শক্তি সংক্রান্ত যন্ত্রপাতি সম্বন্ধে আইন আরও কড়া হয়েছে. ভারতের লোকসভা নতুন আইন করেছে, যাতে এই ধরনের যন্ত্রপাতি যে সমস্ত দেশ সরবরাহ করবে, তাদের পক্ষ থেকে গ্যারান্টি দেওয়ার কথা হয়েছে এই ধরনের যন্ত্রপাতি ব্যবহারের সম্পূর্ণ সময় সীমা অবধি. কিন্তু আমেরিকার ব্যক্তিগত মালিকানায় চলা এই ধরনের যন্ত্র তৈরীর কোম্পানী গুলি ও তাদের জন্য বীমা যারা করে, সেই কোম্পানী গুলি এই আইনের সাথে একমত নয়. ওয়াশিংটনে মনে করা হয়েছে যে, এক্ষেত্রে লাভজনক অবস্থায় রয়েছে রাশিয়া ও ফ্রান্সের কোম্পানী গুলি, যারা সরাসরি সরকারের মালিকানায় আছে. এই রকম কথা সমর্থন করেছেন ওয়াশিংটনের নূতন আমেরিকার নিরাপত্তা কেন্দ্রের কর্মী রিচার্ড ফনটেন.

    তারই মধ্যে ভারত, চিনের মতই পারমানবিক প্রযুক্তির জন্য ভবিষ্যতে সবচেয়ে আগ্রহ জনক বাজার হয়ে রয়েছে, এই কথা মনে করিয়ে দিয়ে মস্কোতে জ্বালানী শক্তি ও নিরাপত্তা কেন্দ্রের ডিরেক্টর আন্তন খ্লোপকভ বলেছেন:

    "জ্বালানী শক্তি নিরাপত্তা কেন্দ্রের মূল্যায়ণে গত বছরে রাশিয়ার প্রতি দ্বিতীয় নির্মীয়মাণ রিয়্যাক্টর আগামী কুড়ি বছর ধরে যা দেশের বাইরে তৈরী হবে, তা হতে চলেছে সেই ভারতেই. এই দিক থেকে, বোঝাই যাচ্ছে যে, ভারত রাশিয়ার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাজার হয়েই থাকছে ও সরকারি কোম্পানী "রসঅ্যাটমের" জন্যও. যারা জাপানের বিপর্যয় স্বত্ত্বেও বিদেশে পারমানবিক শক্তি কেন্দ্র খোলার দূর প্রসারিত পরিকল্পনা নিয়েছে. রুশ – ভারত সহযোগিতার অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল পারমানবিক জ্বালানী, যা শুধু রুশ নির্মিত রিয়্যাক্টরই নয়, ভারতে অন্যদের তৈরী রিয়্যাক্টরের জন্যও সরবরাহ করার কথা. এই ক্ষেত্রেও রাশিয়ার পারমানবিক শক্তি শিল্পের জন্য ভারতের বাজার খুবই গুরুত্বপূর্ণ".

    কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগী পছন্দ করে না. ওদের জন্য প্রতিযোগীর কোনও দরকার নেই, তার ওপরে ভারতের বাজারে. বিশেষত, যদি তারা ওয়াশিংটনকে নিজেদের জায়গা ছেড়ে দিতে রাজী না হয়. এর মধ্যেই চিনের সঙ্গে এই বছরে ভারতের বাণিজ্যের পরিমান হয়েছে ছয় হাজার কোটি ডলারের উপরে. ফ্রান্স ভারতের সঙ্গে চুক্তি করেছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্র তৈরী করার জন্য. রাশিয়া অগ্রগামী হয়েছে, এই বছরেই কুদানকুলামে প্রথমটি ও তার ছয় মাসের মধ্যে দ্বিতীয় রিয়্যাক্টর চালু হওয়ার কথা, তাছাড়া আরও ষোলটি রিয়্যাক্টর বিভিন্ন জায়গায় লাগানো হবে বলে চুক্তি রয়েছে. তাই এটাই বোধহয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র রাজনীতি দপ্তরের প্রধানের বিদেশ সফরের সময়ে নিজের উপরে "ফেরিওলার" দায়িত্ব নিতে বাধ্য করেছে, যা আসলে তাঁর কাজের বর্ণনার মধ্যে পড়ে না.