রাষ্ট্রসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এক রিপোর্ট পেশ করেছে, যাতে বলা হয়েছে যে, প্রতি বছরে বিশ্বে একশো কোটি টনের উপরে খাবার ফেলে দেওয়া হচ্ছে. এতটা খাবারে বিশ্বে সেই সমস্ত লোকেদের খেতে দেওয়া যেতো, যারা না খেতে পেয়ে আছেন. রাষ্ট্রসংঘের বিশেষজ্ঞরা সাবধান করে দিয়েছেন যে, এই রকমের দায়িত্ব জ্ঞান শূণ্য ভাবে খাবার জিনিস নিয়ে কাজ করলে নতুন সঙ্কট শুরু হতে পারে.

খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, একশো তিরিশ কোটি টন খাবার, যা প্রতি বছরেই ভ্যাটে ফেলে দেওয়া হচ্ছে, - তা সারা বছরে বিশ্বে যত খাওয়ার জিনিস উত্পাদিত হয়, তার ঠিক একের তৃতীয়াংশ. রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই ক্ষতির দুটি কারণ রয়েছে. প্রথম – উত্পাদনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোর অভাব তা সংরক্ষণের জন্য, আর সেই বিষয়ে বেশীর ভাগ সমস্যাই রয়েছে উন্নতিশীল দেশ গুলিতে. এক্ষেত্রে ক্ষতির পরিমান তেষট্টি কোটি টন. দ্বিতীয় কারণ হল, - অতুলনীয় বিশাল পরিমানে খাদ্য থেকে উত্পন্ন বর্জ্য পদার্থ, যা উত্পাদিত হয়ে চলেছে উন্নত দেশ গুলি থেকে. এক্ষেত্রে প্রায় সত্তর কোটি টন খাবার ফেলে দেওয়া হচ্ছে. এই ভাবে, গরীব ও ধনী দুই ধরনের মানুষই বিশ্বে খাওয়ার জিনিসকে নিয়ে নয়ছয় করছে.

রাষ্ট্রসংঘের বিশেষজ্ঞেরা এই সমস্যার সমাধানের উপায় হিসাবে প্রাথমিক ভাবে তথাকথিত ধনী শত কোটি লোকেদের খাদ্যাভাস পাল্টাতে বলেছেন. এই রকমের পথের সঙ্গে একমত রুশ বিজ্ঞান একাডেমীর অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের কৃষি সম্পর্ক বিভাগের প্রধান বরিস ফ্রুমকিন, তিনি বলেছেন"

"সত্যই উন্নত দেশ গুলিতে তার মধ্যে ইউরোপীয় সংঘের দেশগুলিও রয়েছে, অনেকটা খাবারই, যা খাওয়া যেতে পারত, তা ফেলে দেওয়া হয়ে থাকে. নাগরিকেরা বেশী করে কিনতে অভ্যস্ত – তাদের বড় বিপনি গুলিতে বেশী করে কিনতে প্রভাবিত করা হয়ে থাকে: "তিন কিলো কিনলে – সস্তা হবে", এই সব রকম ভাবে. এখন ইউরোপীয় সংঘে, যেহেতু সেখানে খাদ্য দ্রব্যের প্রশ্ন বর্তমানে বেশী করে অর্থবহ হয়ে উঠছে, তাই সঞ্চয়ের ব্যবস্থাও করা হতে শুরু হয়েছে. মনে করা যাক, সেই সমস্ত জিনিস, যা এখনই বিক্রীর জন্য তৈরী করা হয়েছে, অথচ কেউ তা কেনে নি, তা খুবই কম দামে বিক্রী করে দেওয়া হচ্ছে, অথবা দাতব্য সংস্থায় দিয়ে দেওয়া হচ্ছে. তাছাড়া বড় বিপনি গুলির ব্যবস্থায় এই রকম সমস্ত পদ্ধতি আনা হচ্ছে, যাতে তারা বেশী করে বাড়তি জিনিস কিনতে প্রভাবিত না করে. আর এখন প্রায়ই এই ধরনের স্লোগান শুনতে পাওয়া যাচ্ছে যে, "তিনটে টিন দুটির দামে কিনবেন না", বরং তার বদলে – "বাড়তি জিনিস কিনবেন না". তাছাড়া ব্যবহার ও ভোগের ধরনে পরিবর্তনের বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, যেখানে বেশী করে স্থানীয় ভাবে উত্পাদিত জিনিসের উপরে নজর দিতে বলা হচ্ছে, যাতে আমদানী করতে না হয়. বলতে পারা যায়, গ্রেট ব্রিটেনে যেমন নিজেদের দেশেই সব্জী ও ফলের উত্পাদন করার একটা হুজুগ তোলা হয়েছে. অর্থাত্ এখনই একটা নির্দিষ্ট রকমের খরচ কমানোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে".

খাদ্য সঙ্কট কমানোর দ্বিতীয় রাস্তা যা, খাদ্য ও কৃষি সংস্থা প্রস্তাব করেছে, তা হল, উন্নতিশীল দেশ গুলি থেকে রপ্তানীর বিষয়ে ব্যবস্থা ভাল করা, আর তারই সঙ্গে স্থানীয় চাষীদের সাহায্য করা, যাতে তারা সরাসরি ক্রেতাদের কাছে পৌঁছতে পারে. এই ভাবেই, খাবার জিনিস, সংরক্ষণ, পরিবহন ইত্যাদির সময়ে ব্যবস্থা নিলে ক্ষতি কমানো কয়েক গুণ কমানো সম্ভব হয়. বরিস ফ্রুমকিন আরও একটি সমাধানের কথা বলেছেন:

"বোধহয় ভাল হয় আমদানী কমানোর, যে সমস্ত জিনিস উন্নত দেশ গুলিতে খুবই বেশী করে খাওয়া হয়, সেই গুলি যদি উন্নতিশীল দেশ গুলি থেকে আমদানী করা কমানো যায়, তবে সেই সমস্ত দেশের কৃষকেরা উত্পন্ন করবেন এমন জিনিস. যা তাদের দেশের ভিতরের প্রয়োজনে লাগে, অর্থাত্ কম করে রপ্তানীর উপযুক্ত একই ধরনের জিনিসের চাষ করা, যেমন ফল বা মশলা, বরং তার বদলে বেশী করে প্রয়োজনীয় স্টেপল্ ফুড তৈরী করা, যেমন: দানাশষ্য, ডাল, আলু ইত্যাদি".

কিন্তু শুধু নিয়ন্ত্রণ দিয়েই পরিস্থিতি বদলানো যাবে না. এই সব কাজের সঙ্গে উন্নতিশীল দেশ গুলিকে আর্থিক ভাবে সহায়তা করতেও হবে, এই কথা উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞ বলেছেন:

"পশ্চিমের দেশগুলিতে কোন রকমের সঞ্চয় করেই সমগ্র বিশ্বের লোককে খাওয়ানো সম্ভব নয়. বর্তমানে বিশ্বের জন সংখ্যা সাতশো কোটি ছুঁয়েছে. এই সমস্যার সমাধানের জন্য অনেক বছর ও অনেক সহস্র কোটি ডলার অর্থের প্রয়োজন. কিন্তু বর্তমান অবস্থায় এই বিষয়ে একটা সমাধানে আসা যেতে পারে যদি উন্নত দেশ গুলিতে সংরক্ষিত খাদ্যের পরিমান বাড়ানো হয়. তারপরে সেই খাদ্য বিশ্বের বাজারে পৌঁছে দিয়ে তাকে স্থিতিশীল করলে. বর্তমানে এই রকমের একটা পরিকল্পনা পেশ করেছেন অর্থনৈতিক ভাবে কুড়িটি উন্নত দেশের মধ্যে সভাপতিত্বের পদে থেকে ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি নিকোল্যা সারকোজি. উন্নতিশীল দেশগুলিতে অনেক বিশেষ ধরনের প্রকল্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় সংঘ নিয়েছে কৃষি উত্পাদন বৃদ্ধির জন্য, রাশিয়া এই রকমের বহু তীক্ষ্ণ পরিস্থিতিতে মানবিক সাহায্য দিয়ে চলেছে. এই প্রসঙ্গে আফ্রিকার দেশ গুলি ও বহু এশিয়ার দেশেই সরাসরি বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে, অংশতঃ, রাষ্ট্রসংঘের বর্তমানের সংস্থা গুলির মাধ্যমে".

খাদ্য কৃষি সংস্থার বিশেষজ্ঞরা সাবধান করে দিয়েছেন: সমস্ত প্রস্তাব গুলিকে কার্যকরী করার জন্য সময় বড় কম রয়েছে. এই ক্ষেত্রে ঢিলে হলে শুধু সারা বিশ্ব জুড়ে দুর্ভিক্ষই হবে না, বরং তা আরও বড় আকার নিতে পারে বিশ্বের পরিস্থিতি পাল্টানোর বিষয়ে. কারণ বর্তমানে ঘটা উত্তর আফ্রিকায় বিপ্লবের একটি অন্যতম কারণ – খাদ্য দ্রব্যের দাম বৃদ্ধি, যা তার অভাবের জন্যই হয়েছে.