ইয়েমেন ও সিরিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি ও বিভিন্ন উত্স থেকে প্রাপ্ত সংবাদের বিবেচনায় বলাই যেতে পারে যে,দুইটি দেশই এখন গৃহযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পোঁছে গেছে।ইয়েমেনের রাজধানী সানায় ইতিমধ্যে প্রেসিডেন্ট ভবনে হামলা হয়েছে।শুরুতে সংবাদে জানানো হয়,প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লা সালেহ নিহত হয়েছেন কিন্তু কিছুক্ষন পরই ঘোষণা দেওয়া হয় যে,তিনি সামান্য আহত হয়েছেন।প্রতিত্তুরে,সরকার পক্ষের দাঙ্গা পুলিশ ও আর্মীরা বিদ্রোহীদের বাড়ীতে গিয়ে হামলা চালায়।

ওদিকে,সিরিয়ার পরিস্থিতিও বেশ ভয়াবহ।পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে সেখানে একাধিক ব্যক্তি নিহত হয়েছে।বন্ধ রয়েছে দেশের ইন্টারনেট সংযোগ।সেই দিক থেকে লিবিয়ার পরিবেশ কিছুটা শান্ত.তবে ন্যাটো জোট লিবিয়ায় সামরিক অভিযান অব্যহত রেখেছে।

গতকালও সিরিয়ার বিভিন্ন শহরে ধারাবাহিক কর্মসূচী ‘শুক্রবারের ঘৃনা’ পালিত হয় যা গত দুই মাস ধরেই প্রতি শুক্রবার পালিত হয়ে আসছে। কয়েক হাজার বিদ্রোহী দলের নেতা-কর্মীরা দামাস্ক,হাম ও দীর আজ-জুরায়র সড়কপথে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।তবে নিরাপত্তা বাহিনীও কঠোর হস্তে এর জবাব দেয়।বিরোধী দলের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে,অন্তত ৭০ জন নিহত হয়েছেন।অন্যদিকে দামাস্ক সরকারি  বার্তায় নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান পরিচালনাকে অস্বীকার করেছে।তাছাড়া সিরিয়ায় আবারও ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।সিরিয়া পরিস্থিতি বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারী ক্লিনটন নিজের দেওয়া মন্তব্যে বলেছেন,বাশার আল আসাদের সরকার সিরিয়ার বর্তমান যে পরিবেশ সৃষ্টি করেছে তা সম্পূর্ণ মানব সমাজের পরিপন্থি।সিরিয়ার জন্য খুব শিঘ্রই লিবিয়ার পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে।এমনই মন্তব্য করেছেন গ্লোবাল ইন্সটিটিউটের পরিচালক মিখাইল দেলইয়াগিন। তিনি বলছেন,যখনই লিবিয়ার পরিবেশ ন্যাটোর কাছে সন্তোষজনক বলে মনে হবে ঠিক তখনই ন্যাটো সিরিয়ায় সামরিক অভিযান শুরু করবে।পিছনের অভিজ্ঞতা এবং পরিস্থিতি বিবেচনা করলে ন্যাটো জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমতি ছাড়াই হয়ত সিরিয়ায় এই অভিযান চালাবে।শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকতার কারণে ন্যাটোর সদর দপ্তরে চুড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য একটা বৈঠক ডাকা হবে।

উল্লেখ্য,বশির আসাদ বিরোধী দলের অনেক শর্তই মেনে নিয়েছেন।তিনি গনতান্ত্রিক ধারার শিক্ষা ব্যবস্থা চালুর গুরুত্ব দিয়েছেন,মন্ত্রী পরিষদে ব্যপক পরিবর্তন এনেছেন এবং ৫০ বছর ধরে চলমান জরুরি পরিস্থিতি উঠিয়ে নিয়েছেন।কিন্তু এত কিছুর পরও সিরিয়ার বিরোধী নেতাদের শুধুমাত্র একটাই দাবী এবং তা হচ্ছে আসাদের পদত্যাগ।

থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে ইয়েমেনে।দেশটির রাজধানী রীতিমত রণক্ষেত্রে পরিনত হয়েছে।অজ্ঞাত পরিচয়ধারী কয়েক ব্যক্তি  প্রেসিডেন্ট ভবনকে উদ্দেশ্য করে গোলা ছোঁড়ে।এ সময় প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লা সালেহ পার্শ্ববর্তী মসজিদে নামাজ আদায় করছিলেন।তিনি এবং কয়েকজন মন্ত্রী এ ঘটনায় আহত হয়েছেন।বিরোধী দলের নেতৃত্বে থাকা শেখ সাদেক আল-আহমারের কর্মীরা সরকারী সেনা বাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।সানায়ের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বন্ধ রয়েছে।এই সব ঘটনার পর ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট পারস্য উপসাগরীয় সম্পর্ক বিষয়ক পরিষদের সাথে আলোচনার পর শান্তিচুক্তিতে সই করতে রাজি হয়েছেন।সংবাদ মাধ্যম থেকে জানা যায়,চুক্তি অনুযায়ী এক মাসের মধ্যে সালেহ দেশ পরিচালনার দায়িত্ব বিরোধী দলের কাছে অর্পন করবেন এবং এর পেক্ষিতে সালেহ ও তার পরিবারকে বিশেষ নিরাপত্তা দেওয়া হবে।তবে তিনি কবে ঐ চুক্তি সই করবেন তা এখন পরিষ্কারভাবে জানা যায় নি।

ওদিকে এখনও নিশ্চিত করে কিছুই বলা যাচ্ছে না যে, লিবিয়ায় ন্যাটো জোটের সামরিক অভিযান কবে বন্ধ হবে।মিত্র বাহিনী শুরুতে বলেছিল, তারা ৯০ দিন এই অভিযান পরিচালনা করবে।এদিকে লিবিয়ায় সোভিয়েত ইউনিয়নের সাবেক রাষ্ট্রদুত অলেগ পেরসিপকিন জানান,মিসর ও তিউনিশায়ার পুনরাবৃত্তি লিবিয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয় নি।দেশটির বিরোধী দল তেমন শক্তিশালী নয়।তিনি বলছেন,লিবিয়ায় ন্যাটো জোটের এত আঘাত হানার পরও সেই গাদ্দাফি এখনও জীবিত রয়েছেন।মার্কিন ও পশ্চিমারা লিবিয়ার অভ্যন্তরে যে সমর্থনের আশা করেছিল তা পাওয়া সম্ভব হয় নি।বেনগাজীর পরিস্থিতি নিয়ে যদি কথা হয় তা হচ্ছে,ঐ এলাকার লোকজন সবাই মুলত অস্ত্রধারী।তাদের রয়েছে ৩০ সদস্য বিশিষ্ট নিজস্ব জাতীয় পরিবর্তনসূচক পরিষদ।এদের মধ্যে শুধুমাত্র ১০ জনের নামই আমরা জানি,কিন্তু বাকী ২০ জনের পরিচয় কেন দেওয়া হয় না?।কারণ হচ্ছে এরা সবাই চেচনিয়া ও আফগানিস্তানে যুদ্ধ করেছেন এবং এদের সাথে রয়েছে আল-কায়দার সম্পর্ক।

লিবিয়ায় সামরিক অভিযান বন্ধে মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসাবে রাশিয়াকে আহবান জানানো হয়েছে।অন্যদিকে রাশিয়ার আধুনিক ইরান গবেষনা কেন্দ্রের পরিচালক রাজাব সাফারভ দৃড়তার সাথে বলেন,যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো ঐ অঞ্চলের অন্যান্য দেশ দখল করবে।তিনি বলছেন,বিষয়টি ইরান প্রশ্নের সমাধানের একটি সামগ্রিক কৌশল মাত্র।প্রধান লক্ষ্য ও প্রশ্ন হচ্ছে- ইরান।যদি ইরান তার অন্যতম সহযোগি রাষ্ট্র সিরিয়াকে হারায় তাহলে পরিষ্কারই দেখা যাচ্ছে যে,ইরানের ক্ষেত্রে কিছু ঘটলে এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশের পক্ষথেকে কেন প্রতিবাদ আসবে না।

অধিকাংশ বিশেষজ্ঞই মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পেক্ষাপট বিবেচনা করে বলেছেন যে,গাদ্দাফি,আসাদ বা সালেহে পদত্যাগ  এই অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনতে পারবে না।পশ্চিমাবিরোধী মনোভাব যা শুধু পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলবে।ইতিমধ্যেই মিসরের নতুন প্রশাসন ওয়াশিংটনকে ইরানের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার আহবান জানিয়েছে।বিভিন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে,ফলশ্রুতিতে,যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ বাধ্য হয়ে অনুসন্ধানে নামবে যে কোথায় তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী শত্রু রয়েছে।