মেক্সিকো উপসাগরে বিপি কোম্পানীর খনিজ তেল নিষ্কাশন কূপে দূর্ঘটনার এক বছর হল. হিসাব মতো জলে ছড়িয়ে পড়েছে প্রায় ৫০ লক্ষ ব্যারেল খনিজ তেল. সরকারি ভাবে মহা সমুদ্রে ও সংলগ্ন তীরবর্তী অঞ্চলে জল পরিস্কার করার কাজ শেষ হয়েছে, কিন্তু পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে, এই ঘটনার কুফল আরও বহু কাল ধরে টের পাওয়া যাবে.

    বিস্ফোরণ হয়েছিল ভাসমান প্ল্যাটফর্ম "ডিপ ওয়াটার হরাইজন" তৈল কূপে আমেরিকার লুইজিয়ানা রাজ্যের তীর থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরে. ১৩০০ মিটার গভীরে নিয়ন্ত্রণ বহির্ভূত এক খনিজ তেলের ফোয়ারার মুখ খুলে গিয়েছিল. পাঁচ মাস সময় খরচের পরে তার সঙ্গে লড়াই করে সাফল্য পাওয়া গিয়েছিল – বিশেষ করে আলাদা কূপ খনন করতে হয়েছিল, যা দিয়ে উপচে পড়া তেল বার করে নেওয়া হয়েছিল ও ফোয়ারার মুখ বন্ধ করতে হয়েছিল. জলের উপর ও তীরবর্তী অঞ্চল থেকে তেল পরিস্কার করতে তার চেয়েও দ্বিগুণ বেশী সময় লেগেছিল.

    আজ বাইরে থেকে কোন কিছুই মেক্সিকো উপসাগরের এই দূর্ঘটনার কথা মনে পড়িয়ে দেয় না. মহা সমুদ্রের জল স্বচ্ছ, তারের বালি পরিস্কার, মাছ ও পাখিদের চেহারাও স্বাস্থ্য সম্মত বলেই মনে হয়েছে. এর ফলে জল ও তীরবর্তী অঞ্চল পরিষ্কারের দায়িত্বে যে সমস্ত বিশেষজ্ঞরা কাজ করছিলেন, তাঁরা তো বলেই দিয়েছেন যে, সব ঠিক হয়ে গিয়েছে. প্রায় সমস্ত উপসাগরীয় অঞ্চল ও তার বেলা ভূমি এখন সকলের জন্য মাছ ধরা ও সূর্য স্নানের জন্য উন্মুক্ত. কিন্তু কেন যেন এখনও এই অঞ্চলে অল্প বয়সী ডলফিন ও কচ্ছপের মহামারী লেগেছে, কাঁকড়া অজানা রঙে রঙীণ, আর সমুদ্রের গভীরে দেখা গিয়েছে "মৃত" এলাকা. পরিস্কার করা হয়েছে শুধু দেখতে পাওয়া যায় এমন এলাকাই, এই কথা উল্লেখ করে বন্য প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থার "পরিবেশ ও জ্বালানী" প্রকল্পের প্রধান আলেক্সেই ককোরিন বলেছেন:

    "খনিজ তেল থেকে হওয়া ক্ষতি দূর করা হয় নি, যা এখন মহাসমুদ্রের গভীরে নিমজ্জিত. কিছু মূল্যায়ণ অনুযায়ী এমন অনেক জায়গা রয়েছে, যেখানে এই তেলের স্তরের উচ্চতা একশো মিটার অতিক্রম করেছে. কিন্তু যদি সেটা একশো মিটার নাও হয়, এমনকি এক মিটারও হয়, তাহলেই সেখানে সমস্ত জীব জগত ধ্বংস হয়েছে. খুবই কম সম্ভাবনা রয়েছে যে, অদূর ভবিষ্যতে এই জলে ডুবে যাওয়া তেল কোন ভাবে সরানো সম্ভব হবে. বোধহয় সেখানে এটা চিরদিনের জন্যই রয়ে গেল. এখানের বা নিকটবর্তী অঞ্চলের  জলতলের পরিবেশ কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কতটাই বা আবার তা নতুন করে ঠিক হবে, এই সব প্রশ্নই যথেষ্ট বিতর্কিত".

    এরই মধ্যে মেক্সিকো উপসাগরে বিপর্যয় আঞ্চলিক থেকে সারা বিশ্বের হয়ে দাঁড়িয়েছে. যা হতে চলেছে জাপানের 'ফুকুসিমা' পারমানবিক কেন্দ্রের বিপর্যয়. এটা বিশ্বজোড়া ক্ষতির দায়ভার নেওয়ার বিষয়ে চিন্তা করার একটা কারণ হয়েছে, যা সারা বিশ্বের ইকো সিস্টেমের ক্ষতির কারণ হয়েছে. কয়েক দিন আগে রাশিয়ার রাষ্ট্রপতির সহকারী আর্কাদি দ্ভরকোভিচ বলেছেন যে, দিমিত্রি মেদভেদেভ "বড় আট" ও "বড় কুড়িটি" অর্থনৈতিক ভাবে উন্নত দেশের সামনে প্রযুক্তিগত বিপর্যয় রোধে বেশ কয়েকটি উদ্যোগ নিতে চান ও এই ধরনের পরিস্থিতি ঘটলে পারস্পরিক সাহায্যের বিষয়ে বক্তব্য রাখতে চান. পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ে বিপদ – এমন কোন ঘটনা আর নয় যে, প্রত্যেকেই শুধু নিজেদের জন্য করবে.

    আপাততঃ মেক্সিকো উপসাগরের দূর্ঘটনা নিয়ে সমস্ত রকমের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে শুধু কথায়, কাজে নয়. এই বিষয়ে আদালতে মামলা তোলা হবে শুধু ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে, তখনই পরিস্কার করে বোঝা সম্ভব হবে কে এই ট্র্যাজেডির জন্য দায়ী আর তা নিরোধ সম্ভব ছিল কি না. এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার বিজ্ঞান একাডেমীর খনিজ তেল ও গ্যাস সংক্রান্ত সমস্যা ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর আনাতোলি দিমিত্রিয়েভস্কি বলেছেন:

    "এই বিপর্যয়ের অনেক কারণ দর্শানো হয়েছে. কিন্তু আমার মতে এই জায়গায় খুবই বিরল প্রবল চাপ যুক্ত খনিজ তেলের স্তর ছিল, যা কূপ খননের সময়ে হিসাবে আনা হয় নি, তেল তোলার স্তরের কাছে পৌঁছনোর সময়ে বিচার করা হয় নি. অবশ্যই সমস্ত তেল উত্পাদক কোম্পানী এর থেকে নিজেরা শিক্ষা নিয়েছে. সামাজিক দাবীতে বেশ কিছু সরকার সমুদ্র ও মহাসমুদ্রের খনিজ তেল ও গ্যাস উত্পাদক কোম্পানী গুলির প্রতি নিয়মের বাধ্য বাধকতা বাড়িয়েছে. কিন্তু আবার কখনও এই ধরনের দূর্ঘটনা ঘটবে না, এমন গ্যারান্টি কেউ দিতে পারছে না".

    তার চেয়েও বড় কথা হল, তেলের কোম্পানীরা কিন্তু এই বিপর্যয় থেকে প্রয়োজনীয় শিক্ষাকে অনুধাবন করেনি, এই কথা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় সম্পদ পরিষদের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক সহকর্মী রেগান নেলসন উল্লেখ করে বলেছেন:

    "একটা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা তৈল কূপে বিস্ফোরণ হলেই সঙ্গে সঙ্গেই কাজ করবে ও তেল উপচে পড়া বন্ধ করবে, তার হিসাব ঠিক করে করা হয় নি. গত এক বছরে কিছুই করা হয় নি, যাতে এই ব্যবস্থার কিছু একটা উন্নতি করা সম্ভব হয়, একই ব্যবস্থা এখনও সমস্ত কার্যকরী কূপেই রয়েছে".

0     এরই মধ্যে গত বছরের অক্টোবর মাস থেকেই মেক্সিকো উপসাগরে আবার করে তেল উত্পাদন করা শুরু হয়েছে. গত কয়েকদিন আগে বিপি কোম্পানী সেখানে দশটি কূপে কাজ চালু করার অনুমতি পেয়েছে. তা বোধগম্য – কারণ এই অঞ্চলে বিরাট এক অংশ খনিজ তেল উত্পাদন করা হয়ে থাকে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন. এটা বারণ করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়.