সোমবার ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস- আবাবা শহরে ইতিহাসে দ্বিতীয় ভারত- আফ্রিকা শীর্ষবৈঠক শুরু হয়েছে. ভারতের পক্ষ থেকে এক বিশাল প্রতিনিধি দল, যার মধ্যে দেশের নামী ব্যবসাযীরা রয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে নিয়ে এখানে দলের নেতা হিসাবে এসেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ডঃ মনমোহন সিংহ নিজে.

   পশ্চিমের দেশ গুলি এর মধ্যেই অনেকে এই শীর্ষ বৈঠককে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর বলে নামকরণ করে ফেলেছেন, আফ্রিকা মহাদেশে প্রভাব বিস্তার নিয়ে ভারত ও চিনের মধ্যে সুদূর প্রসারিত লড়াইয়ের (scramble) নতুন অধ্যায় বলে মনে করে, যা উনবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বের বৃহত্ সাম্রাজ্যবাদী দেশ গুলি মহাদেশে প্রভূত্ব অর্জনের জন্য করেছিল, সেই রকমের কাজের সঙ্গে তুলনা করে.

   এটা সত্য যে, বর্তমানে চিন আফ্রিকার সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক সহকর্মী দেশ, যদি এই মহাদেশকে একটি একক অঞ্চল বলে মনে করা হয় তা হলে. আফ্রিকা মহাদেশের সঙ্গে চিনের ব্যবসার পরিমান বিগত দশ বা তার থেকে কিছু বেশী সময়ে ১৯৯৯ সালের ২ বিলিয়ন থেকে ২০১০ সালে ১১০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে. এটা আফ্রিকার বিশ্বের যে কোন পশ্চিমের ব্যবসায়িক সহযোগী দেশ – তা সে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই হোক বা পুরনো সাম্রাজ্য বাদী প্রভুই হোক না কেন – তার থেকে বেশী.

   ভারতের অবস্থান এখানে কিছুটা বিনীত, কিন্তু এখানেও যৌথ ব্যবসায়ের পরিমান দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে বর্তমানে তা বছরে ৪৬ বিলিয়ন ডলার হয়েছে, আর ২০১৫ সালের মধ্যে এই সূচক বছরে ৭০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে.

   কিন্তু এখানে সংখ্যা মনে হয় খুব একটা প্রধান নয়, এই কথা মনে করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক সম্পর্ক ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:  

   “এখানে আরও গুরুত্বপূর্ণ হল যে, দেখা দরকার ভারত কোন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করছে. আর এটা প্রাথমিক ভাবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে উন্নত ক্ষেত্র গুলি. আর এখানে ভারতের বহু সুযোগ রয়েছে. এটা যেমন নিজেদের দেশে বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিষয়ে উন্নতির স্তর, তেমনই সেই সত্য যে, বহু সংখ্যক আফ্রিকার বিশেষজ্ঞ ভারতের বিশ্ববিদ্যালয় গুলিতে উচ্চ শিক্ষা পেয়েছে”.

   তাছাড়া ভারতের আফ্রিকার সঙ্গে সম্পর্ক বহু যুগের ও ঘনিষ্ঠ, আর এই মহাদেশের বিভিন্ন দেশে ভারতীয় বংশোদ্ভূত লোকেদের সংখ্যা প্রচুর, দশ লক্ষের কম নয়. বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই এই লোকেরা খুবই প্রভাবশালী, বিশেষতঃ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে. সুতরাং ভারতের অবস্থান সম্পর্কে এখানে শক্তিশালী, এই কথা মনে করেন বরিস ভলখোনস্কি.

   চিনের মতই ভারত খুবই দ্রুত উন্নতি করেছে – এটি বিশ্বের একটি অন্যতম দ্রুত উন্নতিশীল অর্থনীতি. চিনের মতই ভারতও খুবই প্রয়োজন বোধ করেছে জ্বালানী শক্তি ও ধাতব কাঁচামালের, যা আফ্রিকাতে রয়েছে বিপুল পরিমানে. অর্থাত্ এখানে অবশ্যই নির্শতে বলা যেতে পারে যে, প্রতিযোগিতার উপযুক্ত পরিবেশ রয়েছে. তার ওপরে ভারতের জন্য আফ্রিকা – এটা শুধু অর্থনৈতিক ভাবে সহযোগী মহাদেশ নয়. এই মহাদেশের কাজে সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার জন্য ভারত নিজেকে বিশ্বের একটি উপরের সারির প্রভাবশালী দেশ হিসাবে প্রমাণ করতে পেরেছে, আর তার অর্থ হল, তাদের বহুদিনের প্রধান লক্ষ্যের দিকে আরও একটি পদক্ষেপ করা – রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য দেশ হওয়া.

   কিন্তু তাও, বোধহয়, ভারতের সরকারি মুখপাত্ররাই ঠিক, যাঁরা বলছেন যে, এই পরিস্থিতির বর্ণনার জন্য “আফ্রিকার জন্য লড়াই” বলে সংজ্ঞা দেওয়া ঠিক হচ্ছে না. ভারতীয় প্রতিনিধি দলের একজন সদস্য যেমন বলেছেন, “আফ্রিকা – এটা হল উন্নতির মেরু... আফ্রিকার রয়েছে অর্থনীতিতে প্রচুর উন্নতি করার মতো ক্ষেত্র. এটা – মহাদেশ, যারা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে চলেছে. এটা আমাদের জন্য সম্ভাবনার পথ খুলে দিয়েছে, তেমনই খুলে দিয়েছে সারা বিশ্বের জন্যই সম্ভাবনার দিগন্ত”.

("Africa is a growth pole for the future… Africa has tremendous economic potential. It is a continent on the move. For us, it is an opportunity and, for the rest of the world also, it is an opportunity.")

0    সুতরাং জায়গা সবার জন্যই এখানে যথেষ্ট রয়েছে, যারা খুবই মনোযোগ দিয়ে বিশ্বের এই সম্ভাবনাময় এলাকার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরী করতে চান. আর তাই এখানে প্রতিযোগিতাও, যখন বহু দেশ ও বহু কোম্পানীর ব্যবসায়িক স্বার্থের মধ্যে সংঘাত লাগে, তখন তো মনে হয় না যে খুব একটা নির্দিষ্ট কারণ হতে পারে. এখানে প্রতিযোগিতার মতই বহু ক্ষেত্রে রয়েছে সহযোগিতার সম্ভাবনা – তার মধ্যে আফ্রিকার গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক সহকর্মী দেশ হিসাবে ভারত ও চিনের সহযোগিতাও রয়েছে. আর অন্ততঃ সেই ক্ষেত্রে “লড়াই” বলা বোধহয় যায় না.