আগে যতটা ভাবা হয়েছিল, তার থেকেও তাড়াতাড়ি আর্কটিকা (উত্তর মেরু) এলাকায় জমা বরফ গলে যাচ্ছে. এই শতকেই বিশ্বের মহা সাগরের উচ্চতা দেড় মিটার নাকি বেড়ে যেতে পারে. এই রকমের একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন "আন্তর্জাতিক আর্কটিক পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ণ প্রকল্পের" বিশেষজ্ঞরা.

    প্রসঙ্গতঃ, বিজ্ঞানীদের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে: এক দল মনে করছেন যে, বরফ গলার জন্য আবহাওয়ার উষ্ণতা বেড়ে গিয়েছে মানুষের দোষে, যাদের শিল্প জাত উত্পাদনের দূষণ পরিবেশকে দূষিত করেছে. অন্যরা ভাবেন যে, এই সমস্ত প্রক্রিয়া যা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, তাতে কিছুই অসাধারণ ঘটনা নেই. পৃথিবী যতদিন রয়েছে, তার মধ্যে বরফ গলে গিয়েছে বহু শত বার. তার ফলে মহাসমুদ্রের জলের প্রবাহের বদল হয়েছে আগেও, ফলে ধরিত্রীর পরিবেশ ও আবহাওয়ারও বদল হয়েছে আগেও. পুরনো বরফের স্তূপ গলে গিয়েছে, একই সময়ে অন্য জায়গায় আবার করে হিম শিলা তৈরী হয়েছে. এই ভাবেই, মানুষের প্রভাবের বাইরে বিশ্বের মানচিত্রের বদল হয়েছে. আর এমনকি যদি আবহাওয়াতে কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাসের পরিমান কমানো সম্ভবও হয়, তবেও এই শতকের শেষে বিশ্বের গড় তাপমাত্রা প্রায় তিন থেকে ছয় সেলসিয়াস বেড়ে যাবে. এই প্রসঙ্গে রাশিয়ার উত্তর ও দক্ষিণ মেরু (আর্কটিকা ও আন্টার্কটিকা) বৈজ্ঞানিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের ভাইস ডিরেক্টর ও মহাসমুদ্র বিজ্ঞানী ভ্লাদিমির সোকোলভ বলেছেন:

    "মানুষের কাজকর্মের প্রভাব যথেষ্ট আঞ্চলিক ও বড় করে দেখলে এখনও ততটা নয় যে, এই ধরনের বিশাল প্রক্রিয়া গুলিতে কোনও রকমের প্রভাব ফেলতে পারে".

    উত্তর মেরু অঞ্চলের হিম শিলার অবনয়ন একেবারেই সে রকম কোন ঘটনা নয় যে, তার ফলে সমস্ত দ্বীপ ও সমুদ্র উপকূলের অঞ্চল জলতলের নীচে চলে যাবে, তাই বৈজ্ঞানিক উল্লেখ করেছেন:

    "উদাহরণের জন্য এক বালতি জল নিয়ে সেটাকে বরফ হতে দিন. আপনারা দেখতে পাবেন যে, তার মধ্যে পরিমান বেড়ে যাবে, কারণ বরফ জলের থেকে হালকা. আর যখন বরফ গলে যাবে, তখন পরিমান আবার আগের মতই হয়ে যাবে, এমনকি কম হতেও পারে কারণ কিছুটা জল বাষ্প হয়ে উবে যাবে. সুতরাং সমুদ্রে ভাসমান হিমশিলা গলে গেলে মহাসমুদ্রের জলের উচ্চতা বাড়বে না. মহা সমুদ্রের জলের উচ্চতা বাড়তে পারে যদি শুধু গ্রীনল্যাণ্ড ও আন্টার্কটিকা অঞ্চলের বরফের স্তর একেবারে গলে যায়".

    এখানে ন্যায়সঙ্গত ভাবে উল্লেখ করা উচিত্ যে আপাততঃ আন্টার্কটিকা অঞ্চলের বরফের চূড়া একই রকম শক্ত হয়ে রয়েছে, আর গ্রীনল্যাণ্ডের বরফ গলার কাজ শুধু শুরু হয়েছে. কিন্তু সেখানে বরফ সম্পূর্ণ গলে যাবে না, এই কথা বিশ্বাস করেন ভ্লাদিমির সোকোলভ. কারণ এই খানে বছরের ছয় মাস সূর্য দিগন্ত রেখার উপরে ওঠেই না, আর তাই বরফের আস্তরণে সব কিছু ঢেকে যাওয়া অবধারিত.

    গরমের সময় সম্বন্ধে যা বলা যেতে পারে, তা হল বর্তমানে প্রতি বছরেই উত্তর হিম সাগরের বেশী করে এলাকা বরফ মুক্ত হচ্ছে. আর যদি স্বাভাবিক আবহাওয়া ও প্রকৃতির পরিবেশ এটা নষ্ট করে, তবে অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষের জন্য তা লাভের হচ্ছে. অংশতঃ, উত্তরের সমুদ্র পথে নিয়মিত বরফ ভাঙ্গা জাহাজের সাহায্য নিয়ে তবেই জাহাজ চলাচল করতে হচ্ছে না, যা এই কাজকে অনেকটাই কম খরচের করেছে.

0     কিন্তু একদল বিশেষজ্ঞ মনে করেছেন যে, এই ব্যাপারের উপরে বেশী নির্ভর করলে চলবে না. আবহাওয়ার প্রকৃতি এখনও খুবই কম বোধগম্য হতে পেরেছে, আর তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া ব্যাপারটা যে কোন মুহূর্তেই উল্টো হয়ে কমে যাওয়াতে পরিনত হতে পারে. মিস্টি জলের বরফ হলে তা অতলান্তিক মহাসাগরের জলের সঙ্গে মিশে যেতে পারে. এর ফলে মহাসমুদ্রের জলের গতি প্রকৃতি বদলে যেতেই পারে ও গাল্ফ স্ট্রীমের দিক বদল হতেই পারে. আমাদের গ্রহে এই রকমের ঘটনা ১৩ হাজার বছর আগে ঘটেছিল. তখন কয়েক শ বছরের জন্য বিশ্বে ঠাণ্ডার রাজত্ব চলেছিল. কবে আবার তা হতে পারে, তা বৈজ্ঞানিকেরা পূর্বাভাস দিতে এখনই তৈরী নন.                       ভাষান্তর – সুমিত সেনগুপ্ত