আজ রাশিয়াতে শোক ও স্মৃতি দিবস পালিত হচ্ছে. সত্তর বছর আগে ২২ শে জুন ফ্যাসিস্ট জার্মানী বিশ্বাস ঘাতকের মতো সোভিয়েত দেশের উপরে আক্রমণ করেছিল. গভীর রাত্রে সোভিয়েত দেশের সীমান্ত লঙ্ঘণ করে পার হয়ে এসেছিল বাছাই করা সামরিক বাহিনী.

    হিটলারের পরিকল্পনা ছিল এক বিদ্যুত গতিতে যুদ্ধ জয়ের, একেবারে তড়িত্গতিতে মস্কোর উপকণ্ঠে পৌঁছনোর কয়েক মাসের মধ্যে শেষ হয়ে যাওয়া এক জয় লাভের যুদ্ধের পর. কিন্তু ফ্যাসিস্ট লোকেরা খুবই হিসাব ভুল করেছিল. তারা এক কঠোর বাধার মুখোমুখি হয়েছিল. দেশের পশ্চিমের সীমান্ত এলাকাতে সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর লোকেরা নিজেদের উপরে নিয়েছিল প্রথম আঘাত – বেলোরাশিয়াতে ও ইউক্রেনে. দেশের পূর্বের তুলনায় পরিস্থিতি ১৯৪১ সালে সীমান্ত এলাকায় ছিল অনেক জটিল. এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা পরিষেবার কেন্দ্রীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর যাদুঘরের বৈজ্ঞানিক সহকর্মী গালিনা এরশোভা বলেছেন:

    "সুদূর প্রাচ্য সীমান্ত এলাকায়, যেখানে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর জাপানের সঙ্গে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ছিল, তাদের জন্য দেওয়া হয়েছিল ট্যাঙ্ক ও সাঁজোয়া গাড়ী. পশ্চিমের সীমান্ত অঞ্চলে পাছে ফ্যাসিস্ট জার্মান সরকারকে কোন ভাবে প্ররোচনা দেওয়া হয়ে যায়, সেই উদ্বেগে একমাত্র গুলি করার মতো বন্দুক ছাড়া তখন আর কিছুই পাঠানো হয় নি. সেখানে প্রায় এক লক্ষ সীমান্ত রক্ষী ছিলেন, এঁরা ছিলেন ৪৭টি সীমান্ত রক্ষী দলে ও ছটি সামুদ্রিক সীমান্ত রক্ষী দলের মধ্যে. প্রতিটি দলের ছিল আলাদা করে ঘাঁটি ও প্রতিটি ঘাঁটির দায়িত্বের মধ্যে পড়েছিল ২৮ কিলোমিটার করে এক একটি অঞ্চল. অর্থাত্ সীমান্তে প্রতি কিলোমিটারে আট জন করে সেনা ছিলেন. এটা বেশী হলেও সমস্যা ছিল অস্ত্রের বিষয়ে".

    যোদ্ধাদের কাছে ছিল "ম্যাক্সিম" নামের ভারী মেশিনগান, পিস্তল, রিভলবার, গ্রেনেড, তিন নল ওয়ালা রাইফেল কিন্তু কোন রকমের আঘাত প্রতিহত করার মতো প্রযুক্তি ছিল না. স্বয়ংক্রিয় রাইফেল ছিল শুধু ঘাঁটির নেতৃত্বের কাছেই. যুদ্ধ শুরু হলে সীমান্ত রক্ষকদের প্রতি নির্দেশ ছিল রাষ্ট্রের সীমান্ত এলাকা ছেড়ে পেছিয়ে আসা ও নিয়মিত সেনা বাহিনীর সঙ্গে প্রতিরক্ষার এলাকায় সংযুক্ত হয়ে যাওয়া, কিন্তু এই ঘটনা একচল্লিশ সালের ২২শে জুন ঘটে নি. গালিনা এরশোভা বলেছেন:

    "আজ আমরা জানি যে, লাল ফৌজের বাহিনী, যারা সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হলে একসাথে সীমান্ত প্রতিরক্ষায় লাগার কথা ছিল, এই সময়ে পঞ্চাশ কিলোমিটার ও বহু জায়গায় তার থেকেও বেশী দূরেই ছিল. তাই সীমান্তে শুধু এই এক লক্ষ যোদ্ধা. আর তাদের উপরেই পড়েছিল ফ্যাসিস্ট জার্মান বাহিনীর সমস্ত আঘাতের অগ্নি বর্ষণ".

    "বারবারোসা" নামের পরিকল্পনা অনুযায়ী হিটলার প্রতিটি সীমান্ত রক্ষী ঘাঁটি দখল করার জন্য গড়ে তিরিশ মিনিট থেকে এক ঘন্টা সময় বরাদ্দ করেছিল. কার্যক্ষেত্রে এই ঘাঁটি গুলিতে যুদ্ধ হয়েছিল এক ঘন্টা থেকে শুরু করে ষোল ঘন্টা অবধি, এমনকি ১১ দিন পর্যন্ত ও কখনও এমনকি পুরো মাস ধরে. বেলোরাশিয়ার ব্রেস্ট শহরের কেল্লা ছিল সোভিয়েত দেশের সীমান্তের পশ্চিমে প্রথম প্রতিরক্ষা কেল্লা. তা দখল করতে জার্মান পরিকল্পনায় সময় দেওয়া ছিল আট ঘন্টা. কিন্তু তাদের পরিকল্পনা নষ্ট করে দিয়েছিল কয়েক শো সীমান্ত রক্ষী যোদ্ধা. সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর যাদুঘরে এখনও রয়েছে সেই কেল্লার দেওয়ালের ভগ্ন অংশ ও একটি মাটির তলার অংশের প্রতিরূপ, যেখান থেকে এই বাহিনীর যোদ্ধারা ফ্যাসিস্ট জার্মানীর সামরিক যন্ত্রের আঘাত প্রতিহত করেছিলেন. ইঁটের উপরে একই কথা লেখা – "আমরা মরব তবু কেল্লা ছেড়ে যাবো না", "আমরা মরব তবু আত্মসমর্পণ করবো না". এই পবিত্র ভূমির রক্ষা কারীরা জল, খাবার সব কিছু ছাড়া যুদ্ধ করেছেন, তাদের অস্ত্রের সম্ভার দ্রুত ফুরিয়ে গিয়েছিল, আর সাহায্য কোনও দিক থেকেই আসার সম্ভাবনা ছিল না. ব্রেস্ট কেল্লার বীরত্ব সমস্ত ইতিহাসের পাঠ্য বইতেই রয়েছে. সেই যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিন গুলির কিন্তু এটা মোটেও একমাত্র বীরত্বের উদাহরণ ছিল না.

    দেশের সীমান্তে ইউক্রেনের এলাকাতে ১৩ নম্বর ভ্লাদিমির-ভলীনস্কি সীমান্ত রক্ষী ঘাঁটির যোদ্ধারা লেফটেন্যান্ট আলেক্সেই লপাতিনের নেতৃত্বে ১১ দিন ধরে আটকে রেখেছিলেন তাদের থেকে অনেক গুণে শক্তিশালী জার্মান বাহিনীর আক্রমণকে. ২৯শে জুলাই লপাতিন ঘেরাও হয়ে যাওয়া এলাকা থেকে মহিলা ও শিশুদের নিরাপদে বের করে নিয়ে গিয়েছিলেন, আর নিজে যোদ্ধাদের নিয়ে ফিরে এসেছিলেন ঘাঁটি রক্ষার জন্য. ২রা জুলাই তিনি ও তাঁর অধীনের যোদ্ধারা অসম যুদ্ধে প্রাণ দিয়েছিলেন, এই কথা মনে করিয়ে দিয়ে গালিনা এরশোভা বলেছেন:

    "পাথরের বাড়ীটি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, সীমান্ত রক্ষীরা চলে গিয়েছিলেন মাটির নীচে, শুধু ২রা জুলাই এই যুদ্ধ শেষ হয়েছিল, যখন ফ্যাসিস্ট সেনারা মাটির নীচে, যেখানে এই বীর যোদ্ধারা ছিলেন, সেখানে আগুণ ধরিয়ে দেওয়ার মতো গোলা বর্ষণ করে সমস্ত মাটির নীচের জায়গা পুড়িয়ে দিয়েছিল".

    ঐতিহাসিকরা এখনও তর্ক চালিয়ে যাচ্ছেন যে দেশের নেতৃত্ব, বিশেষত স্তালিন নিজে সোভিয়েত দেশ নিয়ে জার্মানীর পরিকল্পনার সম্বন্ধে কতটা আগে থেকে জানতে পেরেছিলেন. মহান পিতৃভূমির রক্ষার যুদ্ধ শুরুর সত্তর তম জয়ন্তী বর্ষের আগে রাশিয়ার পররাষ্ট্র অনুসন্ধান পরিষেবা কিছু দলিল প্রথমবার জনসমক্ষে প্রকাশ করেছে, যা ১৯৩৮ থেকে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত ক্রেমলিনে এসেছিল. এই দলিল গুলি আগ্রাসন নামে এক বইতে একসাথে প্রকাশ করা হয়েছে ও তা এখন পড়তে পারা যাচ্ছে. সোভিয়েত গুপ্তচর বিভাগ সোভিয়েত দেশে আক্রমণ শুরু হওয়ার কয়েক মাস আগে থেকেই দেশের নেতাদের ক্রমাগত জানিয়েছিল আসন্ন যুদ্ধের সম্ভাবনা, এই কথা বলে অনুসন্ধান করে যিনি এই বই প্রকাশ করেছেন, সেই প্রশাসনিক কাজের দায়িত্ব প্রাপ্ত ও বর্তমানে অবসর প্রাপ্ত মেজর জেনেরাল লেভ সোত্স্কভ বলেছেন:

    "এই বইতে যুদ্ধের আগের মাস গুলিতে সমস্ত তথ্য যা ক্রেমলিনে জানানো হয়েছিল, তার সারাংশ নিয়ে এক সিদ্ধান্ত মূলক নির্দেশ দেওয়া রয়েছে. আর আমি অন্ততঃ তিরিশটি  খবর দেখতে পেয়েছি, যা সঙ্কেত দিয়েছে যুদ্ধ শুরু নিয়ে".

কিন্তু স্তালিন, সমস্ত রকমের সাবধান করে দেওয়া স্বত্ত্বেও কিছু করেন নি, লেভ সোত্স্কভ মনে করেন যে, বিশেষত এই কারণে যে, তিনি ভয় পেয়েছিলেন যে, তাঁকে আগ্রাসক বলে দোষ দেওয়া হবে.

১৯৪১ সালের ২২ শে জুনের মতো গভীর শোকের দিনে আমরা বারবার সেই সমস্ত লোকের স্থৈর্য ও পুরুষকার দেখে অভিভূত হয়ে থাকি, যাঁরা দেশের সীমান্তে দাঁড়িয়ে প্রথম শত্রুকে প্রতিঘাত করেছিলেন. সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর বীরত্ব ছিল প্রচুর. প্রথম দিনেই মারা গিয়েছিলেন সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর তিন হাজার অফিসার. বহু ঘাঁটির যোদ্ধারা সঙ্গে সঙ্গেই নিহত হয়েছিল, কেউ আবার ঘেরাও ভেঙে বের হতে পেরেছিলেন. আর অনেকটাই সীমান্ত রক্ষী দের জন্যেই হিটলারের দ্রুত গতির জয়ের যুদ্ধের পরিকল্পনা ভেস্তে গিয়েছিল.