অনতিপূর্ব গরম সমস্ত পৃথিবীর লোকের জন্যই নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা হতে চলেছে. এই রকমের একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা, আবহাওয়া পরিবর্তনের গতি প্রকৃতি বিচার করে. তাঁদের তথ্য অনুযায়ী, এই প্রচণ্ড গরম, যা আগে কখনোই ছিল না, আফ্রিকা ও এশিয়াতে পাকাপাকি ভাবে আসন নিতে চলেছে আগামী ২০ বছরের মধ্যেই. আর ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাসিন্দারা আবহাওয়ার একেবারে আমূল পরিবর্তন টের পাবেন ৬০ বছর পরে.

    বিজ্ঞানীরা সারা বিশ্বের আবহাওয়া কেন্দ্রগুলির সঞ্চিত তথ্য বিচার করেছেন ও প্রায় ৫০ রকমের আবহাওয়ার মডেল নিয়ে গবেষণা করে দেখেছেন. ফল হয়েছে অঙ্ক কষে দেখা গেল যে, বিশ্বের বিষুবরেখা সংলগ্ন এলাকা গুলিতে মাটি এত দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে যাচ্ছে যে, আসন্ন ২০ – ২৫ বছর ধরে বেশীর ভাগ গরম কালই তাপমানে একেবারে চরম হয়ে উঠতে চলেছে. এই ভাবেই, মানব সমাজকে এমন সমস্ত পরিবেশে বাঁচতে অভ্যাস করতে হবে যে, যখন প্রতি বারের গরম কাল আগের বছরের চেয়ে বেশী গরমই হবে. আর এই সময়ের সবচেয়ে ঠাণ্ডা গরম কালও হবে আগের পঞ্চাশ বছরের সবচেয়ে উষ্ণ গরম কালের চেয়ে বেশী গরম, সিদ্ধান্ত শুনিয়েছেন স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গবেষক দলের নেতা নই ডিফ্ফেনবাউ. এই রকমের অতুলনীয় আবহাওয়ার পরিবর্তনের একটি অন্যতম কারণ – কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাসের ঘনত্বের বৃদ্ধি, এই বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে বিশ্ব বন্য প্রকৃতি তহবিলের পরিবেশ ও জ্বালানী শক্তি প্রকল্পের কোঅর্ডিনেটর আলেক্সেই ককোরিন বলেছেন:

    "প্রথমতঃ, এটা সবচেয়ে আধুনিক তথ্য নয়. এটা সেই সমস্ত গবেষণার সঙ্গে যোগ হওয়া তথ্য, যা অনেক দিন ধরেই করা হচ্ছে. এখানে মনে করা হচ্ছে যে, যদি মানুষের কাজের প্রভাবের সবচেয়ে কূপ্রভাব পরিবেশের বাস্তব ও রাসায়নিক যৌগের মধ্যে পড়ে তাহলে কি হতে পারে, অংশতঃ আবহাওয়াতে গ্রীন হাউস এফেক্ট বৃদ্ধির জন্যও, তাহলে ২০৬০ -৭০ সাল নাগাদ, যা আমরা এখন অসম্ভব গরম বলে মনে করে থাকি, যেমন, ২০০৩ সালের ইউরোপের গরম কাল, সেটা সত্যিই সাধারন হয়ে দাঁড়াবে. কিন্তু এখানে মনে রাখতে হবে যে, তা বলে ২০৬৯ সাল অবধি সব কিছু ঠিকই থাকবে এমন কিন্তু নয়, আর শুধু ২০৭০ সালেই যে হঠাত্ করে গরম বেড়ে যাবে, তাও বলা হচ্ছে না. এটা হবে আস্তে ধীরে পরিবেশে সমস্ত রকমের বিপজ্জনক দূর্ঘটনা বেড়ে যাওয়া, তার মধ্যে থাকবে গ্রীষ্মের প্রবল তাপ প্রবাহ".

    মনে করিয়ে দেওয়া যেতে পারে যে, ২০০৩ সালের এই মানদণ্ড হওয়া গরমে ইতালি ও ফ্রান্সে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছিল. রাশিয়াতে ২০১০ সালের গরমও কিছু কম প্রাণ নেয় নি, প্রায় ১০ হাজারের বেশী লোক গতবারের গরমে প্রাণ হারিয়েছেন. এই গরমের প্রভাব রাশিয়ার অর্থনীতিতে এখনও টের পাওয়া যাচ্ছে – রাশিয়ার শষ্য রপ্তানী শুরু হবে শুধু এই বছরের ১ লা জুলাইয়ের পরে, প্রায় এক বছর নিষেধ থাকার পরে, এই কথা উল্লেখ করে "২কে অডিট – ব্যবসায়িক পরামর্শ" কোম্পানীর এক মালিক ইভান আনদ্রিয়েভস্কি বলেছেন:

    "কিছু বিশেষজ্ঞের মতে দত বছরের গরম কাল রাশিয়া সার্বিক জাতীয় উত্পাদনে শতকরা এক শতাংশ ঘাটতির কারণ হয়েছিল. গরমে কাজ করার ক্ষমতা কমে গিয়েছিল, আর শ্রম সংক্রান্ত নিয়ম অনুযায়ী কর্ম দাতারা বাধ্য হয়েছিলেন, তাঁদের কর্মচারীদের কাজের সময় কমাতে, তাই সমস্ত ধরনের উত্পাদনই হয়েছিল কম. ২০১০ সালের খরার জন্য শষ্য সংগ্রহ হয়েছিল ২০০৯ সালের তুলনায় শতকরা পঁচিশ ভাগ কম. আর সব্জীর দাম বেড়ে গিয়েছিল ২০১০ সালে প্রায় শতকরা ৪৫ ভাগ, যা অনেক ও অনেক বেশী. এই সবই, অন্যান্য সূচক গুলির সঙ্গে যোগ করলে, সমগ্র অর্থনীতির উপরেই খারাপ প্রভাব বিস্তার করেছে".

    আবহাওয়া উষ্ণতা বৃদ্ধি, বিশেষজ্ঞদের মতে, রাশিয়ার উপরেও প্রভাব বিস্তার করবে, বিশেষত রাশিয়ার দক্ষিণের কৃষি প্রধান জায়গা গুলিতে একেবারেই নেতিবাচক ভাবে. কিন্তু দেশের অন্যান্য অঞ্চলের জন্য তাপমাত্রার বৃদ্ধি সত্যিকারের এক রেনেসাঁর শুরু হতে পারে, এই রকম মনে করেছেন ইভান আনদ্রিয়েভস্কি, তাই বলেছেন:

    "আমাদের দেশের এক বিশাল অঞ্চল ঠাণ্ডার জায়গা, আর যদি সেই সব জায়গায় তাপমাত্রা বেড়ে যায়, তবে সেই সমস্ত জায়গা হবে আরও বাস যোগ্য, যার অর্থ হল রাশিয়ার অর্থনীতির জন্য একটা সম্ভাবনা তৈরী হবে. আর বহু বিজ্ঞানী বলছেন যে, এই ধরনের সম্ভাবনা রাশিয়াকে বিশ্বের নেতৃত্বে পৌঁছে দেবে".

    তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার ফলে কৃষির সময়ও পাল্টে যেতে পারে, যার ফলে এর খারাপ দিক গুলিও কম প্রভাব ফেলতে পারবে, এই রকম মনে করে মস্কোর শিল্প বিনিয়োগ একাডেমীর অর্থনৈতিক গবেষণা কেন্দ্রের ডিরেক্টর সের্গেই মইসেয়েভ, তিনি বলেছেন:

    "অনেকদিন ধরে শীত থাকার ফলে আমাদের দেশে অনেক অর্থ খরচ হয় রাস্তা মেরামত করতে, বরফ সরাতে ও এই সব অন্যান্য কাজ করতে. আর যদি মনে করা যায় যে, আমাদের দেশে তাপমাত্রা হবে মনে করুন দক্ষিণ ইউরোপের মতো, তাহলে রাস্তাঘাট পরিস্কার ও মেরামতের খরচ খুব কম হবে. একই রকমের ব্যাপার হবে দেশের বাড়ী ঘর পরিষেবার খাতে. কারণ বর্তমানে অনেক খরচ করা হয়, বাড়ী ঘর গরম রাখতে গরম জল সরবরাহে ও বিদ্যুত শক্তির পিছনে".

    কিন্তু সব মিলিয়ে বিজ্ঞানীরা একটি বিষয়ে একমত হয়েছেন যে, পরিবেশের এই বিশ্বজোড়া পরিবর্তনের ফলে আমাদের পৃথিবী ও মানুষের জন্য এটা খুবই কঠোর নিগ্রহ হবে. এশিয়াতে, যেখানে সর্বাধিক সংখ্যক মানুষ থাকেন, সেখানে তাপ বৃদ্ধির ফলে জল সঙ্কট দেখা দেবে. তার সঙ্গে জমির ভিতরে পরিবর্তনও ঘটবে মারাত্মক, জল না থাকার ফলে সেখানে চাষ করাও সম্ভব হবে না, যার মানে হল দুর্ভিক্ষ ও সঙ্কট. এই রকমের একটা সময়ের কথা ভেবেই অর্থনীতিবিদেরা বিভিন্ন সম্ভাব্য পীড়িত অঞ্চল গুলিকে সাহায্য করার জন্য নানারকমের কাঠামো তৈরী করছেন. আর পরিবেশ বিজ্ঞানীরা সাবধান করে দিয়ে বলছেন যে, এখনও সময় আছে এই বিপর্যয় থেকে বাঁচার, যদি পরিবেশে বর্জ্য কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমান এখনকার থেকে অর্ধেক করে দেওয়া যায়. তাহলে এই শতকের মাঝামাঝি সময়ে আবহাওয়ার পূর্বাভাস থাকবে যথেষ্ট ইতিবাচক হবে – তাপ প্রবাহ কোথাও মিলিয়ে যাবে না, কিন্তু তা হবে খুবই বিরল – প্রত্যেক কুড়ি বছরে মাত্র এক বারের মতো.