মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কোরান পোড়ানো আফগানিস্তানকে বিস্ফোরিত করেছে. "আমেরিকা মুর্দাবাদ!", "ওবামা মুর্দাবাদ!" স্লোগান দিয়ে আমেরিকা বিরোধী মিছিল হয়েছে আফগানিস্তানের দশটি রাজ্যে.

শুক্রবারে মাজারি শারীফে মিছিল শুরু হয়েছিল. সেখানে আমেরিকার কোন রাজদূতাবাস বা প্রতিনিধি দপ্তর নেই, তাই রাষ্ট্রসংঘের দপ্তরের উপরেই মিছিল আক্রমণ করেছিল. সাতজন কর্মী খুন হয়েছেন. আহতদের মধ্যে দপ্তরের প্রধান রাশিয়ার পাভেল এরশভ আছেন. নিরাপত্তা রক্ষী বাহিনী হামলা বাজদের উপরে গুলি চালনা করায় চারজন নিহত. ছুটির দিন গুলিতে বিক্ষোভ ছড়িয়েছে জালালাবাদ ও কান্দাহার ছাড়াও দেশের বিভিন্ন রাজ্যে. পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে কম করে হলেও তিরিশ জন মানুষ, প্রায় ১৫০ জন আহত. রাশিয়ার সামাজিক- রাজনৈতিক অনুসন্ধান কেন্দ্রের ডিরেক্টর ভ্লাদিমির ইভসিয়েভ এই প্রসঙ্গে মন্তব্য করে বলেছেন:

    "বর্তমানের উত্তেজনা, আর তা ইতিমধ্যেই আফগানিস্তানে লোকের মৃত্যুর কারণ হয়েছে, এখন বিশ্বের অন্যান্য সব এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে, যেখানে ইসলামের প্রভাব প্রবল. এটা সেই সমস্ত জায়গায় স্পর্শ করতে পারে, যেমন, ইরাকে. প্রসঙ্গতঃ বিশেষ করে উল্লেখ করবো যে, আফগানিস্তানে লোকের ভীড় থেকে স্লোগান উঠেছিল "আমেরিকার লোকেরা মুর্দাবাদ!". কোরান পোড়ানো শুধু আমেরিকাতেই নয়, এমনকি ইউরোপেও, যেখানে প্রচুর মুসলমান বাস করেন, সেখানেও খুবই গুরুত্বপূর্ণ নেতিবাচক ফলাফল দেখাতে পারে. এখানে বাদ দেওয়া যেতে পারে না যে, এটা আন্তর্ধর্মীয় ও বিভিন্ন সভ্যতার মধ্যে সঙ্কটের কারণ হতে পারে".

    এরই মধ্যে পাকিস্তানের করাচী শহরে রবিবারে বিশাল জন সমাবেশে অনেক গুলি কুশ পুত্তলিকা দাহ করা হয়েছে আমেরিকার সেই প্যাস্টর টেরি জোনস এর, যিনি তাঁর ফ্লোরিডার গির্জায় জন সমক্ষে কোরান আগুণে পুড়িয়েছেন. আর পাকিস্তানের চরমপন্থীরা ঘোষণা করেছে তাঁর মাথার জন্য আড়াই মিলিয়ন ডলারেরও বেশী পুরস্কার. প্রসঙ্গতঃ ২০০৬ সালে পাকিস্তানে প্রথম দেশ গুলির মধ্যে সবার আগে ডেনমার্কের খবরের কাগজে আল্লার দূত মুহম্মদের সম্বন্ধে কার্টুনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা হয়েছিল, যার ফলে বিশ্বের ঐস্লামিক দেশ গুলিতে কয়েক মাস ধরে বহু প্রতিবাদ মিছিল ও বিক্ষোভ প্রদর্শন হয়েছিল.

সেই ঘটনা ধর্মীয় সহনশীলতার প্রশ্নে বিশ্বের বহু ধর্মের লোক অধ্যুষিত দেশ গুলিতে  - আর পূর্ব ও পশ্চিমের দেশ গুলিতেও মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল. কারণ নিকট ও মধ্য প্রাচ্যের বেশীর ভাগ দেশ, আফ্রিকা, দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিতে বেশীর ভাগই মুসলমান অধ্যুষিত দেশ, সেখানে একই সঙ্গে বেশ কয়েকটি ধর্ম পালিত হয়ে থাকে. এটা একই সময়ে রাশিয়াতেও হয়েছে, কারণ এখানে এক আপাতঃ মূল্যায়নে প্রায় দুই কোটি লোক ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী. তাই রাশিয়ার অর্থোডক্স গির্জা সর্বদাই তাঁদের ভক্তদের ধর্মীয় সহনশীলতা প্রদর্শন করতে আহ্বান করেছে. এর থেকেই মস্কোর কাজান গির্জার প্রধান যাজক ইগর ফোমিনীখ আমেরিকার প্যাস্টরের কাজের কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন:

"আমি মনে করি এই ধরনের কাজ করতে দেওয়াই চলতে পারে না, এমনকি এই রকমের কাজ সম্বন্ধে চিন্তা করাও পাপ. কোরান – বিশ্বের বহু অংশের মানুষের জন্য খুবই শ্রদ্ধার ও মূল্যবান গ্রন্থ. এই গ্রন্থ অনুসরণ করে এক বিশাল মানব সমাজ বিবেক সম্মত জীবনের পথে চলেন. অন্য কথা হল যে, ইসলাম ধর্ম পালন করা কিছু লোক কোন রকমের হিংসা প্রকাশ করে থাকে. কিন্তু এর কারণ কোরানে নেই".

রাশিয়ার ঐস্লামিক পরিষদের সভাপতি হায়দার জমাল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কোরান পোড়ানোর মধ্যে শয়তানের অভিপ্রায় দেখতে পেয়েছেন. তাঁর মতে এর মধ্যে কিছু রাজনৈতিক চাল রয়েছে, তাই তিনি বলেছেন:

 "বারাক ওবামার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে, এই নির্বোধ প্যাস্টর যে কিনা অন্য কারও উস্কানিতে নাচছে, সে নিশ্চয়ই রিপাব্লিকান দলের লোকের কথায় কাজটা করেছে. ওবামা সোজা ও কঠোর ভাবে এই প্যাস্টরকে কোন রকমের শাস্তি দিতে পারছেন না, কারণ তাহলে তাঁকে বলা হবে মুসলিম লোকেদের দালাল ও তাদের সহচর. তাঁর বিরুদ্ধে এই ধরনের অভিযোগ আগেও তোলা হয়েছিল, যখন তিনি নিউইয়র্কের সন্ত্রাসবাদী আক্রমণে ধ্বংস হয়ে যাওয়া টুইন টাওয়ার্সের জায়গায় ম্যানহ্যাটানে মসজিদ করার বিষয়ে নিজের সম্মতির কথা বলেছিলেন. তাঁর এই দুর্বল অবস্থান তাঁকে মুসলিম বিশ্বে এক অগ্রহণযোগ্য ও অস্পৃশ্য চরিত্রে পরিনত করছে. আর তিনি নিজেই প্রচেষ্টা করেছিলেন জর্জ বুশ জুনিয়রের পরে সক্রিয় ভাবে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করার, বিশেষত তাঁর কায়রো শহরের বক্তৃতা বা মিশরের তহরির স্কোয়ারের গণ অভ্যুত্থানকে সমর্থন দিয়ে."

আজও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১১ই সেপ্টেম্বর ২০০১ সালের ধ্বংস হওয়া টুইন টাওয়ার্সের জায়গায় এই মসজিদ তৈরী করা নিয়ে বাদানুবাদ তীব্র. এই মসজিদকে প্রাথমিক ভাবে ভাবা হয়েছিল বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে ঐক্যের প্রতীক হিসাবে. কিন্তু পরে এই প্রকল্প খুবই গম্ভীর রাজনৈতিক বিতর্কের কারণ হয়েছে. প্রসঙ্গতঃ প্যাস্টর টেরি জোনস এই মুসলিম কেন্দ্র নির্মাণের সঙ্গে কোরান পোড়ানো কে জড়িয়েছেন.

0 এখন আবার সব দেখে শুনে মনে হয়েছে যে, এই প্রকল্পের সমর্থক ও প্রতিবাদীদের মধ্যে আরও মেরু পরিবর্তন দেখা দেবে. বাইরের প্রভাব এর মধ্যে পড়তে বাধ্য. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে যুদ্ধ শেষ না করেই মার্চ মাসের শেষে আবার লিবিয়াতে সামরিক শক্তি প্রয়োগ শুরু করেছে. আর যদি এই মাত্র কিছুদিন আগেও লিবিয়ার দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানকে বিশ্বে মুসলমান সমাজকে গণতন্ত্র লাভের প্রয়াসে সমর্থন বলে প্রচার করা সম্ভব হয়েও তাকে, তবে কোরান পোড়ানোর পরে তা মুসলমানদেরই দৃষ্টিতে পশ্চিমের তরফ থেকে আরও একটি যুদ্ধের আহ্বানে পরিনত হতেই পারে.