লা-মানশা বা ইংলিশ চ্যানেলের তীরে গড়ে ওঠা ছোট্র একটি শহর দুভিল। প্যারিসের ধনীরা যাতে প্রাকৃতিক পরিবেশে অবকাশ যাপন করতে পারেন সেই জন্যই ১৯ শতকে এই শহরের গোড়া পত্তন ঘটে।তবে সদ্য বিদায় নেয়া সপ্তাহে এই দুভিলই অনানুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক রাজধানীর খেতাব পেয়েছে।আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সমস্যা নিয়ে আলোচনার জন্য দুভিলে  ছুটে আসেন বিশ্বের প্রভাবশালী ও উন্নতশীল ৮টি দেশের শীর্ষ নেতারা।জি-৮ শীর্ষ সম্মেলনে যে সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে চুড়ান্ত আলোচনা হয়েছে তাতে অংশগ্রহনকারী প্রতিটি দেশই সর্বসম্মতিতে জানায় যে,লিবিয়ার নেতা মুহাম্মর গাদ্দাফির শাসন পুরোটাই বেআইনি।

সম্মেলনের চুড়ান্ত দিনে জি-৮ ভুক্ত দেশগুলোর রাষ্ট্র প্রধানদের নেয়া ২৫ পাতার ঘোষণাপত্র সাংবাদিকদের পড়ে শোনানো হয়।চলতি বছরে অনুষ্ঠিত হওয়া এই সম্মেলনে আরব দেশসমূহ  আলোচনায় সবচেয়ে বেশী স্থান পায়।নেতারা মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় যে রাজনৈতিক ও গনতান্ত্রিক পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে তার পুরোপুরি সমর্থন করেন।শুধুমাত্র কথা দিয়ে সমর্থন নয় বরং এ অঞ্চলকে রাজনীতি ও অর্থনীতি দিক দিয়েও সাহায্যের প্রতিশ্রুতি জানায় তারা।আন্তর্জাতিক বাংকগুলো মিসর ও তিউনেশিয়াকে দুই হাজার কোটি  মার্কিন ডলারের  সাহায্য প্রদানে প্রস্তুত রয়েছে।

দুভিলের এই সম্মলনে‘আরব বিপ্লব’কে ঐতিহাসিক ঘটণা হিসাবে বর্ননা করা হয়েছে।তবে উত্তর আফ্রিকার মানচিত্রে লিবিয়াকে নিয়ে সমস্যা রয়েই গেছে।রাশিয়া এই সংঘাত নিরসনে বেশ কার্যকর ভূমিকাই রাখতে যাচ্ছে।এর কারণ হিসাবে গাদ্দাফি প্রশাসন ও বিদ্রোহীদের সাথে রাশিয়ার যোগাযোগকে মনে করা যেতে পারে।চুড়ান্ত সংবাদ সম্মেলনে  লিবিয়া বিষয়ে মস্কোর মতামত জানান রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ।তিনি বলছিলেন,রাশিয়া সর্বদাই শান্তিময় পথে সমাধান চাচ্ছিল।আমাদের কাছে আলোচনার জন্য বেনগাজির নতুন রাজনৈতিক সংগঠন ও ত্রিপলির একটি  প্রতিনিধি দল আসে।যত দ্রুত সামরিক অভিযান বন্ধ হবে তত তাড়াতাড়িই তা সবার জন্য সুফল বয়ে আনবে;বিশেষ করে যারা লিবিয়ায় বসবাস করছে।আমরা লিবিয়াকে একটি স্বাধীন ও স্বার্বভৌম দেশ হিসাবে দেখতে চাইছি।

উল্লেখ্য,লিবিয়ার আকাশ পথকে “নো ফ্লাই জোন”হিসাবে ঘোষণা দেওয়ার জন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ১৯৭৩ সালের নিষেধাজ্ঞা অনুযায়ী যে ভোটাভুটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল সেখানে রাশিয়া ভোট প্রদানে বিরত থাকে।তবে সম্মেলনে এই বিষয় নিয়ে জি-৮ ভুক্ত দেশগুলোর অন্যান্য নেতাদের কোন বিরুপ মনোভাব প্রকাশ পায় নি।সম্মেলনে সবাই অনেকটা এক সুরেই বলেছেন যে,এই গাদ্দাফির সরে যাওয়া উচিত।

সম্মেলনে সিরিয়া বিষয় নিয়েও আলোচনা করা হয়।যদিও চুড়ান্ত ঘোষণাপত্রে দামাস্ক সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোন কথা উল্লেখ করা হয় নি।সাংবাদিকদের সাথে আলোচনার সময় এই বিষয় কথা বলেন রাশিয়ার সহকারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেরগেই রিয়াকব।তিনি বলেন,রাশিয়া সিরিয়ার নিষেধাজ্ঞার বিরোধী নয় কারণ সিরিয়া পরিস্থিতি লিবিয়া থেকে ভিন্ন।দামাস্ক সরকার পরিবর্তনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে এবং হয়তবা অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধান হবে।

এছাড়া জি-৮ শীর্ষ সম্মেলনে অন্য যে বিষয়টি আলোচনায় বেশ গুরুত্ব পেয়েছে তা হচ্ছে নিউক্লিয়ার নিরাপত্তা ব্যবস্থা।দিমিত্রি মেদভেদেভ দুভিলে এ সংক্রান্ত সুনির্দিষ্টি প্রস্তাব পেশ করেন।যেখানে তিনি উল্লেখ করেন,পারমাবিক কেন্দ্রসমূহের দূর্ঘটনার ঝুঁকি বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে সব দেশ পারমানবিক শক্তি ব্যবহার করে তাদেরকেই এর সমাধানের দায়িত্ব নিতে হবে।নিয়োমিতভাবে চুল্লিসমূহের পরীক্ষা করতে হবে।অংশগ্রহনকারী প্রতিটি রাষ্ট্র নেতাই এই প্রস্তাবকে স্বাগত জানায় এবং সর্বসম্মতিক্রমে তারা উল্লেখ করেন যে, পারমানবিক কেন্দ্র নির্মাণের জন্য  উপযুক্ত স্থান নির্বাচন করা উচিত এবং দুর্ঘটনা মোকাবেলায় সর্বাধিক কার্যকরী পরিবেশ তৈরী করার নিশ্চিত দিতে হবে,যা একই সাথে হতে হবে প্রুযুক্তিগত ও পরিবেশগত।মেদভেদেভ বলছেন,সব সহকর্মীরাই বলেছেন যে,জাপানের ফুকুসিমা-১ পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্রের দুর্ঘটনা ছিল অনেক নাটকীতায় পূর্ণ।তবে কেউই বিকল্প কোন পারমানবিক শক্তির কথা বলতে পারে নি।কয়লা জ্বালানীও খুব কম ব্যবহার করা হয় না,অন্যদিকে সবাই গ্যাস ও জ্বালানী তেলের দাম নিয়ে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করছে।সবুজ প্রযুক্ত সত্যিই আসাধারণ।তবে খুব অল্প সংখ্যক দেশেই তা ব্যবহার করা হচ্ছে।

পারবানবিক বিষয় নিয়ে আরও একটি  প্রশ্নের উত্তর মেলে নি।তা হচ্ছে ইরান।তাদের শান্তিময় পারমানবিক প্রকল্পের অন্তরালে  কোন যুদ্ধের চিন্তাধারা নেই তো?।এমন প্রশ্নের উত্তর দেওয়া খুবই মুশকিল।জি-৮ নেতারা আবারও উল্লেখ করেছেন যে,ইরান জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের নিষেধাজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক পারমানবিক শক্তি সংস্থার শর্তাবলী উপেক্ষা করছে।পারমানবিক নিরাপত্তা বিষয়ে একটি দেশের আইন পরিবর্তনের অধিকার যদিও কারও নেই তবে তা নির্দিষ্টি সীমাবদ্ধের মধ্যে থাকা উচিত।

জি-৮ শীর্ষ সম্মেলনের চুড়ান্ত ঘোষাণাকে ‘শান্তি ও গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হবে নির্বাচন পরিবর্তনের মাধ্যমে’এমনটাই নামকরন করা যেতে পারে।দুভিলের ঐ সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল-‘নতুন পৃথিবী এবং নতুন ভাবনা’।নতুন পৃথিবী তৈরী তো আর দুই দিনেই সম্ভব নয়।তার পরও দুভিলে নতুন পৃথিবী গড়ার জন্য নতুন কিছু চিন্তা-ভাবনার কথা বলা হয়েছে এবং দেয়া হয়েছে সঠিক নির্বাচনের কিছু দিক নির্দেশনা।