অভিযানের সময়ে সঙ্গে কি নেওয়া ভাল জি পি এস না গ্লোনাসস দিক নির্ণয় ব্যবস্থা? বোধহয়, এই রকমের একটা দোটানা ভাব অনেক অভিযাত্রীর সামনেই আসে. কিন্তু কোন রকমের কষ্ট কল্পনা না করে, রাশিয়ার বিশ্ব দিক নির্ণয় ব্যবস্থাকে কাজের ক্ষেত্রে পরীক্ষা করে দেখাই ভাল. যেমন, করতে চলেছেন মস্কোর পাল তোলা বোট "ডেলটা" চালকদের দল, যাঁরা চলেছেন বিশ্ব ভ্রমণে.

    তিনটি দীর্ঘ বছর মস্কোর এই দলের লোকেরা বিশ্ব সমুদ্রের নানা পথে ঘুরে বেড়াবে, প্রায় তিরিশ হাজার সামুদ্রিক মাইল ও ২৭ টি দেশের বন্দরে তাদের পাল তোলা নৌকা ভিড়বে. বিদেশ বিভুঁই এলাকায় রাশিয়ার এই খেলোয়াড়দের কাজে লাগবে সম্পূর্ণ নতুন ও দেশী উপগ্রহ মারফত দিক নির্ণয়ের ব্যবস্থা গ্লোনাসস.

    সারা পৃথিবী ঘোরা এই জল যাত্রা, ইউরোপ, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ক্যারিবিয়ান সমুদ্র ও নিউজিল্যান্ড ঘুরে আসার নাম বেশ চমক লাগানো "বিভিন্ন জাতির গুপ্তধন – মহাসমুদ্রের বিস্তার থেকে" আর তা ইউনেস্কোর বোট চালনা প্রকল্পের (UNESCO – YACHTING) আওতায় পড়েছে. এর প্রধান লক্ষ্য হল – পাল তোলা নৌকা প্রতিযোগিতার প্রতি আগ্রহের সৃষ্টি করা – মানব সংস্কৃতির ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয়ের একটি পথ. এই অভিযানের সদস্যেরা নিজেরা দেখবেন ৭০টিরও বেশী ইতিহাস ও সংস্কৃতির স্মৃতি নিদর্শন, যা ইউনেস্কো কৃত সংস্কৃতির ঐতিহ্য তালিকার অন্তর্ভুক্ত.

    ১২ই জুন এই বিশ্ব ভ্রমণ শুরু হচ্ছে, রাশিয়া দিবসে ও তা বিশ্বের প্রথম মহাকাশচারী ইউরি গাগারীনের মহাকাশ ভ্রমণের পঞ্চাশ বছর উপলক্ষে উত্সর্গ করা হয়েছে, এই কথা "ডেলটা" নৌকার ক্যাপ্টেন ও রুশ ক্রুইসার ক্লাবের সভা সদস্য আন্দ্রেই নেভজোরভ বলেছেন:

    "মস্কো পাঁচটি সমুদ্রের সঙ্গে জোড়া এক বন্দর শহর, আর আমরা, বাস্তবেই ১২ই জুন ক্রেমলিনের কাছে ক্রাইস্ট দ্য সেভিয়ার গির্জার সামনের বেরেসেনেভস্কায়া নাবেরেঝনায়া থেকে আমাদের চলা শুরু করছি. আর এক মাস পরে আমরা পৌঁছবো সেন্ট পিটার্সবার্গে, সেখান থেকে বাল্টিক সমুদ্র ও পরে বিশ্ব মহা সমুদ্রে আমাদের যাত্রা পথ বের হবে".

    ক্যাপ্টেনের কথামতো, ডেলটা পাল তোলা নৌকা – খুবই শক্ত ও আধুনিক নৌকা, যা তৈরী করা হয়েছে মহাকাশ যান নির্মাণের উপযুক্ত ধাতব যৌগ দিয়ে. এই নৌকা সেন্ট পিটার্সবার্গের "আলমাজ" নামের কারখানায় তৈরী করা হয়েছে লেনিনগ্রাদের পরীক্ষামূলক জাহাজ ঘাটার ডিজাইন অনুযায়ী. এই নৌকার বেশীর ভাগ যন্ত্র পাতিই রাশিয়াতে নির্মিত. আকৃতিতে এই নৌকা যথেষ্ট ছোট হওয়া স্বত্ত্বেও  - ১০ মিটারের সামান্য বড় লম্বায় ও ৩ মিটার চওড়া – তা চারজন নাবিকের পক্ষে আরাম দায়ক ভাবে ভ্রমণের উপযুক্ত. আন্দ্রেই নেভজোরভ উল্লেখ করেছেন: এই নৌকাতে ভ্রমণ শুধু আরামেরই নয়, তা পরিবেশ বান্ধবও বটে. বোট চলবে পালের জোরে, আর যদি হাওয়া থেমে যায়, তখন বৈদ্যুতিক মোটর চালু করা হবে. তিনি আরও যোগ করেছেন:

    "এই বোটে বিদ্যুত সরবরাহের ব্যবস্থা সেই ধরনেরই কাঁচামাল, যেমন, খাবারের টিন, দানাশষ্য অথবা অ্যালকোহল. তা ফুরিয়ে যেতেই পারে, আর তাই তার বিষয়েও লক্ষ্য রাখতে হবে. স্বাভাবিক ভাবেই যখন সুযোগ থাকবে কোন বন্দরে পৌঁছে আবার করে চার্জ করার আমরা তা করবো, আর তা  না থাকলে সৌর শক্তিই ভরসা, তা ছাড়া হাওয়ার জোরে চলা জেনারেটর, খুবই অসুবিধা হলে থাকছে ডিজেল জেনারেটর. এটা সত্য যে, তা চালানো খুব একটা ভাল নয়, কারণ নৌকা চড়ার প্রধান আনন্দই হল যে, সেখানে সর্বত্র বিদ্যমান মোটরের আওয়াজ নেই, যান্ত্রিক শব্দ নেই... কিন্তু আসলে আমরা এমন সমস্ত এলাকা দিয়ে যাবো, যেখানে খুবই তীব্র সূর্যালোক থাকবে. আমাদের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী সৌর শক্তি চালিত ব্যাটারির শক্তি আমাদের জন্য যথেষ্ট হবে".

    নৌকা চালকদের জন্য গ্লোনাসস ব্যবস্থা পরীক্ষা করার কাজও থাকবে. "এই দিক নির্ণয় ব্যবস্থার নিখুঁত হওয়াও খুব জরুরী, এক মিটার পর্যন্ত. সবই নির্ভর করছে, একসঙ্গে কতগুলি উপগ্রহ থেকে সঙ্কেত ধরতে পারা যাবে, তার উপরে. বলা যাক, অন্ধকারে নৌকা ঘাটে ভিড়তে যাচ্ছে প্রায় অন্ধ অবস্থায়, ক্যাপ্টেন দেখছে শুধু তার মনিটরে. এক্ষেত্রে আবার খেয়াল রাখতে হবে ঢেউয়ের দোলার কথাও. শুধু জি পি এস এর ব্যবহারে এটা করা অসম্ভব ও খুব জটিল. তার চেয়েও বেশী হল, মানচিত্রে আমেরিকা ও রাশিয়ার দিক নির্ণয় যন্ত্রের কাজ তুলনা করে দেখতে পাওয়া যাবে" – এই কথা বলেছেন রাশিয়ার উপগ্রহ মারফত দিক নির্ণয়ের যন্ত্র বিক্রী বন্দোবস্ত করার কোম্পানীর প্রতিনিধি আলেক্সেই ভ্লাসভ, তিনি বলেছেন:

    "এটা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার, গ্লোনাসস ও জি পি এস ব্যবস্থার সম্ভাবনা তুলনা করার ও গ্লোনাসস ব্যবস্থা পরীক্ষা করে দেখার. শুধু আমাদের এই মস্কো বা সেন্ট পিটার্সবার্গের মত জায়গাতেই নয়, যেখানে আমরা আসলে আমাদের যন্ত্র পরীক্ষা করে দেখেছি, সারা বিশ্ব জুড়ে নয়. আর গ্লোনাসস ব্যবস্থার সম্ভাবনা সম্বন্ধে বিশেষত পশ্চিমে যে ধরনের সামান্য তাছিল্য রয়েছে তা ভুল প্রমাণ করার একটা উপায় হবে. নৌকা চলবে, বেশীর বাগই বিদেশ হয়ে, বহু বন্দরে তা ভিড়বে. অর্থাত্ তথ্যের সংখ্যা, যা সেই সব জায়গাতে পাওয়া সম্ভব হবে, তার উপরেই ভিত্তি করে দেখানো সম্ভব হবে যে, গ্লোনাসস ও জি পি এস ব্যবস্থা একসাথে ব্যবহার করলে, অনেক বেশী সুবিধা হবে, শুধু জি পি এস ব্যবস্থা ব্যবহার করার চেয়ে".

    নিজের পক্ষ থেকে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ইনস্টিটিউট মহাকাশের যন্ত্র ব্যবস্থার সহ ডিরেক্টর গেন্নাদি সিনিয়াগিন কোন বিপর্যয়ের সম্মুখীণ হলে, তা থেকে ত্রাণ পাওয়ার জন্য এই "ডেলটা" নৌকার নাবিকদের হাতে তুলে দিয়েছেন ব্যক্তিগত দূর্ঘটনা কালীণ রেডিও অবস্থান নির্ণয় যন্ত্র ও সামুদ্রিক বয়া. আন্দ্রেই নেভজোরভের কাজ হল – এই সমস্ত নতুন যন্ত্রপাতির পরীক্ষা অনেঝ হ্রদে করে দেখা.