মানবেতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত বিপর্যয়ের প্রতীক হয়েছে ২৫ বছর আগে ইউক্রেনের পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্রের প্রথম নিদর্শন – চেরনোবিল পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্র. চতুর্থ রিয়্যাক্টর ব্লকের বিস্ফোরণ ও ৫০০টি হিরোশিমা বোমার সমান তেজস্ক্রিয় বিকীরণ বহু লক্ষ লোকের জীবনে পরিবর্তন এনে দিয়েছে. রাষ্ট্রসংঘের সাধারন সভার সিদ্ধান্তে ২০০৩ সাল থেকে ২৬শে এপ্রিল দিনটিকে আন্তর্জাতিক তেজস্ক্রিয় বিকীরণে নিহত ও ক্ষতিগ্রস্থদের স্মৃতি দিবস হিসাবে পালন করা হয়ে থাকে.

    এই ২৫ বছর আগে মানবসমাজ সাক্ষী হয়েছিল সেই কঠিন প্রযুক্তি বিভ্রাটের, যা মূহুর্ত মধ্যে সৃষ্টির উত্স থেকে পরিবর্তিত হয়ে ধ্বংসের উত্স হতে পারে. তখন এই বিপর্যয়ের ফলে তেজস্ক্রিয় বিকীরণ এক বিশাল এলাকাতে ছড়িয়ে পড়েছিল. সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল ইউক্রেন, বেলোরাশিয়া ও রাশিয়া – তখনও সোভিয়েত দেশের রাজ্য হয়ে যেগুলি ছিল. বহু দমকল কর্মী ও দুর্ঘটনায় ত্রাণ কর্মী, যাঁরা এই রিয়্যাক্টরের আগুণ নিভাতে ও ফুটন্ত অংশকে ঠাণ্ডা করতে গিয়েছিলেন, তাঁরা প্রথম কয়েক সপ্তাহ ও মাসের মধ্যেই তেজস্ক্রিয় বিকীরণের শিকার হয়ে, তার থেকে উদ্ভূত রোগে প্রাণ দিয়েছিলেন. তার পরেও প্রায় চার হাজারেরও বেশী লোক মারা পড়েছিলেন পরবর্তী কয়েক বছরে. প্রিপিয়াত নদীতে সব মিলিয়ে কাজ করেছিলেন প্রায় ৬ লক্ষ লোক. তাঁদের মধ্যে শুধু ইউক্রেনেই এক লক্ষ লোক – প্রতিবন্ধী. আর্থিক ক্ষতি অপরিসীম, কিন্তু তা কখনোই মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে তুলনীয় হতে পারে না.

    চেরনোবিলের শিক্ষা আজও খুবই বাস্তব, কিন্তু প্রগতিকে – থামিয়ে রাখা যেতে পারে না, এই কথা ঘোষণা করে রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি দিমিত্রি মেদভেদেভ বলেছেন:

    "পরবর্তী কালের ঘটনাক্রম মানব সমাজকে মনে করিয়ে দিয়েছে যে, আমাদের ঢিলে দিলে চলবে না. আর গুরুত্বপূর্ণতম সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দরকার হবে সমস্ত দিক বিচার করে দেখা, যা পরবর্তী কালে নিরাপত্তার পক্ষে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে. আমি অবশ্যই জাপানের "ফুকুসিমা – ১" পারমানবিক কেন্দ্রকে নিয়ে বর্তমানে যে পরিস্থিতি তৈরী হয়েছে তার কথা বলছি. আবার একই সময়ে আমরা প্রগতির পথে এগিয়ে যাওয়াকে থামাতে পারি না. শান্তিপূর্ণ পারমানবিক শক্তি সবচেয়ে কম খরচের আর সব মিলিয়ে পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়ে সবচেয়ে কম ক্ষতিকারক. কিন্তু এই ক্ষেত্রে যে সমস্ত নিয়ম ও নীতি মানা হয়, তা হওয়া দরকার সবচেয়ে উচ্চ পর্যায়ের. প্রসঙ্গতঃ, আমাদের দেশ সেই সময়ে অনেক শিক্ষা নিয়েছে. আর এই ক্ষেত্রে আমাদের দেশের নিয়ম ও নীতি বিশ্বে সবচেয়ে উচ্চ স্তরের, এমনকি বহু প্রযুক্তিগত ভাবে এগিয়ে থাকা দেশের চেয়েও".

0    রাশিয়া পারমানবিক বিদ্যুত শক্তি যে সমস্ত দেশে ব্যবহার করা হয়, তাদের এই বিষয়ে নিরাপত্তা সংক্রান্ত দায়িত্ব বৃদ্ধির পক্ষে বলেছে. মে মাসে "বড় আট" অর্থনৈতিক দেশের শীর্ষবৈঠকের সময়ে রাশিয়া এই সম্বন্ধে নির্দিষ্ট কর্মসূচী প্রস্তাব করবে. এই প্রসঙ্গে রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি চেরনোবিল পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্রের বিপর্যয়ের ২৫ বছর উপলক্ষে দেশের মানুষের উদ্দেশ্যে তাঁর ভাষণে উল্লেখ করেছেন. এই প্রস্তাবে বলা হয়েছে যে, প্রত্যেক দেশ, যাদের কাছে পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্র রয়েছে, তারা সেখানে বিপর্যয়ের পরিস্থিতি তৈরী হলে খুবই কড়া আইন অনুযায়ী নিরাপত্তা ও সময়মতো ব্যবস্থা গ্রহণ নিয়ে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবে. প্রস্তাব করা হয়েছে যে পারমানবিক প্রকল্প নির্মাণ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিয়ম ও নীতিকে আরও কঠোর করা হবে. সেই গুলি আন্তর্জাতিক আইনের ধারা অনুযায়ী লিপিবদ্ধ করা হবে ও সমস্ত দেশের জন্যই অবশ্য পালনীয় হবে. এই সমস্ত নিয়ম মানা হচ্ছে কিনা, তা নিয়ন্ত্রণ করবে আন্তর্জাতিক পারমানবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ পরিষদ. নতুন পারমানবিক কেন্দ্র গুলি তৈরী করা হবে সবচেয়ে বেশী নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে ও তার সম্বন্ধে তথ্য পাওয়ার নীতি হবে একেবারেই স্বচ্ছ প্রক্রিয়াতে – যা বিশ্বের সমস্ত পারমানবিক কেন্দ্রের ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়াবে, এই কথা রাশিয়ার রাষ্ট্রপতির দেশের মানুষের প্রতি দেওয়া বক্তৃতাতে বিশেষ করে উল্লেখ করা হয়েছে.