সোয়াত উপত্যকা অঞ্চলে সমাজের চরমপন্থী মনোভাব সংক্রান্ত সমস্যা গুলি নিয়ে এক আলোচনা সভার চলাকালীণ অবস্থায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রেজা গিলানি হঠাত্ করেই ভারতের সম্বন্ধে মৈত্রী সুলভ ঘোষণা তাঁর বক্তৃতায় করেছেন, যা সঙ্গে সঙ্গেই ভারতের সংবাদ মাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে.

    গিলানি বলেছেন – "ভারত – আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী, আমরা খুবই বেশী করে চাই যে ভারতের সঙ্গে বর্তমানে প্রসারিত সংযোগ ফলপ্রসূ হবে. পাকিস্তান ভারতের সঙ্গে সমস্ত বিশিষ্ট বিষয় গুলি নিয়ে শান্তিপূর্ণ ভাবে সমাধান করতে চায়". এর পরে নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রসঙ্গে পারস্পরিক প্রশ্ন সম্বন্ধে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন যে, "ভারত পাকিস্তানকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের একটি নতুন অধ্যায় লেখার বিষয়ে ইচ্ছার বিষয়ে কোন ভাবেই পেছিয়ে থাকা অবস্থায় দেখবে না".

    পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য ভারত পাকিস্থানের সীমান্তের দুই দিক থেকেই ওঠা যুযুধান সমস্ত ঘোষণার পটে খুবই মনোগ্রাহী হয়েছে. আসলে, এক সারি সমস্যা রয়েছে, তার মধ্যে প্রাথমিক পর্বে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের সমস্যা, যা দুই দেশের জন্যই এক. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো জোটের সেনাবাহিনী অপসরণের পরে পাকিস্তানের কাছে ভারত ও তাদের অন্যান্য আঞ্চলিক ভাবে সহযোগী দেশ (প্রাথমিক ভাবে রাশিয়া, চিন ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলি) সহযোগিতা করাটা অত্যন্ত আবশ্যিক হয়ে দাঁড়াবে আফগানিস্তানের পুনর্জন্মের বিষয়ে. কেউই এই এলাকায় আর ১৯৯০ দশকের শুরুতে সোভিয়েত বাহিনী প্রত্যাবর্তনের পরে তৈরী হওয়া মাত্সান্যায় দেখতে চায় না. অথবা তালিবদের প্রশাসনের মতো কঠোর ঐস্লামিক স্বৈরতন্ত্রও কারও স্বার্থের অনুকূল নয়. দুই দেশের মধ্যেই রয়েছে এক সারি বেদনা দায়ক সমস্যা, কিন্তু সেগুলি সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়ে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না. এখানে সবটাই নির্ভর করছে রাজনৈতিক ইচ্ছার উপরে, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা কেন্দ্রের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

    "হ্যাঁ, দুই দেশের মধ্যে কাশ্মীর নিয়ে সমস্যা রয়েছে. ভারত ও পাকিস্তানের স্বাধীনতার পর থেকে ষাট বছরেরও বেশী সময় ধরে এই সমস্যার কোনও কূটনৈতিক সমাধান সম্ভব হচ্ছে না. আর এই দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ কারও প্রয়োজন নেই – বিশেষত এখন, যখন দুই দেশের কাছেই এত পরিমানে পারমানবিক অস্ত্র রয়েছে, যে তা দিয়ে একে অপরের অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করা সম্ভব.

    হ্যাঁ, ভারতে প্রায়শঃই মত প্রকাশ করা হয়ে থাকে যে, পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা ও সেনা বাহিনীর নির্দিষ্ট কিছু বৃত্তে সন্ত্রাসবাদী ও চরমপন্থী দলের লোকেদের সঙ্গে যোগ সাজস রয়েছে, আর তার মধ্যে সেই সমস্ত লোকেদের সঙ্গে, যারা ২০০৮ সালে মুম্বাই হামলায় অংশ নিয়েছিল. কিন্তু এটা যদি সেই রকমও হয়ে থাকে, আর পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠান গুলির একাংশ সন্ত্রাসবাদীদের সঙ্গে যুক্তও থাকে, তবুও সরকার সব মিলিয়ে চাইছে এই কুষ্ঠ সমূলে উত্খাত করতে.

    বিতর্কিত অঞ্চল সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে দেখা গিয়েছে যে, এমনকি দুই দেশ একে অপরের প্রতি কোন ধরনের অভিযোগ থাকলেও সহযোগিতা স্বাভাবিক ভাবেই বাড়াতে পারে. যেমন রাশিয়া ও জাপানের মধ্যে দক্ষিণ কুরিল দ্বীপপূঞ্জ সংক্রান্ত সমস্যারও এখনও কোনও সুরাহা হয় নি. চিন ও ভারতের মধ্যেও পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে. কিন্তু সহযোগিতা পূর্ণ মাত্রায় চলছে, যদিও দুই দেশের কিছু রাজনৈতিক নেতা একে অপরের উদ্দেশ্যে নানা ধরনের যুযুধান বিবৃতি দিয়ে থাকেন প্রায়ই".

    সুতরাং এখন কি আশা করা যেতে পারে যে, আসন্ন ভবিষ্যতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা নিয়ে এই ঘোষণা বাস্তবে কার্যকরী হবে? এটা খুবই চাওয়া হয়েছে, যদিও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে একে অপরের প্রতি ক্ষোভ আরও বহুকাল এই প্রক্রিয়াকে জটিল করবে. এর জন্য বাস্তবিক রাস্তাও রয়েছে – এটা ভারত ও পাকিস্তানের আরও বড় বহুপাক্ষিক কাঠামোতে সমাকলন, এই কথা মনে করে বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

    "এই রকমের একটি কাঠামো বর্তমানে রয়েছে ও সেই সমস্ত সমস্যারই সমাধান করছে, যা এই অঞ্চলে সবচেয়ে তীক্ষ্ণ সমস্যা গুলির সমাধানে নিরত – প্রথমতঃ নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রশ্নে, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলা ও মাদক পাচার নিরোধ করার কাজে. এটা – সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা, যার মধ্যে এই দুই দেশই বর্তমানে পর্যবেক্ষক দেশের পর্যায়ে রয়েছে. রাশিয়া সবসময়েই ভারতের সাংহাই সহযোগিতা সংস্থায় যোগদানের বিষয়ে পক্ষ নিয়েছে, আর এই বছরের মে মাসে রাষ্ট্রপতি দিমিত্রি মেদভেদেভ ঘোষণা করেছেন যে, রাশিয়া পাকিস্তানেরও সাংহাই সহযোগিতা সংস্থায় যোগদানের স্বপক্ষে. কিন্তু এই প্রশ্নের এখনও সমাধান হয় নি. কেন তা বলা কঠিন, কিন্তু সবচেয়ে সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হল চিনের এই প্রশ্নে অবস্থান, যারা এই অঞ্চলে তাদের প্রধান প্রতিযোগী দেশ ভারতের অবস্থানকে শক্ত হতে দিতে চায় না.

    আর তারই মধ্যে, সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সদস্য পদ পাওয়া এশিয়াতে প্রধান কুশীলবদের কাজকর্ম নিয়ন্ত্রিত ভাবে করতে সাহায্য করতে পারতো. বর্তমানের প্রধান বিপদ গুলির থেকে তাদের রক্ষা ও মোকাবিলা করাতে সাহায্য করতে পারতো. আর তার থেকেও বেশী করে – কে বলতে পারে – হয়তো, শেষ অবধি এটাই সেই প্রথম দেখাতে সমাধানের অযোগ্য সমস্যা গুলি, যেমন কাশ্মীর নিয়ে, সেগুলির সমাধানে সহযোগিতা করতে পারতো".

    শেষমেষ দেখা গিয়েছে যে, ইউরোপে এক সময়ে জার্মানী ও ফ্রান্স নিয়মিত ভাবে এলজাস ও লটারিঙ্গির দখল নিয়ে লড়াই করেছিল. আর আজ এই সমস্যা নিয়ে কেউ মনেও করে না, সেই এলজাস অঞ্চলের রাজধানী স্ট্রাসবর্গ বর্তমানে হয়েছে ঐক্যবদ্ধ ইউরোপের রাজধানী. এটা ভারত ও পাকিস্তানের জন্য ও এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশের জন্যও ভাল উদাহরণ হতে পারতো বলে মনে করেন রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ.