ভারতের সামনে আজ সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে দুর্নীতির প্রশ্ন. বিভিন্ন ধরনের ফৌজদারী মামলার অভিযোগে দেশের ৫৪৩ সদস্য বিশিষ্ট লোকসভার ১৫৮ জন সদস্য অভিযুক্ত. মনমোহন সিংহের নেতৃত্বে থাকা প্রশাসনের বেশ কিছু মন্ত্রীর বিরুদ্ধে রয়েছে দুর্নীতির অভিযোগ. আর ভোটের সময়ে দুর্নীতির খবর এখন তো আকছার শোনা যায়.

    প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহের নামে অভিযোগ এসেছে যে ভারতের ইতিহাসে তিনি সবচেয়ে দুর্নীতিপূর্ণ প্রশাসনের নেতৃত্বে রয়েছেন, আর প্রশাসনের সঙ্গে দেশের নাগরিক সমাজের সঙ্গে আলোচনা আরও একবার পৌঁছেছে কানা গলিতে.

    প্রধানমন্ত্রী নিজে এই ধরনের অভিযোগ মানতে রাজী হন নি, তিনি মনে করেন যে, একমাত্র ইতিহাসই তাঁর মূল্যায়ণ করবে ও রাজনৈতিক ভাবে বিরোধীপক্ষের তাঁর বা প্রশাসনের উপরে করা অভিযোগের উপর ভিত্তি করে নয়. বরং তাঁদের করা নির্দিষ্ট কাজের মূল্যায়ণ করেই. পরিস্থিতি সত্যি কানা গলিতে পৌঁছেছে, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন

    মনমোহন সিংহের অবদান হিসাবে অনেক কিছুই বলা যায় – আর তাঁর বিতর্কের উর্দ্ধে থাকা অর্থনৈতিক সাফল্য, ভারতের আন্তর্জাতিক সমাজে মর্যাদা পাওয়া ও বিশ্বের সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে ওজন বৃদ্ধি সব কিছুই. কিন্তু প্রায়ই যা হয়ে থাকে, প্রধানমন্ত্রীর সমস্ত সাফল্যকেই এক মূহুর্তে হারিয়ে ফেলা যেতে পারে.

    "এখন ভারতের নাগরিকদের সামনে রয়েছে এক প্রশ্ন: এর পর কি হবে? কিছু পর্যবেক্ষক বলছেন দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব পাল্টালে অর্থাত্ ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ৭৮ বছর বয়সী বর্ষীয়ান নেতা ও প্রধানমন্ত্রীর জায়গায় আরও অল্প বয়সী নেতাকে আনলে. কিন্তু তাতে আবার কি সমস্যা এই পদের প্রধান প্রার্থী রয়েছেন ৪১ বছর বয়সী রাহুল গান্ধী. বহু বিশ্লেষকের মতে বর্তমানের পরিস্থিতি, যখন দুর্নীতি দেশের প্রশাসনের সমস্ত স্তরে ছড়িয়ে পড়েছে, তা শুধু বর্তমানের প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিত্বের সঙ্গেই যতটা না জড়িত, তার থেকেও বেশী যে এই ক্ষমতাসীন দলের নেতৃত্বে রয়েছেন নেহরু পরিবারের আরও এক প্রতিনিধি প্রয়াত রাজীব গান্ধীর স্ত্রী ও সম্ভাব্য পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী রাহুলের মা সোনিয়া গান্ধী.

তার উপরে যদি সমস্ত অল্প বয়সী রাজনৈতিক নেতাদের তালিকা দেখা হয়, তবে দেখা যাবে যে, তারা সকলেই উচ্চপদস্থ লোকেদের ছেলেমেয়েরা. যে সব লোকেরা হয় কেন্দ্রীয় স্তরে অথবা আঞ্চলিক স্তরে ক্ষমতায় ছিলেন বা আছেন. যেমন আরও একজন সম্ভাব্য নেতা প্রধান বিরোধী দল ভারতীয় জনতা পার্টির ৩১ বছর বয়সী নেতা বরুণ গান্ধী, তিনিও সেই নেহরু পরিবারেই লোক ও রাহুলের খুড়তুতো ভাই.

এর মানেটা তাহলে কি? শুধু দাঁড়ায় যে, দেশের প্রশাসনে শুধু সাধারন ভাবে মুখ পাল্টে দিলেই চলবে না, ভারতের দরকার সমগ্র রাজনৈতিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন, যাতে নাগরিক সমাজের স্বর শুধু জোরেই যেন আওয়াজ না করে, বরং সামাজিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া গুলিতেও সত্যিকারের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে".

বহু পর্যবেক্ষকের মতে, পরিস্থিতি বদল হতে পারে লোক পাল বিল গ্রহণ হলে, অথবা দুর্নীতি সংক্রান্ত বিশেষ পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা হলে. এই আইনের প্রকল্পে রয়েছে এক বিশেষ সংস্থা তৈরী করা, যারা সমস্ত দুর্নীতির অভিযোগ খুঁটিয়ে দেখবেন, যা যে কোন ধরনের উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে করা হবে, যাদের মধ্যে দেশের সর্ব্বোচ্চ স্থানে থাকা নেতারাও থাকবেন. যদিও ১৯৬৯ সালে এই বিল লোকসভাতে আনা হয়েছিল ও একবার পাশও হয়েছে, তাও আজ অবধি কোন সরকারই তা আইনে পরিবর্তিত হতে দেয় নি.

আর সেই সময়ের মধ্যেই সমস্ত আওয়াজ, আজ যা ব্যুরোক্র্যাসীর দুর্নীতি নিয়ে সমাজের সর্বত্র শুনতে পাওয়া যাচ্ছে, তা কেবলই আরও জোরে হচ্ছে. বিখ্যাত সামাজিক সেবক আন্না হাজারে এই বছরের বসন্তে এই বিলের আইনে পরিবর্তন হওয়ার দাবীতে অনশন শুরু করেছিলেন. পরে সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে কাজ হবে এই আশ্বাসে তিনি অনশন ভঙ্গ করেছেন. যদিও আন্না হাজারে এখনও সরকারের কাজের গতিতে সন্তুষ্ট না হতে পেরে আগামী আগষ্ট মাসে আবার অনশনের হুমকি দিয়ে রেখেছেন. একই রকমের পথে চলেছিলেন ধর্ম গুরু বলে পরিচিত যোগ গুরু বাবা রাম দেব, তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গ দের দিল্লী শহরের পুলিশ পিটিয়ে তাড়িয়েছে ও তাঁর ব্যক্তিগত নানা ধরনের অন্যায় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে.

ভারতের প্রধানমন্ত্রী অবশেষে মুখ খুলেছেন, তিনি বলেছেন যে, তিনি সমস্ত দলের পক্ষ থেকে অনাস্থা প্রস্তাব থাকলে পদত্যাগ করতেও রাজী আর এই বিলের আওতায় প্রধানমন্ত্রীর থাকা নিয়েও কোন রকমের সমস্যা দেখতে পাচ্ছেন না. তবে কোন একদল লোককে তাদের কথাই যে শেষ কথা তা বলতে দেওয়া যেতে পারে না ও সমস্ত কিছুই হওয়া উচিত সামাজিক সমঝোতা ও রাজনৈতিক সর্বসম্মতিতে. আগামী কাল আন্না হাজারে চলেছেন সোনিয়া গান্ধীর কাছে দরবার করতে.