"আজকের দিনটি স্মরণীয় হবে. অনেক কিছুই শেখাবে", – লিখেছিলেন বিখ্যাততম রুশ লেখক ও শিল্পী নিকোলাই রোয়েরিখ ১৫ই এপ্রিল ১৯৩৫, যখন ২০টিরও বেশী দেশ তাঁর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ সংক্রান্ত তৈরী দলিল গ্রহণ করেছিল. তারপর বহু বছর চলে গিয়েছে, আর "রোয়েরিখ চুক্তি" স্বাক্ষরের দিনটি, ১৫ই এপ্রিল, আন্তর্জাতিক সংস্কৃতি দিবস বলে উদযাপিত হয়েছে.

    "রোয়েরিখ চুক্তির" গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ছিল – "সামরিক প্রয়োজনের আগে সাংস্কৃতিক মূল্যায়নে জরুরী বিষয়ের সংরক্ষণ". এই ইতিহাসে প্রথম আইন সঙ্গত ভাবে "শিল্প, বৈজ্ঞানিক সংস্থা ও ঐতিহাসিক স্মৃতি বিজড়িত জায়গাকে সংরক্ষণের" জন্য চুক্তি, ছিল "সাংস্কৃতিক মূল্যবান জিনিসের সামরিক বিরোধের সময়ে সংরক্ষণ" সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশনের ভিত্তি, যা পরবর্তী কালে রাষ্ট্রসংঘ গ্রহণ করেছিল.

    "রোয়েরিখের চুক্তিকে" প্রায়শই "শান্তি চুক্তি" বলা হয়ে থাকে. অবশ্যই তা বহুলাংশে যুদ্ধকালীণ সাংস্কৃতিক বিষয় সংরক্ষণের জন্য করা – যা নিয়তই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে, আর তা সম্বন্ধে নিকোলাই রোয়েরিখ খুবই ভাল করে জানতেন. শিল্পী নিজেই সাক্ষী ছিলেন বিংশ শতকের শুরুতে রুশ – জাপান ও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের. কিন্তু এখানে গুরুত্বপূর্ণ হল যে, সাংস্কৃতিক স্মৃতি বিজড়িত জায়গা গুলির কোন পক্ষের না হওয়া – বাস্তবে এই গুলির যুদ্ধের সময়েও শান্তিতে অবস্থান. তার উপরে রোয়েরিখ প্রস্তাব করেছিলেন শান্তির জন্য এক বিশেষ পতাকার – সাদা জমিতে কেন্দ্রে বৃত্ত ও তার ভিতরে আরও তিনটি লাল বৃত্তের আকার: অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের মানব সমাজের সাফল্য অনন্তের বৃত্তের আধারে. তিনি প্রস্তাব করেছিলেন যুদ্ধের সময়ে এই প্রতীক দিয়ে সাংস্কৃতিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস গুলিকে চিহ্নিত করার.

    "শুধু সাংস্কৃতিক ভাবে মূল্যবান জিনিসেরই নিঃশর্ত সংরক্ষণের কথাই "রোয়েরিখ চুক্তি" বলে নি – এই কথা মনে করে ঐতিহাসিক ও দার্শনিক ল্যুদমিলা শাপোশনিকোভা প্রস্তাব করেছেন রোয়েরিখের দেওয়া শিক্ষা – জীবন্ত মূল্যবোধ – মানুষের বিশ্ব সৃষ্টির সঙ্গে বিবর্তনের যোগ সংক্রান্ত অবস্থান থেকে চুক্তিকে দেখার. "সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের নিদর্শন ও তার সৌন্দর্য্যের মধ্যে এক অন্তর্নিহিত শক্তি রয়েছে, যা সাংস্কৃতিক পরিসরের জন্য প্রয়োজন", - ল্যুদমিলা শাপোশনিকোভা মনে করেন এইটি রোয়েরিখের শুরুর অবস্থান".

    "যদি সৌন্দর্য না থেকে – তাহলে এই শক্তিও থাকবে না, যা আমাদের গ্রহ ও মানব সমাজের প্রয়োজন. আর যখন যুদ্ধ ধ্বংস করে, সাংস্কৃতিক নিদর্শনকে জ্বালিয়ে দেয়, আমাদের বিবর্তনের উপরে এর ফলে সংশোধনের অযোগ্য ক্ষতি হয়ে যায়. চুক্তি এই কারণেই তৈরী করা যে, যাতে শুধু আমাদের সংস্কৃতি সংরক্ষিত না হয়, বিবর্তনের ফল ও হয়. প্রতিভাশালী রুশ লেখক ফিওদর দস্তয়েভস্কি একটি বিখ্যাত বাক্য লিখেছিলেন – "সৌন্দর্যই বিশ্ব ত্রাণ করবে". নিকোলাই রোয়েরিখ তার সঙ্গে যোগ করেছেন "সৌন্দর্যের বোধই বিশ্বের পরিত্রাণ করবে". অর্থাত্ বিশ্বের পরিত্রাণ এই বোধই করতে পারে যে, যদি আমরা প্রাচীন ঐতিহ্যের ও বর্তমানের সমস্ত নিদর্শকে এই ভাবে ধ্বংস করতে থাকি, তবে আমাদের ভবিষ্যতও কিছু থাকবে না. "রোয়েরিখের চুক্তি" শুধু স্মৃতি সৌধ বা নিদর্শনকেই রক্ষা করে না, আমাদের ভবিষ্যতকেও রক্ষা করে".

    দুঃখের বিষয় হল এই চুক্তি সত্যিকারের সংরক্ষণের দলিল হতে পারে নি, যদিও একেবারে শুরু থেকেই বিশ্বের সমস্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এর পক্ষেই ছিলেন, মানবিকতা বাদী: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, টমাস মান, রোমাঁ রোলাঁ ও বহু বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক, যাঁদের মধ্যে ছিলেন আলবার্ট আইনস্টাইন ও. সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বহু নিদর্শন তা স্বত্ত্বেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শিকার হয়েছে, এমনকি আমাদের বর্তমান সময়েও এই বর্বরতা দেখা গিয়েছে বিশ্বের বহু জায়গায়, যেখানে আঞ্চলিক যুদ্ধ ও সশস্ত্র বিরোধ চলছে. সের্ব আলবানিয়ার মধ্যে বিরোধের শিকার হওয়া কোসভার প্রাচীনতম অর্থোডক্স গির্জার ধ্বংসাবশেষের মধ্যে কি রকমের "সাংস্কৃতিক পরিসরের শক্তি" অনুভূত হতে পারে? অথবা দক্ষিণ অসেতিয়ার রাজধানীর প্রান্তে, যেখানে ২০০৮ সালে জর্জ্জিয়ার আগ্রাসনের ফলে ধ্বংস হয়েছে আমাদের যুগের তৃতীয় খ্রীস্টাব্দের প্রাচীন শহরের অস্তিত্ব. ঠিক ছিল তা সংরক্ষিত এলাকা বলে ঘোষণা করা হবে, কিন্তু এই আগ্রাসনের পরে আর সংরক্ষণের উপযুক্ত কিছুই রইল না! ইরাকের কিছু সময় আগের যুদ্ধে যেখানে বাগদাদের যাদুঘর লুন্ঠনকে সহায়তা করা হয়েছিল, বর্তমানে প্রায় শূণ্য. এই তো কদিন আগেই "কমলা বিপ্লবের" তোড়ে মিশরের রাষ্ট্রীয় যাদুঘরের পরিণতিও তাই হতে চলেছিল. আর এখন গৃহযুদ্ধে নিমগ্ন লিবিয়াতে অতি মূল্যবান প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের উপরে ধ্বংসের বিপদ রয়েছে. যদিও অবশ্যই ইউনেস্কোর সংরক্ষণের কথা এখানে বলা হয়েছে, কিন্তু যখন একজন লোক আরেক জনকে হত্যা করে, তখন সে সবচেয়ে কম ভাবে বিশ্ব ঐতিহ্যের নিদর্শনের কথা...

    "রোয়েরিখ চুক্তি" বর্তমানে কাজ করছে না. কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, রোয়েরিখের আদর্শের দিকে চলার আহ্বান তার অর্থ হারিয়েছে. তার বাণীকে ভুললে চলবে না: "আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক দিবসকে সমর্থন করবে সেই দিন, যেদিন সমস্ত শিক্ষা সমাজে একই সঙ্গে সজ্ঞানে মানব সমাজের সত্যিকারের সম্পত্তিকে মনে করা হবে". ১৫ই এপ্রিলকে "শান্তির পতাকা তলে বিশ্ব সংস্কৃতি দিবস" হিসাবে পালন করার উদ্যোগ বর্তমানে ১১টি দেশ সমর্থন করেছে, তার মধ্যে রাশিয়াও রয়েছে.