রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা বৃহস্পতিবারে জাতির প্রতি ভাষণে ঘোষণা করেছেন আফগানিস্তান থেকে সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার করার. এই বছরের শেষের মধ্যেই দেশ ছেড়ে চলে যাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দশ হাজার সৈন্য. আর আগামী বছরের হেমন্তের মধ্যে ফিরে আসতে চলেছে আমেরিকার সেনা বাহিনীর প্রায় একের তৃতীয়াংশ – ৩৩ হাজার সেনা.

    আপাততঃ কথা হচ্ছে শুধু সেই বাড়তি বাহিনীর, যাদের বারাক ওবামা আফগানিস্তানে পাঠিয়েছিলেন গত ২০০৯ সালের ডিসেম্বর মাসে. জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে রাষ্ট্রপতি বলেছেন যে, আমেরিকার সেনাবাহিনীর পক্ষে সম্ভব হয়েছে তাদের মিশন সাফল্য মণ্ডিত করা. ন্যাটো জোটের সাধারন সম্পাদক আন্দ্রেস ফগ রাসমুসেন এই মূল্যায়ণ সমর্থন করে সেনা বাহিনী প্রত্যাহারকে স্বাগত জানিয়েছেন. এর পরেই ফরাসী দেশ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে যে, তারাও আফগানিস্থান থেকে ধীরে সৈন্য প্রত্যাহার করবে. তারা মার্কিন বাহিনীর পরে চতুর্থ বিশাল দল এই দেশে পাঠিয়েছিল, তাদের চেয়ে বেশী ছিল শুধু ব্রিটেনের ও জার্মানীর. সমস্ত প্রক্রিয়া শেষ হতে বেশ কয়েক বছর লেগে যাবে. অংশতঃ অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ঘোষণা করেছেন যে, তাদের দেশের সেনা বাহিনী প্রত্যাহার করতে কম করে হলেও তিন বছর সময় লাগবে.

বর্তমানে আফগানিস্তানে জোটের সেনাবাহিনীর তরফ থেকে ৪৮টি দেশের ১৩৫ হাজার সেনা রয়েছে. এর বেশীর ভাগ দেশেই নাগরিকেরা বর্তমানে আফগানিস্তানের এই মিশন শেষ করতে দাবী করেছেন. তাই আফগানিস্তানে বিভিন্ন দেশের সেনা বাহিনীর উপস্থিতির মেয়াদ নিয়ে ও তাদের সংখ্যা কম করা নিয়ে শীঘ্রই তর্ক বিতর্ক তীক্ষ্ণতর হতে পারে. তার উপরে যখন আমেরিকাই উদাহরণ উপস্থিত করেছে. তবে এই কথা সত্য যে, "স্ট্র্যাটেজি – ২০২০" নামের নাগরিক উদ্যোগ তহবিলের ডিরেক্টর বরিস মেঝুয়েভ মনে করেন যে, বারাক ওবামার এই পদক্ষেপ নেওয়া বাধ্য হয়ে, তাই তিনি বলেছেন:

"এটা একটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, কারণ সেখানে থেকে যাবে প্রায় ৭০ হাজার মার্কিন সেনা. খুব সম্ভবতঃ এই সিদ্ধান্ত ২০১২ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাথে জড়িত. যতই অবাক লাগুক না কেন, তা যতটা না জড়িত মার্কিন নাগরিকদের যুযুধান দেশ প্রেমিক মানসিকতার সঙ্গে, তার চেয়েও বেশী জড়িত আপামর মানুষের সমস্ত রকমের সামরিক অপারেশন ও অনর্থক আকাঙ্খার প্রতি বিরক্তি ও ক্লান্তির সঙ্গেই, তা সে যেখানেই এখন চলুক না কেন – আফগানিস্তান, ইরাক, এবারে আবার লিবিয়া. রিপাব্লিকান দলের নেতারা  ও ডেমোক্র্যাটিক ওবামা বুঝেছেন যে, আমেরিকার নাগরিকদের সাধারন ভাবে মানসিকতা আজ এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, তাঁরা মনে করছেন আমেরিকা খুব বেশী রকমের অর্থ ও শক্তি ব্যয় করছে সেই সমস্ত যুদ্ধের জন্য যার বেশীর ভাগেরই কোন অর্থ হয় না ও কোন রকমের পরিস্কার পরিণতির দিকে যাচ্ছে না".

প্রায় ১০ বছর যুদ্ধের পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে দেড় হাজারেরও বেশী সেনার ক্ষতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে. যুদ্ধ এর পেছনে যত খরচ হয়েছে তার কোনও মানে দেখাতে সক্ষম হয় নি. আর এগারো হাজার কোটি ডলারেরও বেশী খরচ হয়েছে প্রতি বছরে – যা দিতে হয়েছে আমেরিকার করতাদাদের. আফগানিস্তানে সামরিক উপস্থিতির বিরুদ্ধে বর্তমানে আমেরিকার দুই তৃতীয়াংশ লোক মত দিয়েছেন. এমনি তো আর বারাক ওবামা নিজের ঘোষণা মার্কিন কংগ্রেসে আগামী আর্থিক বছরের পেন্টাগনের বাজেট ঘোষণা নিয়ে আলোচনার আগে করেন নি. তা শুরু হতে চলেছে ১লা অক্টোবর. এখানে সম্ভাবনা রয়েছে ভোটের বদলে সেই সময়ে চড় খাওয়ার. শুধু রিপাব্লিকান দলের লোকেরাই নয়, এমনকি ডেমোক্র্যাট দলের একাংশও আফগানিস্তান ও লিবিয়াতে যুদ্ধের বিরুদ্ধে.

আফগানিস্তানের রাষ্ট্রপতি হামিদ কারজাই বারাক ওবামার ঘোষণাকে সমর্থন করেছেন. তারই মধ্যে আফগানিস্তানের তালিবেরা আমেরিকার রাষ্ট্রপতির ঘোষণাকে বলেছে "লোক দেখানো ও যথেষ্ট নয়". "তালিবান" আন্দোলনের পক্ষ থেকে তাদের পুরনো দাবীই আবার বলা হয়েছে যে – অবিলম্বে দেশ থেকে সমস্ত বিদেশী সৈন্য প্রত্যাহার করতে হবে. এই আন্দোলন আবার ভয় দেখিয়েছে যে, তা না হলে তাদের পক্ষ থেকে সশস্ত্র প্রতিরোধ শুধু বাড়তেই থাকবে.

এখানে যোগ করবো যে, আফগানিস্তানের ভবিষ্যত নিয়ে আমেরিকার কূটনীতিবিদেরা গত কয়েক সপ্তাহ ধরে তালিবানের নেতাদের সঙ্গে গোপন আলোচনা করছে. এর আগে তারা সব রকম ভাবে উল্লেখ করেছিল যে, এখনই কোন রকমের সাফল্যের কথা বলা তাড়াহুড়ো হয়ে যাবে. তালিবদের পক্ষ থেকে ওবামার ঘোষণার তীক্ষ্ণ ও খুবই অনুমেয় প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হচ্ছে, এই সব আলোচনা বিনা ফলেই শেষ হয়ে যাবে, এই কথা মনে করে সামরিক রাজনীতিবিদদের সংগঠনের সহ সভাপতি ও রাজনৈতিক বিজ্ঞানে ডক্টরেট সের্গেই মেলকভ বলেছেন:

"যদি আমেরিকার লোকেরা তালিবদের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে কোন একটা গঠন মূলক চুক্তিতে পৌঁছতে পারে, তবেই এই অঞ্চলে নিরাপত্তার বিষয়ে কোন পরিবর্তন আসতে পারে. যদি তা না হয়, তবে আমেরিকার সেনা বাহিনীর অংশ প্রত্যাহার করলেও, আমার মতে, বাস্তবে এই এলাকার পরিস্থিতিতে তার কোনও প্রভাব পড়বে না".

আমেরিকার লোকেরা হামিদ কারজাইয়ের পিছনে তালিবদের সঙ্গে  আলোচনা করছে. এটা ওয়াশিংটন ও কাবুলের সম্পর্ককে খুবই ঠাণ্ডা করেছে, যারা আমেরিকাকে বর্তমানে দুই মুখো খেলায় সন্দেহ করেছে. তাই ওবামার ঘোষণা যে, আফগানিস্তানের প্রশাসনের উদ্যোগে তালিবদের সঙ্গে আলোচনাকে আমেরিকা সমর্থন করে, তা বেশীর ভাগই করা হয়েছে কাবুলকে ঠাণ্ডা করতে, তাদের আফগানিস্তানের সমস্যা সমাধানে নেতৃত্বকে বিশেষ করে উল্লেখ করতে নয়.