ইউরোপীয় সংঘের তরফ থেকে সিরিয়ার প্রশাসনের নেতৃত্বের বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা জারী করাকে এই দেশে যুদ্ধ ঘোষণার মত করে দেখা হয়েছে. এই সম্বন্ধে দামাস্কাস শহরে ঘোষণা করেছেন সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রী ওয়ালিদ মুয়াল্লেম. সিরিয়ার প্রশাসন দেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোন রকমের হস্তক্ষেপ সহ্য করবে না, তার মধ্যে সামরিক হস্তক্ষেপও পড়ে, এই কথা বলেছেন দেশের কূটনৈতিক বিভাগের প্রধান.

    সিরিয়াতে গত কয়েক মাস ধরে গণ অভ্যুত্থান চলছে. মিছিলের সঙ্গে চলছে সরকার ও বিরোধী পক্ষের কঠোর লড়াই. রাষ্ট্রপতি বাশার আসাদ বিরোধী দমনে সামরিক বাহিনী নিয়োগ করছেন সক্রিয় ভাবেই. একই সঙ্গে দেশের প্রধান সংশোধনের প্রয়াসও শুরু করেছেন. কিন্তু তিনি এই ধারণায় অনেকটাই দেরীতে পৌঁছেছেন. আর যত বেশী করে দেশে প্রতিবাদ চলছে, ততই দেশের নাগরিকদের রাষ্ট্রপতির প্রতি আস্থা কমছে.

    একই সঙ্গে আসাদ অনতিপূর্ব আন্তর্জাতিক চাপ অনুভব করছেন. ফরাসীরা মনে করেন যে, তিনি আইন সঙ্গত আর নন ও তাঁরও পদত্যাগ করা দরকার. এ বিষয়ে আমেরিকাও বলছে, তাদের অবশ্য নিজস্ব কারণ রয়েছে. তারা ইরাক থেকে শীঘ্রই চলে যাবে, আর বেইরুটের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর আরিফ ওসমান যেমন মনে করেন যে, তাদের স্বার্থকে নিরাপদ করা সম্ভব শুধু সিরিয়ার প্রশাসন পাল্টাতে পারলে. লেবাননের রাজনীতিবিদ বিশ্বাস করেন যে, দামাস্কাসের উপরে চাপের একটি কারণ হল – ইরাকের প্রশ্নই. কারণ ইরাকের অন্য দিকে ইরান, আর এটা আবার ইজরায়েলের নিরাপত্তার প্রশ্ন, যারা মনে করে যে সিরিয়া হল তেহরানের জোটে. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই বিষয় খুবই বড় ভূমিকা নিয়েছে. তার উপরে ইরানে বর্তমানে দেখা যাচ্ছে রাষ্ট্রপতি আহমাদিনিজাদের সঙ্গে দেশের ধর্মীয় নেতৃত্বের মতবিরোধ, যা আবারও ওয়াশিংটনের পক্ষেই লাভজনক. সুতরাং সিরিয়ার ঘটনা, যেখানে মিছিল সক্রিয় ভাবে রাজনৈতিক পরিবর্তন চাইছে, তা পশ্চিমের নেতাদের শান্তিতে থাকতে দিচ্ছে না. প্রসঙ্গতঃ কিছু বিশেষজ্ঞ আবার পশ্চিমের সিরিয়ার প্রতি পদক্ষেপ আরও সাবধান হয়ে পর্যালোচনা করতে চেয়েছেন. রাশিয়ার রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক প্রযুক্তি কেন্দ্রের সহ সভাপতি আলেক্সেই মাকারকিন মনে করেন যে, আসাদের উপরে চাপ এই জন্যই করা হয়েছে, যাতে বড় ধরনের গণ্ডগোল এড়ানো যায়, তিনি এই কথা মনে করেছেন ও বলেছেন:

    "সমস্ত রকমের ব্যাখ্যা, যা আজ সিরিয়ার সম্বন্ধে করা হচ্ছে যে আসাদ বোধহয় পদত্যাগ করবেন ও যদি সংশোধন না করেন, তবে পদত্যাগ করতে বাধ্য, একটা আপেক্ষিক চরিত্র রাখে. সমস্যা হল যে, যদি এই দেশে স্বাধীন নির্বাচন ও রাজনৈতিক দলগুলিকে স্বীকৃতী দিতে হয়, তবে দেশের বর্তমানে ক্ষমতায় আসীন আলাউই মুসলমান গোষ্ঠীর লোকেদের ক্ষমতা হ্রাস হতে পারে. সিরিয়াতে একেবারে বিশেষ পরিস্থিতি, যেখানে দেশের সমস্ত ক্ষমতার পদে ও বিশেষত নিরাপত্তা রক্ষা বাহিনীর নেতৃত্বে রয়েছে আলাউই সম্প্রদায়ের লোক. এমনিতেই মুসলিম সমাজে আলাউই সম্প্রদায়ের লোকের সংখ্যা কম, আর সিরিয়াতেও তাদের সংখ্যা কম. তাই এখানে আমি মনে করি যে, আলাউই সম্প্রদায়ের লোকেরা, যাদের মধ্যে আসাদের পরিবারও পড়ে, তারা দেশের পরিবর্তনকে খুবই কম করতে চাইবে ও নিজেদের জন্য এক ধরনের গ্যারান্টির ব্যবস্থা পেতে চাইবে, যাতে ক্ষমতায় থাকা সম্ভব হয়. আর এটাই দেশের বিরোধী পক্ষ ও পশ্চিমের জন্য অসন্তুষ্টির কারণ হয়েছে".

    তা স্বত্ত্বেও, রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে খুবই সক্রিয় ভাবে সিরিয়ার প্রতি নিষেধাজ্ঞা নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে, যা লিবিয়ার মতই, যাতে হস্তক্ষেপ করা যেতে পারে সামরিক ভাবে. তার প্রকল্প এর মধ্যেই ফ্রান্স, গ্রেট ব্রিটেন, জার্মানী ও পর্তুগালের পক্ষ থেকে পেশ করা হয়েছে ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পেয়েছে. এখন একটা অজুহাত দরকার শুধু, সিরিয়ার আভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের জন্য. রাষ্ট্রপতি আসাদকে নিজের দেশের মানুষের প্রতি শক্তি প্রয়োগের অপরাধে অভিযুক্ত করা হয়েছে. এটা পশ্চিমের প্রচার মাধ্যমে খুবই সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করা হয়েছে. আর যখন দেশের ঘটনা রক্ত পাতের কারণ হয়েছে ও প্রতিবেশী তুরস্কে সিরিয়া থেকে উদ্বাস্তু পৌঁছেছে, তখন সংবাদ মাধ্যম গুলিতে দেখানো শুরু হয়েছে, কোন রকমের প্রমাণ ছাড়াই সিরিয়ার আসাদের সামরিক বাহিনীর নৃশংসতার চিত্র.

    মস্কো সিরিয়া বিরোধী কোন রকমের সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিরোধী. এর মানে অবশ্যই নয় যে, আসাদের দমন কারী প্রশাসনের সমর্থন করা. কিন্তু রাশিয়া মনে করে যে, রাষ্ট্রপতির উপরে চাপ সৃষ্টি করতে হবে, যিনি এমনিতেই সংশোধন করার জন্য তৈরী ও এগুলি নিয়ে বড্ড দেরী করে ফেলেছেন. কারণ আভ্যন্তরীণ আলোচনাকে সক্রিয় করা যেতে পারে, সামরিক অনুপ্রবেশ ছাড়াই. মস্কোতে কয়েক দিনের মধ্যে সিরিয়ার বিরোধী পক্ষের প্রতিনিধি দলের আসার কথা রয়েছে. তাদের এক নেতা ও সিরিয়ার "মুসলমান ভাইদের" দলের নেতা মুলহম আল-দ্রুবী, সফরের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে এই ভাবে বলেছেন:

    "রাশিয়া – এক বড় দেশ, যারা সিরিয়ার লোকেদের সমর্থন করতে সক্ষম, তাদের মধ্যে বাশার আসাদের উপরে চাপ সৃষ্টি করে তাকে পদত্যাগ করতে রাজী করানো ও অস্থায়ী ভাবে প্রশাসনিক ক্ষমতা নিদের সহকারীর হাতে তুলে দিতে বলাও রয়েছে. তাছাড়া সিরিয়ার বিরোধী পক্ষ বর্তমানে অস্থায়ী সভা তৈরী করছে, যারা এই দেশকে এক বছরের জন্য শাসন করতে পারে. এই সময়ের মধ্যে দেশের সংবিধান পাল্টানো হবে ও তাতে পরিবর্তন আনা হবে. রাজনৈতিক কাঠামোর সংশোধন করতে হবে ও দেশের লোকসভা এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে. এই সভাতে বর্তমানের সরকারের প্রতিনিধিরাও থাকতে পারেন, যেমন দেশের লোকসভার স্পীকার, প্রধানমন্ত্রী, সম্মিলিত সামরিক বাহিনীর নেতা, প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ও অন্যান্য নিরাপত্তা রক্ষী বাহিনীর নেতৃত্ব. এই সভা দেশকে নিয়ন্ত্রণ করবে শুধু এক বছরের জন্যই, অর্থাত্ সেই টুকু সময়ই, যতটা সময়ের মধ্যে দেশ গণতন্ত্রের পথে নিজের পায়ে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে চলতে পারবে".

    বিরোধী পক্ষ আলোচনা করতে তৈরী. আর এটা মস্কোর পছন্দ. এখানে কেউই চায়না লিবিয়ার পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হোক, যখন বাইরের থেকে হস্তক্ষেপের ফলে সিরিয়ার পরিস্থিতি ভারসাম্য হারাতে পারে.