১২ ই এপ্রিল ১৯৬১ সাল – আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে – সোভিয়েত মহাকাশচারী ইউরি গাগারীন ইতিহাসের নতুন পাতা উল্টেছেন, তিনিই বিশ্বে প্রথম মহাকাশে পাইলট চালিত উড়ান করেছিলেন. এই যুগান্তরের ঘটনা মানবেতিহাসে মহাকাশ যুগের শুরু ঘোষণা করেছিল, মহাকাশ ও মানুষ এই গবেষণার সম্পূর্ণ একটি দিকের উন্নয়ন করেছিল, নতুন প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার উদ্ভব হয়েছিল. ২০১১ সাল থেকে রাশিয়ার প্রস্তাবে ১২ই এপ্রিল দিনটিকে রাষ্ট্রসংঘের সাধারন সভা ঘোষণা করেছে মানুষের মহাকাশ উড়ানের আন্তর্জাতিক দিবস হিসাবে. এই উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়েছে ৬০টিরও বেশী দেশ.

    অর্ধ শতক: এটা কম না বেশী? ঐতিহাসিক মানদণ্ডে অবশ্যই, খুবই স্বল্প সময়. কিন্তু ইউরি গাগারীনের ঐতিহাসিক উড়ান সময়ের গতি বদলে দিয়েছে, মানুষের বুদ্ধি ও জ্ঞানের ক্ষমতাকে আরও কেন্দ্রীভূত করেছে. গাগারীনের মহাকাশে যাওয়া মানুষের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মানসিক সীমানা অতিক্রমে সাহায্য করেছে ও প্রমাণ করেছে যে, মানুষ নক্ষত্রের দিকে উড়ে যেতে পারে. একই সঙ্গে এই ঘটনা সোভিয়েত বিজ্ঞানের জয় ও শিল্পের উন্নতির প্রমাণ হয়েছে, বহু জাতি ও বহু লক্ষ মানুষের প্রচেষ্টাকে নতুন আবিষ্কারের পথে এক করেছে. বিগত দশক গুলিতে মহাকাশ গবেষণা সমগ্র মানব সমাজের সব নতুন উন্নতিকে এক জায়গায় করেছে, ভিত্তি হয়েছে সমস্ত উন্নত দেশের সহযোগিতার ও সমস্ত বিশ্বের মানুষের উন্নতির জন্য কাজ করেছে.

    চিন সফরের আগে সেই দেশের কেন্দ্রীয় টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে রুশ রাষ্ট্রপতি দিমিত্রি মেদভেদেভ ইউরি গাগারীনের উড়ান কে বৈপ্লবিক ঘটনা বলে উল্লেখ করে মন্তব্য করেছেন:

    "আমি বিশ্বাস করি যে, এটা ছিল সম্পূর্ণ বৈপ্লবিক ও সম্পূর্ণ প্রতীকী ঘটনা, যদিও গাগারীন যখন মহাকাশে গিয়েছিলেন, আমি তখনও জন্মাই নি. সোভিয়েত মহাকাশ গবেষণার এটা ছিল এক অত্যন্ত মহার্ঘ বিজয়. এর পর থেকে সমস্ত বিশ্ব ভাগ হয়ে গিয়েছে, দুটি ভাগে, এক দিকে যা ছিল মানুষের মহাকাশচারনার আগে, অন্য দিকে যা হয়েছে মহাকাশের যুগ বলে. এর মধ্যেই অনেক কিছু করা হয়েছে অনেক বার মহাকাশচারনা হয়েছে: মানুষ চাঁদে গিয়েছে, বহু সংখ্যক দেশ তাদের মহাকাশচারীদের পাঠিয়েছেন, তার মধ্যে গণ প্রজাতন্ত্রী চিনও রয়েছে. কিন্তু সেই ঘটনা আজও মানুষের জ্ঞানের উন্নতির ইতিহাসে একটি ভিত্তিমূলক অধ্যায় হয়ে রয়েছে, কারণ সব কিছু স্বত্ত্বেও গুরুত্বপূর্ণ হল প্রথম পদক্ষেপ নেওয়া. আর আমি খুবই গর্ব বোধ করি যে, এই পদক্ষেপ আমার দেশই প্রথম নিয়েছে. আর অবশ্যই, আমরা সকলে মিলে আমাদের বিশ্ব বিখ্যাত প্রথম মহাকাশচারীর মহাকাশচারনার সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করবো, আর এটা শুধু রাশিয়াতেই হবে না, বরং আমাদের বন্ধুরা অন্যান্য দেশেও করবেন".

    আজ মহাকাশ বিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে টেলি যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি, নিরাপত্তা বিষয়ে উন্নতি, পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ে নিয়ন্ত্রণের উন্নয়ন, প্রাকৃতিক সম্পদের অনুসন্ধান ও আবহাওয়ার বিষয়ে পূর্বাভাস ও আরও অনেক বিষয়ে মানুষের কাজকর্মের সব কিছুই জড়িত. তা স্বত্ত্বেও মানুষ আগের মতই অন্যান্য গ্রহ নক্ষত্রে পৌঁছতে চায়, তার দৃষ্টি ও লক্ষ্য অজানার দিকেই ফেরানো. বর্তমানের মহাকাশ গবেষণা আগের থেকে অনেক বাস্তব নির্ভর করা হয়েছে, কিন্তু তাও মহাকাশ সম্বন্ধে মানুষের কল্পনার ধারণা এখনও বজায় রয়েছে, এই কথা উল্লেখ করে রুশ রাষ্ট্রপতি দিমিত্রি মেদভেদেভ বলেছেন:

    "আমরা কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে চাই, মহাকাশে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেখতে চাই. কিন্তু আমাদের স্বপ্ন রয়েছে অন্যান্য গ্রহ নক্ষত্র ব্যবস্থাকে অনুসন্ধান করে দেখার. আমি জানি না, কবে তা হবে. কিন্তু মনে করি মানব সমাজ সবসময়েই চেষ্টা করবে এই দুই ধরনের পথকেই ব্যবহার করে দেখতে. এক দিকে রয়েছে মহাকাশের অসীমে আরও অনেক দূরকে কাছ থেকে দেখার, আর অন্যদিকে – সম্পূর্ণ আজকের দিনের প্রয়োজনের উপযুক্ত করে মহাকাশ বিজ্ঞানের ব্যবহার, যা শুধু আগ্রহজনক বৈজ্ঞানিক ফলই দেয় না, বরং বহু বাস্তবে প্রয়োজনীয় জিনিসে পরিনত করে".

    মহাকাশ গবেষণা দিবসের প্রাক্কালে রাষ্ট্রপতি ২০০৮ সালের ১৭তম বারে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে যাওয়া ও সেখানে কাজ করা মহাকাশচারী সের্গেই ভোলকভ ও ওলেগ কননেঙ্কো কে রুশ বীর পুরস্কার দিয়েছেন.

    গাগারীনের উড়ানের সম্মানে রাশিয়া অনেক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে. তাতে রাশিয়া ও বিদেশের বহু সাম্প্রতিক ও প্রাক্তন মহাকাশচারী আসছেন, রাজদূতেরা আসছেন, দেশের ও সমাজের বহু বিখ্যাত নেতৃ স্থানীয় মানুষেরা থাকছেন. ১২ই এপ্রিল ক্রেমলিনে ৪০টি বিদেশী মহাকাশ গবেষণা সংস্থার প্রধানেরা এক বৈঠকে বসেছেন, সন্ধ্যায় রাশিয়ার রাজধানীতে পঞ্চাশ বার আকাশে আতসবাজি ফাটিয়ে প্রথম মানুষের মহাকাশ ভ্রমণের পঞ্চাশ বছরের প্রতিটি বছরকেই সম্মান জানানো হবে. একদিন পরেই মস্কো শহরে বিখ্যাত ফরাসী সঙ্গীতশিল্পীদের দল 'স্পেস' একটি জলসা করবে.

    মস্কোতেই শুধু মহাকাশ গবেষণা দিবস পালিত হবে না, বরং রাশিয়ার অন্যান্য শহরেও হবে, হবে বিশ্বের অন্যান্য বহু শহরেও. তাতারস্থানের রাজধানী কাজান শহরে এক আচমকা জমা হওয়া জনতা গাগারীনের উড়ান পূর্ব বিশ্ব বিখ্যাত "চলো যাই!" নামের এক অনুষ্ঠান করতে চলেছে: সেখানে ছাত্রেরা নিজেদের তৈরী নানা রকমের মহাকাশ উড়ানের রকেটের মডেল আকাশে পাঠাবে আর সবাই মিলে স্থির করা হবে গাগারীনের প্রথম উড়ানের স্মৃতিতে উত্সর্গিত মনুমেন্টের আকৃতি কি রকমের হবে. ইউক্রেনে "আমাদের মহাকাশ" নামে এক ম্যারাথন অনুষ্ঠান করা হচ্ছে, তার অংশগ্রহণকারীরা দেশের বিভিন্ন শহরে এই অর্ধ শতক আগের বিভিন্ন মূখ্য বৈজ্ঞানিক ও ঘটনার ছবি পাজল সকলে মিলে বানাবে, তারপরে ১২ই এপ্রিল রাজধানী কিয়েভ শহরে এই সব কটি পাজল জোড়া হবে ও উপস্থিত সকলে দেখতে পাবেন তাতে হাসি মুখের গাগারীনের ছবি.

    রাষ্ট্রসংঘের মূল দপ্তরে নিউইয়র্ক শহরে "গাগারীন - প্রথম মানুষ মহাকাশে" নামে এক চিত্র প্রদর্শনী চলছে, প্রদর্শনীতে বিখ্যাত মহাকাশচারীর জীবন ও তার কাজ দেখানো হয়েছে. এছাড়া রাষ্ট্রসংঘ এক সারি বিশেষ ডাকটিকিট প্রকাশ করেছে, যা ১২ই এপ্রিল থেকে ব্যবহার শুরু হল. ব্রিটেনের কাগজ "গার্ডিয়ান" লিখেছে যে, "বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাসে এক সবচেয়ে অতি বাস্তব মুহূর্ত হতে চলেছে মঙ্গলবার, যখন আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন থেকে রুশ মহাকাশচারীরা লন্ডনের বই মেলায় আসা লোকেদের প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেবেন”. প্রসঙ্গতঃ জুলাই মাসে লন্ডনে গাগারীনের গ্রেট ব্রিটেন সফরের পঞ্চাশ বছর উপলক্ষে একটি স্মারক স্তম্ভের উদ্বোধন করা হবে.

    পোল্যান্ডের মহাকাশ গবেষণার রাজধানী – তোরুন শহরে এই জয়ন্তীর দিনে এক উজ্জ্বল ধ্বণি চিত্র অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে, যার সময় সীমা এক ঘন্টা আটচল্লিশ মিনিট. ঠিক এই সময় ধরেই মহাকাশে ইউরি গাগারীনের উড়ান হয়েছিল, যা মানুষের নিজেদের ক্ষমতা সম্বন্ধে ধারণাকেই পাল্টে দিয়েছিল.