ভাষ্যকার: ভারত ও চীনের পারস্পরিক সম্পর্কে নতুন সংকট তৈরী হয়েছে. কারন  পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অনাবৃষ্টি প্রবণ এলাকাগুলিতে জমি চাষে জল সরবরাহের জন্য বাঁধ নির্মাণ করে ব্রম্মপুত্রের স্রোতধারা সিনজিয়ান ও তিব্বতের দিকে পরিবাহিত করবার পরিকল্পনা নিয়েছে. এর ফলে ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রাজ্যগুলিতে ও বাংলাদেশে সেচের জন্য জলের ঘাটতি দেখা দেবে. এই সব অঞ্চলে কৃষিকার্য পুরোপুরিভাবে মরসুমের ওপর নির্ভরশীল- বর্ষাকালে উদ্বৃত্ত জল জলাধারে জমা করা হয়, আর শুকনো মরসুমে তা দিয়ে জমিসেচন করা হয়ে থাকে.

       চীনের সরকার অবশ্য আশ্বাস দিচ্ছে যে, বাঁধের ক্ষমতা এত নয় যে তা ভারত ও বাংলাদেশের কৃষিকার্যের ক্ষতিসাধন করতে পারে. কিন্তু ভারত সরকার এ ব্যাপারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং চীনের কাছ থেকে আরও তথ্য চেয়ে পাঠিয়েছে, এবং প্রয়োজনে-যথোচিত কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে বদ্ধপরিকর.

 

জলসম্পদ জনিত পরিস্থিতির কয়েকটা দিক আছে. চীনের জন্যে দেশের অখন্ডতা বজায় রাখবার স্বার্থে দেশের পশ্চিমাঞ্চলে জলসেচ অত্যন্ত জরুরী. তিব্বত এবং সিনজিয়ান হল অর্থনৈতিক দিক থেকে সবচেয়ে পশ্চাত্পদ এলাকা, উপরন্তু সেখানে পৃথকবাদী প্রবণতা অত্যন্ত প্রবল. চীন সরকার পৃথকবাদী ভাবাদর্শ সমূলে উচ্ছেদের নীতি গ্রহণ করেছে. সেজন্য বিভিন্ন রকম ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে. প্রথমতঃ, ঐ এলাকায় খেতাবধারী খানদের পুণর্বাসন ঘটিয়ে তিব্বতে ও সিনজিয়ানে স্থানীয় অধিবাসীদের সংখ্যালঘুতে পর্যবসিত করার সক্রিয় প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে, আর দ্বিতীয়তঃ, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে- বিশেষতঃ বাঁধ নির্মাণ ও বহুবিধ খাল খনণ করে  অর্থনৈতিক অগ্রগতির হার বৃদ্ধি ও ঐসব অঞ্চলের বাসিন্দাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ণের পরিকল্পণা নেওয়া হচ্ছে.

 

ভাষ্যকার: অন্যদিকে, ব্রহ্মপুত্রের জলধারা নিয়ে সাম্প্রতিক মতবিরোধ একবিংশ শতাব্দীতে নতুন বাস্তবের সাক্ষ্য দিচ্ছে. বহু রাজনীতি তত্ববিদদের মতে, বিংশ শতাব্দীতে যেমন শক্তিবাহক থনিজ সম্পদ ছিল বিবাদ, এমনকি যুদ্ধের মুল কারন, চলতি শতকে সেটা জল নিয়ে বিবাদ ও যুদ্ধে পরিণত হতে পারে. ইতিমধ্যেই জলসম্পদ নিয়ে সংঘাত ঘটছে- আফ্রিকায়, নিকট প্রাচ্যে, লাতিন আমেরিকায়. বিশেষতঃ এশিয়ায় এরকম ঘটনা অনেক- মধ্য ও দক্ষিন-পূর্ব ভাগে. উদাহরণ স্বরূপ, কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে ভারত-পাক সংঘাতের প্রধান কারন হল এই যে, পাকিস্তানে বাহিত সব বড় নদীরই উত্স ভারতে, এবং এই সব উত্স যার দখলে, সেই বস্তুত পাকিস্তানের কৃষিব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে.

 

ভাষ্যকার: নদনদীর জলধারা ব্যবহারের আরেকটা দিক হল- পরিবেশ দুষণ. জলবিদ্যুত উত্পাদনের দীর্ঘকালীন প্রকল্পের দরুন ব্রহ্মপুত্রের উচ্চপ্রবাহ ভুমিতে পরিবেশ দুষণের মাত্রা নিরূপণ করা অসম্ভব. আজ, যখন পৃথিবীর জলবায়ু দ্রুতহারে বদলাচ্ছে, এবং প্রধানতঃ মানব কার্যকলাপের কারনে, তখন, যে কোনো বড় প্রকল্প, যেটা জলবায়ুর পরিবর্তনে প্রভাব ফেলতে পারে, তা আন্তর্জাতিক স্তরে সবিস্তারে গবেষণার প্রয়োজন এবং কোনো আলাদা দেশের ইচ্ছামাফিক বাস্তবায়িত করা উচিত নয়.

 

ভাষ্যকার: আশা করা যেতে পারে, যে ব্রহ্মপুত্রের জল নিয়ে চীন-ভারত বিবাদ সাংঘাতিক কোনো রাজনৈতিক সংঘাতে, উপর্যুপরি কোনো যুদ্ধে পরিণত হবে না. চীন ও ভারতের মধ্যে যোগাযোগ এতটাই গাঢ় আর তাদের পারস্পরিক নির্ভরতা এতই বেশি, যে এই দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে জটিল সম্পর্ক উপোরক্ত কারনে জটিলতর করা হবে না. তা সত্বেও এত বড় প্রকল্প রূপায়ণের কাজে হাত দেওয়ার আগে সমস্ত দিক নিয়ে বিষদ ভাবে চিন্তাভাবনা করা উচিত.