রাশিয়ার ৩ জন রাষ্ট্রপতি - বরিস ইয়েলসিন,ভ্লাদিমীর পুতিন ও দিমিত্রি মেদভেদেভ যারা ৩টি প্রাচীন যুগের এবং একই সাথে নতুন একটি রাষ্ট্রের উন্নয়নের ইতিহাস বহন করছেন।ঠিক ২০ বছর পূর্বে ১৯৯১ সালের ২৪ এপ্রিল রুশ ফেডারেশনে রাষ্ট্রপতি পদের আবির্ভাব ঘটে যিনি  রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তির দায়িত্ব পালন করবেন।সর্বসাধারণের চাহিদার কারণেই ১৯৯১ সালের ১৭ মার্চ এই ঘটনার অবতারনা হয়।সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরই রুশিরা মনে করেছেন যে,রাশিয়ার জন্য রাষ্ট্রপতির পদ আবশ্যকীয়।

আধুনিক রাশিয়ার ইতিহাসের বর্নান তার রাষ্ট্রপতি দিয়েই করা সম্ভব।তাদের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের প্রতিটি সময়কাল যেন দেশের উন্নয়ন ও পরিবর্তনের এক একটি যুগ,প্রতিবন্ধকতা উত্তরনের প্রচেষ্টা,উজ্জ্বল ঘটনাবলী ও বিজয়েরই চিত্র ফুটিয়ে তোলে।

রাশিয়ার প্রথম রাষ্ট্রপতি বরিস ইয়েলসিন যিনি বহুমুখী গুণের অধিকারী ছিলেন এবং তার চরিত্রকে যেন পৌরাণিক কাহিনীরা সাথেই তুলনা করা যায়।সবাই যারা তাকে জানত,তারা সবাই বলত যে,তিনি একজন অটল ও সুস্থির স্বভাবের মানুষ ছিলেন।বাল্য বন্ধু ও একই শ্রেনীকক্ষের সহপাঠিদের কাছে তিনি ছিলেন খোলামেলা ও সর্বদা পরোপকারী এক ব্যক্তি।

বরিস ইয়েলসিনের সময়কালে যে সব উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলী রয়েছে তার মধ্যে ১৯৯১ সালের আগষ্ট বৈপ্লবিক অভ্যুত্থানের সূচনা,১৯৯৩ সালে ক্ষমতার প্রয়োগে পার্লামেন্ট ভেঙ্গে দেওয়া ও ১৯৯৮ সালের মন্দা।কিন্তু তার সময়ই নতুন গনতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সংবিধান গৃহিত হয়,জনসাধারন জিনিসপত্র শূন্য দোকানপাট আর মন্দার কথা ভুলে যায়।আজকের দিনে বরিস ইয়েলসিনের কর্মকান্ড সম্পর্কে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলছেন যে,যদি তার মত এমন চারিত্রিক গুনাবলী নেতা ছাড়া অন্য কেউ দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আসত তাহলে দেশের সেই সময়ের দুর্দশা কাটিয়ে ওঠার   সম্ভাবনা খুব কমই ছিল।রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অবসরে যাওয়ার শেষ দিনে জনগনের প্রতি দেওয়া ভাষনে বরিস ইয়েলসন নিজেই নিজের কাজের হিসাব দেন।তিনি বলছেন,আমি অসংখ্যবার শুনেছি যে,ইয়েলসিন যে কোন উপায় দেশ পরিচালানার দায়িত্ব ধরে রাখবে।বিষয়টি সঠিন নয়।আপনাদের জীবন-যাপনকে কিভাবে উন্নয়ন করা যায়,তার চেয়ে বেশি আমার কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল না।আপনাদের সবার কষ্ট আমার হৃদয়কে স্পর্শ করেছে, ঘুমবিহীন রাত কাটিয়েছি আর প্রশ্নবানে জর্জরিত হয়েছি-কি করা উচিত যাতে করে আপনারা ভাল থাকতে পারেন।আমি বুঝেছি যে,নিজের জীবনের প্রধান কাজ আমি করতে পেরেছি।রাশিয়া কখনই আর পিছনে ফিরে যাবে না।রাশিয়া সর্বদা সামনের পথে এগিয়ে যাবে।

১৯৯৬ সালে ২য় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পূর্বে যখন দেশের অর্থনীতির চাকা কেবল সচল হতে শুরু করেছে,বরিস ইয়েলসিন বলেছিলেন-আজ আমার বিকল্প কেউ নেউ,তবে আগামীকাল হবে।তার অনুসারি হলেন ভ্লাদিমীর পুতিন।পুতিনের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের সময়ও খুব একটা সহজ ছিল না,তেমন মনে করছেন কার্যকরী ‘রাজনীতি তহবিল’ এর পরিচালক ক্রিল তানায়েব।তিনি বলছেন,যদি ৯০ দশকের সময়কালকে রাশিয়ার পূর্ণজন্ম হিসাবে ধরা হয় তবে ২০০০ সালে তা রাষ্ট্র হিসাবে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।রাষ্ট্রের ছিল নির্দিষ্ট কিছু নীতিমালা।আমরা শূণ্য থেকে বর্তমানে দ্রুত উন্নয়নশীল একটি দেশে পরিনত হয়েছি।যদিও দেশে পূর্ণ চিন্তাধারা এবং সরকারের হাতে পুরো ক্ষমতা ছিল না।নীতিমালায় ছিল বিশৃঙ্খলার ছাপ।তাছাড়া দেশকে বিভক্ত করার প্রচেষ্টা করা হয়, যা ছিল পুরো দেশের জন্য হুঁমিকিস্বরুপ।এই সব কিছুই ভ্লাদিমীর পুতিনকে মোকাবিলা করতে হয়েছে।

২য় রাষ্ট্রপতি  মধ্য এশিয়ায় ও দক্ষিন ককেশাসে রাশিয়ার ভাবমূর্তি বৃদ্ধি করতে পেরেছেন এবং সেই সাথে বিশ্বে রাশিয়ার ভূমিকার প্রয়োজনীয়তা পূনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।ভ্লাদিমীর পুতিনের পক্ষে তা সহজসাধ্য ছিল না।তার কথার মাঝেই তা প্রকাশ পায়।তিনি বলছেন,পুরো এই ৮ বছরই আমি যেন দাসীর মত সকাল থেকে রাত পর্যন্ত জমি চাষ করেছি।

রাশিয়ার ৩য় রাষ্ট্রপতি দিমিত্রি মেদভেদেভকেও বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে।রাষ্ট্রপতি হিসাবে দায়িত্ব পালনের কয়েক মাস পরই উত্তর কাবকাজে গোলাগুলির সহিংস ঘটনা ঘটে।জর্জিয়ার সেনারা দক্ষিন ওসেটিয়ার ভূখন্ডে হামলা চালায়।এই সব পরিস্থিতির মধ্যে দিমিত্রি মেদভেদেভ নিজেকে একজন বিচক্ষন রাজনীতিবিদ হিসাবে পরিচয় দিয়েছেন।বলছিলেন ক্রিল তানায়েভ।তিনি বলছেন,আগষ্ট মাসের ঐ ঘটনাবলির পরিসমাপ্তির মধ্যে দিয়ে দিমিত্রি মেদভেদেভের অনেক বুদ্ধিমত্তা প্রকাশ পায়।এবং সেপ্টেম্বর শুরু হয় অর্থনৈতিক মন্দা যার মধ্যে এখনও দেশ এগিয়ে চলছে।যদি মেদভেদেভের সময়কে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোন থেকে দেখা হয় তাহলে,এই সময়কালকে অর্থনীতির আধুনিকায়ন  হিসাবে উল্লেখ করা যেতে পারে।বিষয়টি পরিষ্কার ও বোধগম্য,সুতরাং মেদভেদেভের রাষ্ট্রপতি থাকাকালিন সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস বহন করেছে।মেদভেদেভ বলছেন,আমি  বিষয়টি একেবারে উড়িয়ে দিচ্ছি না যে,আমি ২য় বারের জন্য রাষ্ট্রপতি হতে যাচ্ছি।খুব স্বল্প বিষয়ের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।যা নির্ভর করবে সমসাময়িক সামাজিক পরিস্থিতি,রাজনৈতিক কার্যকারিতা এবং সর্বোপরি জনগনের সম্পর্কের ওপর।

অন্যদিকে,ভ্লাদিমীর পুতিনও রাষ্ট্রপতি নির্বাচানে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা একেবার বাদ দিচ্ছেন না।পুতিন বলছেন,আমি অথবা দিমিত্রি আনাতোলিবিচ কেউই এড়িয়ে দিচ্ছি না যে,আমাদের উভয়কেই নির্বাচনে অংশ নেওয়া হতে পারে।নির্বাচনের ঠিক পূর্বেই সময়ের চাহিদা অনুযায়ি আমরা সিদ্ধান্ত নিব।অবশ্যই,এক সময় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।তবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে এখনও প্রায় ১ বছর অবশিষ্ট আছে।

তবে আগামী ২০১২ সালের নির্বাচনে রাশিয়ার দুই জনপ্রিয় রাজনীতিবিদের অংশগ্রহন যা ইতিমধ্যে কিছুটা হলেও বিশাল প্রশ্নের সূচনা করেছে।সামগ্রিক অর্থে দেশের প্রধান নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে সেই ২০ বছর পূর্বে।উপনীত হয়েছে গনতান্ত্রিক রাষ্ট্রপতির প্রথা।