মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শুধু এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় নিজেদের যথেষ্ট বিশাল সামরিক উপস্থিতি অটুট রাখবে না, ভবিষ্যতে পদক্ষেপ নেবে তার প্রসার বৃদ্ধির. এই বিষয়ে ঘোষণা করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সচিব রবার্ট গেইটস. পেন্টাগনের প্রধান এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় নিরাপত্তা সমস্যা নিয়ে আয়োজিত ও বিখ্যাত দশম বার্ষিক "শাংগ্রি-লা সংলাপ" সম্মেলনে তিনি বক্তৃতা দিয়েছেন এই মর্মে.

    সিঙ্গাপুরে আলোচিত বিষয় গুলির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল – এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকা চিন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে তীক্ষ্ণ প্রতিযোগিতার জন্য চত্বর হয়ে দাঁড়াবে কি না, তার মধ্যে সামরিক ক্ষেত্রেও? ওয়াশিংটন ও বেইজিং এর মধ্যে বিগত বছর গুলিতে মতবিরোধ তীব্রতর হয়েছে বেইজিং এর সামরিক ক্ষমতা ও রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গেই, এই কথা নিয়ে বহু রাজনীতিবিদই লিখেছেন. তাই আমেরিকা ও চিনের এই বিষয় নিয়ে মূল্যায়ণ, এখানে বিশেষ আগ্রহ নিয়েই অপেক্ষা করা হয়েছিল.

    এক দিক থেকে, এই "শাংগ্রি-লা সংলাপ" সম্মেলনে গেইটস অনেকগুলি ইতিবাচক ঘোষণা করেছেন, যেখানে তিনি চিনের গুরুত্ব বিশ্ব ও আঞ্চলিক ভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগী দেশ হিসাবে বিশেষ করে উল্লেখ করেছেন. অংশতঃ, পেন্টাগনের বিদায়ী প্রধান উল্লেখ করেছেন যে, ওয়াশিংটন চিনের প্রভাব বিস্তার রোধ করতে চেষ্টা করছে না. তিনি উদ্ধৃতি মূলক বক্তব্য দিয়েছেন যে, "চিন একটি বিশ্ব স্বীকৃত বৃহত্ শক্তিশালী দেশ ও সেই রকমই থাকবে". মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চিনের মধ্যে বর্তমানে সামরিক বিষয়ে যোগাযোগ বর্তমানে সবচেয়ে ইতিবাচক দিকেই উন্নত হচ্ছে – এই রকমের মূল্যায়ণ পেন্টাগনের প্রধান, তাঁর সহকর্মী ও চিনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী লিয়ান গুয়ানলের সঙ্গে সাক্ষাত্কারের সময়ে করেছেন.

    অন্য দিকে, রবার্ট গেইটস আশ্বাস দিয়েছেন যে, আগামী বছর গুলিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ জাহাজগুলি এই সমস্ত অঞ্চলের মহড়াতে অংশগ্রহণকারী দেশ গুলির বন্দরে আরও বেশী বার প্রবেশ করবে. আর এটা বেইজিং এর মনে তো হয় না যে, খুব ভাল লাগবে. রবার্ট গেইটসের সঙ্গে সাক্ষাত্কারের সময়ে লিয়ান গুয়ানলে সরাসরিই বলেছেন যে, চিন শুধু তাইওয়ানে আমেরিকার অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করতে দাবী করছে না. তাইওয়ান – দুই পক্ষের সম্পর্কের মধ্যে অন্যতম ঐতিহ্যবাহী পথের কাঁটা. চিনের প্রতিরক্ষা দপ্তরের প্রধান তারই সঙ্গে মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন চিনের চারপাশের ২০০ মাইল অর্থনৈতিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক অঞ্চলে মার্কিন গুপ্তচর জাহাজ গুলির আনাগোনা বন্ধ করার জন্য.

    কিন্তু আরও সমস্যা রয়েছে, যা আপাততঃ সরকারি ও জনসমক্ষে ঘোষণার আড়ালেই রয়ে গিয়েছে, তাও ভবিষ্যতে খুবই তীক্ষ্ণ বিরোধের কারণ হতে পারে, আর তা খুব একটা দূরের ভবিষ্যতে নয়. দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিরোধের সম্ভাবনা বাড়ছে এই প্রসঙ্গে যে, চিন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় দক্ষিণ পূর্ব এশিয়াতে একই চত্বরে স্বার্থের মধ্যে সংঘাত লাগছে. কয়েকদিন আগে মার্কিন পররাষ্ট্র সচিবের সহকারী কুর্ট ক্যাম্পবেল ঘোষণা করেছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে নিজেদের দক্ষিণ পূর্ব এশিয়াতে সামরিক স্ট্র্যাটেজি সংশোধন করছে. এই সংশোধনের লক্ষ্য – এই দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া এলাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ স্ট্র্যাটেজিক উপ অঞ্চলে এবং সামগ্রিক ভাবে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় আমেরিকার সামরিক উপস্থিতি সুরক্ষিত করা, আর হতে পারে আরও শক্তিশালী করা, এই কথা ঘোষণা করেছেন রাশিয়ার ভূ রাজনৈতিক সমস্যা গবেষণা একাডেমীর সভাপতি কর্নেল জেনেরাল লিওনিদ ইভাশভ, তিনি "রেডিও রাশিয়াকে" দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে বলেছেন:

    "মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের আভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সঙ্কট থাকা স্বত্ত্বেও, বিশাল আভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের বোঝা স্বত্ত্বেও, এক মেরু বিশিষ্ট বিশ্ব গঠনের স্বপ্ন থেকে বিরত হয় নি ও তাদের বিশ্ব জোড়া প্রাথমিক শক্তি হওয়ার স্বপ্ন থেকে হঠে যায় নি. এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকাই ছিল একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল, যেখান থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বজোড়া প্রভাব বিস্তারের কাজ শুরু করেছিল. আজ এই অঞ্চল খুবই দ্রুত উন্নতি করছে, কিন্তু এখানে প্রতিযোগিতাও খুবই তীক্ষ্ণ হয়েছে. আজ এই অঞ্চলে শক্তিশালী ভাবে প্রবেশ করছে চিন, আর শুধু তা অর্থনৈতিক প্রকল্প নিয়েই নয়, সামরিক উপস্থিতি দিয়েও".

    বিগত বছর গুলিতে চিন নিজেদের দেশের সীমান্তের নিকটবর্তী এলাকা গুলিতে নিজেদের সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি করতে প্রচেষ্টা করেছে. বেইজিং সেই সুযোগই ব্যবহার করেছে, যখন বিগত বছর গুলিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান ও ইরাকে যুদ্ধ পরিচালনায় ব্যস্ত থেকেছে ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার প্রতি মনোযোগ কম দিয়েছে. ফলে চিনের পক্ষে সম্ভব হয়েছে এমনকি আমেরিকার সেই সমস্ত সামরিক সহযোগী দেশের সঙ্গেও সামরিক সম্পর্ক বৃদ্ধি করার, যেমন, থাইল্যান্ড, অথবা ইন্দোনেশিয়া, যাদের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনও সামরিক ক্ষেত্রে প্রধান হয়েই রয়েছে. কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে. সমস্ত এলাকায় শুধু ভিয়েতনাম, ফিলিপাইনস ও ব্রুনেই একমাত্র চিনের কাছ থেকে অস্ত্র সরবরাহ পাচ্ছে না. কয়েকদিন আগে চিনের একজন বিখ্যাত আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ – প্রফেসর ইয়ান সুয়েতুন ঘোষণা করেছেন যে, চিনের দরকার হল দক্ষিণ পূর্ব এশিয়াতে নিরাপত্তা রক্ষা করা. এই প্রসঙ্গে ইয়ান সুয়েতুন অঞ্চলে এমনকি সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার মতো সংস্থা তৈরী করার কথা বলেছেন. এটা আঞ্চলিক নেতৃত্বের বিষয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কে এই এলাকা থেকে হঠিয়ে দেওয়ার বিষয়ে যা একমাত্র বাধা থেকে গিয়েছে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশ গুলির জন্যে, তা হল চিনের প্রভাব বৃদ্ধিকে এই অঞ্চলের দেশ গুলি একই রকমের আশঙ্কা বলেই দেখে. এখন কি বেশী ভারী হতে চলেছে – "চিনের থেকে বিপদের আশঙ্কা" অথবা আগামী দিনের বিশাল এক রাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতার সুফল নিয়ে সম্ভাবনা, তা আসন্ন কিছু সময়েই দেখতে পাওয়া যাবে.