১২ই এপ্রিল সারা বিশ্বের রেডিও তরঙ্গের শ্রোতারা মহাকাশ থেকে ইউরি গাগারীনের কন্ঠস্বর নিজেদের যন্ত্রে শুনতে পাচ্ছেন. ঐতিহাসিক ধ্বণির রেকর্ডিং ও তার মধ্য গাগারীনের বিশ্ব বিখ্যাত "চলো যাই!" পৃথিবীর কক্ষপথ থেকে ছোট উপগ্রহ "কেদর" সম্প্রচার করছে. এই উপগ্রহের নাম দেওয়া হয়েছে বিশ্বের প্রথম মহাকাশচারীর পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগের সাঙ্কেতিক নাম থেকে.

    ১২ই এপ্রিল ১৯৬১ সালে যখন মহাকাশযান 'ভস্তক – ১' কক্ষপথে পৌঁছেছিল, তখন গাগারীন বলেছিলেন: "আমি দিগন্ত দেখতে পাচ্ছি, পৃথিবীর দিগন্ত যেন ভেসে যাচ্ছে. কিন্তু আকাশে তারা দেখতে পাচ্ছি না. পৃথিবীর পৃষ্ঠ, মাটি আমার জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছে. আকাশের রঙ কালো, আর পৃথিবীর সীমানায়, দিগন্তের চারপাশ জুড়ে কি সুন্দর নীল আভা, পৃথিবী থেকে দূরে সরে গিয়ে তা আরও ঘন রঙের".

    পরে বিশ্বের প্রথম মহাকাশচারী তারা দেখতে পেয়েছিলেন. বিশেষ করে তাঁকে মুগ্ধ করেছিল একটি ছোট্ট তারা, যা তার জানলার পাশ দিয়ে যেন উড়ে চলে গিয়েছিল. মহাকাশচারী বলছেন, - "তারা দেখতে পাচ্ছি...খুবই সুন্দর দেখাচ্ছে. বিশ্বের ছায়ায় আমার যান উড়েই চলেছে, আমার ডানদিকের জানলা বরাবর একটা তারা দেখতে পাচ্ছি, সেটা যেন বাম দিক থেকে ডান দিকে চলে যাচ্ছে. তারাটা চলে গেল, এই চলে যাচ্ছে, যাচ্ছে..."

    ১০টা বেজে ২৩ মিনিটে গাগারীন খবর দিয়েছেন যে তাঁর উড়ান নির্বিঘ্নে ঘটছে, তাঁর ভালই লাগছে, সমস্ত যন্ত্র ব্যবস্থা সঠিক ভাবেই কাজ করছে. এর পরেই তাঁর রেকর্ডিং স্তব্ধ হয়ে যায়. আধ ঘন্টা পরে মহাকাশচারী সাফল্যের সঙ্গে মাটিতে নেমে আসেন.

    এই ঐতিহাসিক ধ্বণি রেকর্ডিং ছাড়া 'কেদর' উপগ্রহ থেকে আজ ২৫টি স্বাগত সম্ভাষণ বিশ্বের পনেরোটি ভাষাতে সম্প্রচার করা হচ্ছে. আর তার সঙ্গে পৃথিবীর ফোটো ও বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি দিয়ে পাওয়া টেলি মেট্রিক তথ্য. এই খুবই ছোট উপগ্রহ, যার ওজন মাত্র ৩০ কিলোগ্রাম, তৈরী হয়েছে রাষ্ট্রসংঘের ইউনেস্কো সংস্থার উদ্যোগে আর বর্তমানে তা রয়েছে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে, এই বিষয়ে মহাকাশ গবেষণা জার্নালের পর্যবেক্ষক ইগর লিসভ বলেছেন:

    "রেডিও তরঙ্গে খবর দেওয়া নেওয়া যারা ভালবাসেন ব্যক্তিগত কারণে, তাদের জন্য এক মহাকাশ প্রকল্প. রেডিও নিয়ে এই ধরনের ব্যক্তিগত ভালবাসার কাজ, আজ অনেক দিনের ঘটনা, লোকে এটা করে চলেছে ১০০ বছর ধরে, যখন থেকে রেডিও আবিষ্কার হয়েছে. আর মহাকাশের রেডিও বলা যেতে পারে, প্রথম উপগ্রহের সঙ্গেই শুরু হয়েছিল, যখন বিশ্বের সমস্ত এই বিষয়ে চর্চা করা লোকেরা এর সঙ্কেত ধরতে পেরেছিলেন. তারপরে বিশেষ ধরনের উপগ্রহ পাঠানো হয়েছিল রেডিও যারা ভালবাসেন, তাঁদের নিজেদের মধ্যে কথোপকথনের জন্য. এখন সবচেয়ে জনপ্রিয় বিষয় হল, কেউ কিছু একটা জিনিস উপগ্রহে পাঠিয়ে দেয়, সেটার সেখানে রেকর্ডিং হয়ে থাকে, তারপরে এই রেকর্ডিং যার নামে পাঠানো তার কাছে পাঠানো হয়, এটা যেন এক রকমের ডাক বাক্স".

    'কেদর' উপগ্রহ সৃষ্টি করা হয়েছে ইউনেস্কো আয়োজিত যুব ও ছাত্র সমাজের মহাকাশ বিজ্ঞান শিক্ষার অংশ হিসাবে. জানুয়ারী মাসে এই উপগ্রহকে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে পাঠানো হয়েছিল. প্রথমে পরিকল্পনা করা হয়েছিল যে, ফেব্রুয়ারী মাসে খোলা মহাকাশে বিচরনের সময়ে এটাকে চালু করা হবে. কিন্তু পরে দেখা গিয়েছিল যে, এর ব্যাটারির কাজ করার ক্ষমতা মাত্র দুই সপ্তাহ, তাই 'কেদর' ঠিক করা হয়েছিল আন্তর্জাতিক মহাকাশ গবেষণা দিবসেই চালু করা হবে ও তা বিশ্বের সমস্ত রেডিও তরঙ্গে ব্যক্তিগত উদ্যোগে যোগাযোগ করা লোকেদের মহাকাশ জয়ন্তী দিবসে স্বাগত জানাবে. জুলাই মাসের শুরুতে পরবর্তী খোলা আকাশে বিচরনের সময়ে মহাকাশচারীরা এই উপগ্রহটিকে কক্ষপথে স্বনির্ভর উড়ানের জন্য ছেড়ে দেবেন.

    আজকের আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে 'কেদর' চালু করা – ইউনেস্কোর ছাত্রদের জন্য মহাকাশ সংক্রান্ত পরিকল্পনার অংশ. একশ কিলোগ্রাম পর্যন্ত ওজনের ছোট উপগ্রহ মহাকাশে কক্ষ পথে পাঠানোর জন্য বিশেষ ধরনের পরিকল্পনার এটা প্রথম ধাপ. 'কেদর' তার নিজের তরঙ্গ ১৪৫, ৯৫০ মেগা হার্জ ব্যান্ডে কাজ করছে. তার সরকারি সাঙ্কেতিক ডাক নাম – আর এস – ১ – এস. এই উপগ্রহের সঙ্কেত আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের রেডিও প্রেমিকদের জন্য বিশেষ কেন্দ্রের তরঙ্গ ৪৩৭, ৫৫ ব্যান্ড থেকেও পুনঃ প্রচার করা হচ্ছে.