পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডি শহরের আদালত রায় দিয়েছে যে, প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি পারভেজ মুশারফ বিচারের আওতা থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন. ২০০৭ সালে বেনজির ভুট্টোর হত্যা সম্বন্ধে পাকিস্তানের এই আদালতে বর্তমানে মামলার শুনানী চলছে. দেশের টেলিভিশন চ্যানেল ডন নিউস জানাচ্ছে যে, আদালতের রায়ে পাকিস্তানে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির সমস্ত স্থাবর সম্পত্তির উপরে এবারে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা জারী করা সম্ভব হবে. বিষয়টি নিয়ে বিশদ করে লিখেছেন আমাদের সমীক্ষক গিওর্গি ভানেত্সভ.

    মার্চ মাসের শুরুতে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন মুশারফকে ধরার একটা চেষ্টা করেছিল. লন্ডনে, যেখানে এখন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি মুশারফ বহাল তবিয়তে বেঁচে আছেন, সেখানে একটা গ্রেপ্তারী পরোয়ানা পাঠানো হয়েছিল ধরে সেই দেশ থেকে পাকিস্তানে পাঠানোর জন্য. কিন্তু গ্রেট(!) ব্রিটেনের সরকার এমনকি এই পরোয়ানা বিচার করে দেখতেও অস্বীকার করেছে, তারা বলেছে দুই দেশের মধ্যে বন্দী বিনিময় সংক্রান্ত কোনও চুক্তি নেই. ইন্টারপোল সংস্থা দিয়ে মুশারফকে গ্রেপ্তার করাও সম্ভব হয় নি. পারভেজ মুশারফ লন্ডনে দিব্যি দিন কাটাচ্ছেন, দেশ বিদেশ সফর করছেন, নানা ধরনের বক্তৃতা ও সাক্ষাত্কার দিয়েই যাচ্ছেন.

    ২০১৩ সালে পাকিস্তানে লোকসভা নির্বাচন হওয়ার কথা, আর পারভেজ মুশারফ ঘোষণা করেছেন যে, তাতে তিনি নিজের তৈরী সারা পাকিস্তান মুসলিম লীগ বলে যে দল তৈরী করেছেন, সেই দলের হয়ে নির্বাচনে অংশ নেবেন. তার পর থেকেই দেশের ক্ষমতাসীন নেতৃত্ব উদ্বিগ্ন ও মুশারফের জন্য হুলিয়া জারী শুরু হয়েছে. এই কথা উল্লেখ করে রুশ রাজনীতিবিদ ও প্রাচ্য বিশারদ ইভগেনি সাতানোভস্কি বলেছেন:

    "পাকিস্তানে বিগত কয়েক দশক ধরে সামরিক বাহিনী ও সমাজের মধ্যে ক্ষমতার জন্য লড়াই চলছে আর রাওয়ালপিন্ডি শহরের আদালতের গ্রেপ্তারী পরোয়ানা ও সম্পত্তি ক্রোক করার আদেশ সেই লড়াই কে আবার করে চালু করেছে. এরই মধ্যে পাকিস্তানের পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে. খুবই দুর্গতির মধ্যে তারা পড়েছে অর্থনৈতিক ও বিনিয়োগ ব্যবস্থায়. ইসলামাবাদ ওয়াশিংটনের চাপে পড়ে একের পর এক অবস্থান হারাচ্ছে. অ্যাবত্তাবাদে মার্কিন নৌ সেনাদের বিনা অনুমতিতে প্রবেশ, "আল- কায়দার" জঙ্গী নেতা ওসামা বেন লাদেনের হত্যা পাকিস্তানের সরকারকে একেবারে কানা গলিতে পৌঁছে দিয়েছে. আমেরিকার রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা ঘোষণা করেছেন যে, এই ধরনের অপারেশন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজনে আবারও হতেই পারে. আর এর অর্থ হল পাকিস্তানের জাতীয় সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ হওয়া. ওয়াশিংটনের চাপে পড়ে পাকিস্তানে সিদ্ধান্ত হয়েছে উত্তর ওয়াজিরস্থানে হাক্কানি তালিব জঙ্গীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার, যা এর আগে পাকিস্তান কখনোই করতে চায় নি".

    এই সবই দেশের মধ্যে খুবই অসন্তোষ তৈরী করেছে, সরকার ও রাষ্ট্রপতি আসিফ আলি জারদারীর মর্যাদা হানি করেছে, দেশের ভিতরে তৈরী হয়েছে চরমপন্থী ঐস্লামিক মনোভাব. জানুয়ারী মাসে পাকিস্তানের পাঞ্জাব রাজ্যের রাজ্যপাল সলমন তসির খুন হয়েছেন, যিনি খোলাখুলি ভাবে দেশের গোঁড়া মুসলমানদের প্রণীত ধর্মের নামে তৈরী আইনের বিরোধিতা করেছিলেন. এর পরে মার্চ মাসে দেশের সংখ্যালঘু দপ্তরের ভার প্রাপ্ত ও গিলানি মন্ত্রীসভার একমাত্র খ্রীস্টান মন্ত্রী শাহবাজ ভট্টি আততায়ীর গুলিতে নিহত হয়েছেন, তিনিও এই গোঁড়া মুসলিম আইনের বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন. মঙ্গলবার ৩১ শে মে পাকিস্তানে খুন হওয়া অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে "এশিয়া টাইমস অনলাইন" নামের ইন্টারনেট সংখ্যার পাকিস্তানের ভার নির্বাহী সাংবাদিক সৈয়দ সালিম শাহজাদার মৃতদেহ, দেহে রয়েছে প্রচুর আঘাতের ও অত্যাচারের চিহ্ন. শাহজাদা কয়েকদিন আগেই প্রকাশ করেছিলেন পাকিস্তানের নৌবাহিনীর নেতৃত্বের সাথে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী "আল- কায়দা" দলের যোগাযোগের তথ্য তাঁর প্রবন্ধে.

    এই সবই পাকিস্তানের লোকেদের ভয় পাইয়ে দিয়েছে, বাধ্য করেছে পারভেজ মুশারফের সময়ের কথা মনে করাতে. এখানে আগ্রহ হয়েছে মুশারফের নূতন দলের তরফ থেকে সমস্ত দুর্নীতি দূর করা, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা, দেশে আইন কানুন ঠিক রাখা নিয়ে নানা ধরনের প্রতিশ্রুতি লক্ষ্য করার. সুতরাং পারভেজ মুশারফকে এখনই মহাফেজ খানায় পাঠানো যাচ্ছে না. তিনি এখনও পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েই রয়েছেন. এখান থেকেই তাঁর সমস্ত দূরবস্থার শুরু.