রাশিয়ার মহাকাশ রকেট তৈরীর কোম্পানী "এনার্জি" কক্ষপথে কৃত্রিম উপগ্রহ মেরামত করার জন্য পাইলট চালিত মহাকাশ যান তৈরী করছে. এই যান একই সঙ্গে পৃথিবীর কাছের কক্ষপথে বিকল হয়ে যাওয়া উপগ্রহ ও মহাকাশের জঞ্জাল জড় করে ফিরিয়ে আনতে পারবে. ২০১৫ সালে "ভস্তোচনি" মহাকাশ উড়ান কেন্দ্র থেকে পাঠানো হবে প্রথম স্বয়ংক্রিয় মহাকাশ যান ও তার তিন বছর পরে এই যান অভিযাত্রী সমেত যাবে.

    এই যানে দুইজন মহাকাশচারী থাকবেন, যারা উন্মুক্ত মহাকাশে বেরিয়ে উপগ্রহ গুলিতে প্রয়োজনীয় অংশ বদলে দিতে পারবেন. অথবা এই কাজই করা হবে কৃত্রিম হাত দিয়ে, যা মহাকাশচারীদের বিশেষ স্কাফান্দার এর মধ্যে হাতের মতই কাজ করবে. এই ধরনের উড়ানের সময় সীমা হবে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত. মেরামতের জন্য অভিযান প্রাথমিক ভাবে করা হবে পৃথিবীর দূর থেকে অবলোকনের উপযুক্ত মহাকাশ যান এবং আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের কৃত্রিম উপগ্রহ গুলির জন্য. অন্য একটি লক্ষ্য হল, কক্ষ পথকে জঞ্জাল মুক্ত করা, এই কথা উল্লেখ করে এই কোম্পানীর সভাপতির বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা ভিক্তর সিনিয়াভস্কি বলেছেন:

    "কাজ শেষ করা উপগ্রহ গুলি মহাকাশচারীদের স্বাভাবিক কাজকর্মে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে, সেগুলি বিপজ্জনক. নীতিগত ভাবে এই গুলিকে বিশেষ ধরনের স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র দিয়ে বিশেষ গতি কমানোর ব্যবস্থা দিয়ে বিশ্বের মহা সমুদ্রে ডুবিয়ে দিতে পারলেই ভাল হয়. এই ভাবেই পৃথিবীর কাছের কক্ষ পথকে জঞ্জাল মুক্ত করা সম্ভব. একই ভাবে করা যেতে পারে ভৌগলিক ভাবে স্থাণু কক্ষ পথকেও পরিষ্কার করা যেতে পারে".

    বিশ্বের চারপাশে বর্তমানে প্রায় ছয় লক্ষ কৃত্রিম উপগ্রহের ধ্বংসাবশেষ ও রকেট পরিবাহকের টুকরো, যেগুলির মাপ এক সেন্টিমিটার থেকে বড় ও তার থেকেও বেশী ঘুরছে. বিশেষজ্ঞরা এই গুলির মধ্যে সবচেয়ে বড় ১৯ হাজার বস্তু, যেগুলির ওজন কয়েক কিলোগ্রামের বেশী, সেই গুলিকে লক্ষ্য রাখছেন. কিন্তু এমনকি খুব ছোট টুকরোও মহাকাশচারীর স্কাফান্দার ভেদ করতে পারে. প্রতি বছরেই এই জঞ্জালের সমস্যা বেড়েই চলেছে, তাই ভিক্তর সিনিয়াভস্কি বলেছেন:

    "যতদিন যাচ্ছে, ততই এই জঞ্জালের পরিমান বেড়ে যাচ্ছে, তার ওপরে এই জঞ্জালের আবার সংখ্যা বৃদ্ধিও ঘটছে – একে অপরের সাথে ধাক্কা খেয়ে সেই গুলি দুটি নয় একেবারে পাঁচ দশটি করে হয়ে যাচ্ছে. ফলে ধাক্কা খাওয়ার সম্ভাবনা খালি বাড়ছেই. আন্তর্জাতিক মহাকাশ কেন্দ্র থেকে ক্রমাগত লক্ষ্য রাখার কাজ হচ্ছে. আর তা প্রতি সপ্তাহে গড়ে একবার করে সঙ্কট সময় ঘোষণা করাতে বাধ্য করছে. মহাকাশ স্টেশন কে উপরে তুলে নিয়ে যেতে হচ্ছে".

    আগামীর মহাকাশ যান কিছু বড় টুকরোকেও নিয়ে আসতে পারে, যে গুলি এই আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে. এই জমাদার যান একসাথে কতগুলি টুকরো নিয়ে আসতে পারে, তা বলা কঠিন, কারণ এই টুকরো গুলি বিভিন্ন উচ্চতায় পাক খাচ্ছে, আর পাঠানো যানের জ্বালানী নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতাও সীমিত. "রেডিও রাশিয়ার" সঙ্গে কথা বলতে থাকা বক্তার কথামতো, এই ধরনের মহাকাশ যান দিয়ে বিশ্বের নিকট কক্ষপথ জঞ্জাল মুক্ত করা সম্ভব. আজ সেখানে কার্যকরী ও বিকল যন্ত্রে অতিরিক্ত রকম পরিপূর্ণ. যদি এই সমস্ত আটকে রাখা জায়গা থেকে বিকল উপগ্রহ গুলিকে সরিয়ে ফেলা যায়, তবে ফাঁকা জায়গা গুলি, যেগুলির দাম ২০ থেকে ৫০ মিলিয়ন ডলার, খুবই আগ্রহের সঙ্গে টেলি যোগাযোগ কোম্পানী গুলি নিতে পারে.

    পশ্চিমেও মহাকাশ জঞ্জাল মুক্ত করার প্রকল্প রয়েছে. সেখানে প্রস্তাব করা হয়েছে এই উপগ্রহ গুলিকে ভৌগলিক ভাবে স্থাণু কক্ষপথ থেকে আরও উঁচু কক্ষ পথে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে. এই ধরনের টুকরো ধরা হবে খুবই হাল্কা জাল ব্যবহার করে, যা উপগ্রহ থেকেই ছাড়া হবে. অথবা লেসার রশ্মি দিয়ে বাষ্প হওয়া স্রোত তৈরী করে সেই গুলিকে আরও নীচের কক্ষ পথে পাঠানো হবে, যাতে সেগুলি নিজে থেকেই পৃথিবীতে ফিরে আসে. আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের মহাকাশচারীরা যখন তাদের কাজের যন্ত্র উন্মুক্ত কক্ষপথে হারিয়ে ছিলেন, তখন যেমন, সেই গুলি মাটিতে এসে পুড়ে গিয়ে পড়েছিল কয়েক মাস বাদে.

প্রথম বিকল উপগ্রহ, যা নিকট মহাকাশেই রয়ে গিয়েছে, তা হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাঠানো প্রথম উপগ্রহ ভ্যান গার্ড – ১, যা ১৯৫৮ সালেই ছোঁড়া হয়েছিল. আরও ২০০ বছর এটি মহাকাশে বিপদের কারণ হয়ে থাকবে. ১৯৯৬ সালে প্রথম মহাকাশে জঞ্জাল ও মহাকাশ যানের ধাক্কা লাগার ঘটনা ঘটেছিল একটি ফরাসী উপগ্রহ থেকে একটি বড় টুকরো খসে গিয়েছিল, আর সেটিই আরও একটি ফরাসী কৃত্রিম উপগ্রহের সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছিল. আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন এখন অবধি নানা রকম ভাবে এড়িয়ে চলছে, যাতে ২০০৭ সালে চিনের নিজেদের রকেট বিরোধী ব্যবস্থার কারণে ছোঁড়া কৃত্রিম উপগ্রহ, যা বিকল হয়ে টুকরো হয়ে রয়েছে, তার সঙ্গে ধাক্কা খেতে না হয়. আর ২০০৯ সালে মহাকাশে আমেরিকার যোগাযোগের যন্ত্র ও রাশিয়ার বিকল উপগ্রহ কোন ক্রমেই ধাক্কা লাগা থেকে রক্ষা পেতে পারে নি. যাতে এই রকমের ঘটনা আর না হয়, তার জন্য, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নিকটবর্তী মহাকাশের কক্ষ পথকে জঞ্জাল মুক্ত করতে হবে.