ওসামা বেন লাদেনকে ধ্বংস করা নিয়ে যত বেশী খুঁটিনাটি খবর সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে, ততই বেশী করে বহু নতুন প্রশ্ন উঠছে এই কাণ্ডের সমস্ত চোখে পড়ার মত অবাক ব্যাপার গুলি দেখে. যেমন, উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে যে, "সন্ত্রাসবাদী নম্বর এক" কে ধরতে যাওয়া লোকেরা তাকে পাকড়াও করতে পেরেছিল নিরস্ত্র অবস্থায়, এই কথা সমর্থন করে আমেরিকার সরকারি প্রতিনিধিরা বলছেন. ওসামাকে আড়াল করতে চেয়েছিল শুধু তার স্ত্রী – কিন্তু তার পায়ে গুলি করা হয়েছিল ও মহিলা মাটিতে পড়ে গিয়েছিলেন. তবে কেন একেবারেই নিরস্ত্র বেন লাদেন কে ধরতে যাওয়া লোকেরা জ্যান্ত অবস্থায় ধরে আনল না? কারণ মনে হয়েছে যে, খুব ভাল করে প্রশিক্ষণ পাওয়া ও ভাল অস্ত্র সজ্জিত বায়ু সেনা দের এটা করতে খুব একটা কষ্ট করতে হত না. এর সঙ্গে আরও যোগ করা যেতে পারে যে, বেন লাদেন এখনও কোন আদালতে তার উপরে আনা অপরাধ গুলির অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয় নি ও শুধু সন্দেহভাজন ব্যক্তিই ছিল.

    এর অর্থ হল বিচারের প্রয়োজন ছিল – আর এই প্রক্রিয়াতে "এক নম্বর সন্ত্রাসবাদী" তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ গুলির সব কটিতেই জন সমক্ষে দোষী প্রমাণিত হতে পারত. আর এতে মনে হয় যে, সবচেয়ে বেশী আগ্রহী হওয়ার কথা ওয়াশিংটনের, যারা পাকিস্তানে বেন লাদেনের প্রাসাদে পাঠিয়েছিল পাকড়াও করে আনার লোক. কিন্তু সবই করা হয়েছে অন্য রকম ভাবে. কেন? এই বিষয়ে "রেডিও রাশিয়াকে" দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে বিশেষজ্ঞ আন্দ্রেই গ্রোজিন তার ধারণা ব্যক্ত করে বলেছেন:

    "বেন লাদেনকে এই কারণে মারা হয়েছে যে ওকে জ্যান্ত অবস্থায় প্রয়োজন নেই. এমনকি সাধারন কোন জবাবদিহি করার সময়ে, বিশেষ কোন দ্রব্য ব্যবহার না করলেও, সে অনেক আকর্ষক তথ্য দিতে পারত. যেমন, আফগানিস্তানে সোভিয়েত সেনা বাহিনীর উপস্থিতির সময়ে কি ভাবে সে সি আই এ সংস্থার লোকেদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত. অথবা সেই সময়ে, যখন ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন সেনা বাহিনী আল- কায়দা দলের সঙ্গে যুদ্ধ করতে যাচ্ছে বলে অনুপ্রবেশ করেছিল, যদিও সেই সময়ে ইরাকে এই দলের কোন অস্তিত্বই ছিল না, তা নিয়ে. অথবা হতে পারে যে, তার করা কিছু অপরাধ, যা বেন লাদেনের হাত রয়েছে বলে মনে করা হয়েছে, তা আসলে তার নামে শুধু লেখা হয়েছে – সে হয়ত আদালতে তা প্রমাণও করতে পারত? এখন আমরা সবাই এ নিয়ে শুধু কল্পনাই করতে পারি.

    বেন লাদেনের ধ্বংস করার মুহূর্ত নিয়ে যা বলা যেতে পারে, তা হল এটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সঙ্গে যোগ করা যেতেই পারে. এখন আমেরিকার লোকেদের চোখে বর্তমানের প্রশাসন বীরের জায়গায় রয়েছে – আর নির্বাচনী প্রসার শুরু করার জন্য এর থেকে ভাল আর কিছু ভেবে বার করা যেতেই পারে না. কিন্তু আরও ব্যাখ্যা রয়েছে. এই নিয়ে দেড় মাস হতে চলল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের শাকরেদ দেশেরা লিবিয়াতে যুদ্ধ করে চলেছে, কিন্তু তাদের পরিকল্পনা মত কিছুই হচ্ছে না. গাদ্দাফি আত্ম সমর্পণ করছে না, আর পশ্চিমের জোটের কাজের উপরে সমালোচনা বেড়েই চলেছে. আর তার উপরে গাদ্দাফির তিন নাবালক নাতির মৃত্যু নিয়ে খুবই কুত্সিত ইতিহাস রচনা করা হয়েছে... বেন লাদেনের ধ্বংস হোয়াইট হাউসের জন্য এই সমস্ত সমস্যা সমাধানের হাতিয়ার হয়েছে. অন্ততঃ কিছুটা হাঁপ ছাড়ার সময় তো পাওয়া গেছে".

    বিশ্লেষকেরা মনে করেন যে, বর্তমানের আল- কায়দা – এটা একক কোন সংগঠন নয়, বরং বলা যেতে পারে একটা শৃঙ্খলা বদ্ধ সংস্থা. সেটা এই সমস্ত আলাদা সংগঠন নিয়ে তৈরী, যেমন, "ঐস্লামিক মাগ্রিবের আল– কায়দা", "আরব উপদ্বীপ অঞ্চলের আল- কায়দা", "দুই নদীর দেশের আল- কায়দা" ইত্যাদি. মনে করা হয়ে থাকে যে, লিবিয়ার বিরোধী পক্ষের জোটেও আল- কায়দার শাখা রয়েছে. এই সমস্ত শাখার একটা সম্মিলিত আদর্শ রয়েছে, কিন্তু তারা কাজ করে থাকে আলাদা ভাবেই. বেন লাদেনের মৃত্যু কি এই শাখা গুলিকে দুর্বল করে দিতে পারবে? তার উত্তরে আন্দ্রেই গ্রোজিন বলেছেন:

    "অন্ততঃ পক্ষে বিগত দুই তিন বছরে ওসামা বেন লাদেন কিছুই সিদ্ধান্ত দেয় নি. সে ছিল প্রতীক মাত্র, চরমপন্থীদের পতাকা বাহী দের জন্য. এখন প্রতীক খসে পড়েছে, কিন্তু এটা মনে হয় না যে, এই আল – কায়দা নাম যাকে দেওয়া হয়েছে, সেই শাখা প্রশাখায় আবদ্ধ সংগঠনের কোন দুর্বল হওয়ার মত কারণ হবে. পড়ে যাওয়া প্রতীক অন্যরা তুলে ধরবে, আসবে নতুন নেতারা. বেন লাদেনের মাথায় চড়বে শহীদের তাজ. আর সন্ত্রাসবাদী কাণ্ড, তা যতই দুঃখজনক হোক না কেন, তা চলতেই থাকবে – সেই নিকট প্রাচ্যে, আর সেই উত্তর আফ্রিকাতে ও বিশ্বের অন্যান্য সমস্ত অঞ্চলেও. কারণ এখানে কোন নির্দিষ্ট লোকের উপরে এটা নির্ভর করছে না, বরং তা হচ্ছে সন্ত্রাসবাদের শিকড় রয়েছে আর্থ- সামাজিক, রাজনৈতিক এই সমস্ত সমস্যার গভীরে, যাকে এখনও সমূলে উত্পাটন করা সম্ভব হয় নি বলে. আর এই সমস্ত সমস্যার সমাধান বেন লাদেন কে মেরেই করতে পারা যাবে না".                 ভাষান্তর – সুমিত সেনগুপ্ত