১লা মে উত্সব পালনের ঐতিহ্যের ইতিহাসের শিকড় বহু গভীরে প্রোথিত. প্রথম থেকেই এই দিনটিতে ভূমি ও নবজন্মের দেবদেবীদের প্রার্থনার দিন হিসাবে পালিত হত. মধ্য যুগে এই উত্সবের মূল অর্থের পরিবর্তন হয়েছিল. নতুন যুগের ইতিহাসে এই দিনটিকে শ্রমিক শ্রেনীর সংহতি ও সংগ্রামের দিবস উপলক্ষেই পালন করা হয়েছে. সর্বাধুনিক কালের মে দিবস এই সবকটি বৈশিষ্ট্যকেই একত্রিত করেছে, যা বহু প্রজাতির বহু কোটি মানুষের উত্সবের দিনে পরিনত হয়েছে.

   বহু যুগ আগেই মানুষ মাঠে চাষ করে বীজ বপনের কাজ শেষ করে আনুষ্ঠানিক ভাবে মে মাসের প্রখম দিনটি পালন করতেন, যাতে তাঁদের বসন্তের এই শ্রম অকারণে নষ্ট না হয়ে যায় ও ভাল ফসল নিয়ে আসে আগামীতে, এই কথা উল্লেখ করে রুশ জাতীয় মানবিক বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ও ঐতিহাসিক সের্গেই কারপেঙ্কো বলেছেন:

   “মানুষের জীবনের সঙ্গে অটুট নির্ভরতায় জড়িত এই কৃষিকার্যের শুরু উপলক্ষে উত্সব স্বাভাবিক ভাবেই বসন্ত কালে হয়েছে. বাস্তবে প্রায় সমস্ত সংস্কৃতিতেই, যে যে দেশেরই হোক না কেন, এটা ছিল খুবই স্বাভাবিক প্রাকৃতিক লোক উত্সব - বসন্তাগমে নতুন চাষের কাজের শুরু হিসাবে. প্রত্যেক প্রজাতির লোকেদের ছিল নিজেদের ঐতিহ্য অনুযায়ী নানা রকমের সংস্কার, নিজেদের লোকগীতি ও নিজেদের মত করে উত্সব পালন. কিন্তু সব গুলিরই অর্থ ছিল একই”.

   রাশিয়াতেও পয়লা মের উত্সবের আগে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবসের সঙ্গে কোন রকমের যোগ ছিল না. ১৮ শতকের আগে এই দিন প্রায়ই ইস্টার উত্সবের দিনগুলির ছায়ায় ঢাকা পড়ে যেত. আর রুশ জার প্রথম পিটারের সময়ে পয়লা মে, অথবা তখন যে রকম নাম ছিল “কোকুই”, তা একেবারে সত্যিকারের উত্সবের মর্যাদা লাভ করেছিল, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার বিজ্ঞান একাডেমীর প্রত্নতত্ত্ব ও প্রজাতি ইতিহাসের বিজ্ঞান কেন্দ্রের কর্মী নিনেল পলিশ্যুক বলেছেন:

“এই ঐতিহ্য গ্রহণ করা হয়েছিল ইুরোপের লোকেদের কাছ থেকে, যারা সেই সময়ে মস্কোর জার্মান বসতি অঞ্চলে থাকতেন. ১৯ শতকের মাঝামাঝি তা বিরাট আকার ধারণ করেছিল. এই উত্সবকে তখন “মের উত্সব” নামে ডাকা হত. প্রথমে এটা ছিল দুই রাজধানীর লোকেদেরই উত্সব, তারপর তা বহু প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছিল. মস্কোতে ১৭৩০ এর দশকে মে মাসের বিশাল মেলা আয়োজন করা হত বিশেষ করে সকোলনিকি এলাকাতেই. (তখন এই জায়গা ছিল শহরের কেন্দ্র থেকে পূর্ব দিকের প্রান্তে যাওয়ার পথের মাঝখানে)”.

যদি মে দিবসকে শ্রমিক সংহতি দিবস ইপলক্ষে পর্য়ালোচনা করতে হয়, তবে তা ১৮৮৬ সালের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘটনার পর থেকেই শুরু হয়েছিল. এই দেশে পয়লা মে ছিল এমন একটি দিন, যেদিন শ্রমিকেরা এক মালিকের কাছ থেকে অন্য মালিকের কাছে কাজ করতে বহাল হতে পারতেন. সেই বছরে ৪০ হাজার শ্রমিক একসাথে আট ঘন্টা কাজের দিনের দাবীতে হরতাল করেছিলেন. এই ঘটনার গল্প করে ঐতিহাসিক সের্গেই কারপেঙ্কো বলেছেন:

“১৮৮৬ সালের ১লা মে কানাডা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক সংগঠনগুলি শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার দাবীতে মিটিংয়ের আয়োজন করেছিল. এই মিছিল ভন্ডুল করতে পুলিশ বাহিনী লাগানো হয়েছিল, তারা কয়েকজন শ্রমিককে মেরে ফেলে. তার উত্তরে শুরু হয়েছিল শ্রমিকদের বিক্ষোভ প্রদর্শন, অরাজকতাবাদীরা বোমা ফাটিয়েছিল, তাতে পুলিশের কর্মীদেরও মৃত্যু হয়েছিল. এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত বলে চারজনকে দোষী সাব্যস্ত করে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল. পরে ১৮৮৯ সালে নিহত এই চার জনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক কংগ্রেস দিনটিকে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস বলে ঘোষণা করে”.

১৮৯০ সালে তখনকার রুশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশ শহরের ১০ হাজার শ্রমিক ১৮৮৬ সালের চিকাগো শহরের মিছিলের উপরে গুলিচালনার স্মৃতিতে হরতাল ও মিছিল ডাকে. এই ভাবেই “বৈপ্লবিক মে দিবসের” শুরু হয়েছিল. যা পরে  সবচেয়ে বেশী মানুষের উত্সবে পরিনত হয়েছিল বিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে, এই কথা উল্লেখ করে প্রত্নতত্ত্ব ও প্রজাতি ইতিহাসের বিজ্ঞান কেন্দ্রের কর্মী নিনেল পলিশ্যুক বলেছেন:

“বৈপ্লবিক মে দিবসের উত্সব জার শাসিত রাশিয়াতে বেশীর ভাগ সময়ে ছিল বেআইনি ও তা হত জঙ্গলে. পাহারাদার রাখতে হত, যাতে পুলিশের নজর এড়ানো যায়. নদীতে নৌকার মধ্যেও মে দিবস পালন করা হত, বৈপ্লবিক মে দিবস পালিত হয়েছে এমনকি জেলের রাজনৈতিক বন্দীদের মধ্যেও এই দিনে বিপ্লবের গান গাওয়া হত, জানলায় লাল জামা, রুমাল বা স্কার্ফ ঝুলিয়ে দেওয়া হতে পারত. ম্যাক্সিম গোর্কির “মা” উপন্যাসে এই সম্বন্ধে বর্ণনা পড়তে পারা যায়”.

বলশেভিক দলের লোকেরা ১৯১৭ সালে রাশিয়াতে ক্ষমতা দখল করার পরে এই উত্সব রাশিয়া ও পরে সোভিয়েত দেশের সরকারি রাষ্ট্রীয় উত্সবে পরিনত হয়েছিল. শেষ বারের মতো শ্রমিক সংহতি দিবসের মিছিল সোভিয়েত দেশে হয়েছিল ১৯৯১ সালের পয়লা মে. তারপর থেকে সরকারি ভাবে এই দিনের নাম দেওয়া হয়েছে “বসন্ত ও শ্রমের দিবস” আর ছুটির দিন হয়ে রয়েছে. পয়লা মে এখনও শ্রমিক সংহতি দিবস হিসাবে বিশ্বের তিরিশটিরও বেশী দেশে পালন করা হয়ে থাকে.